সংসার সুখের হয় নারীর গুণে- নারী হচ্ছে ফুল। নারী স্বপ্ন, নারী আশা, নারীদের নিয়ে হৃদয়ের সব ভালোবাসা। একজন নারী পুষ্পকলির মতো করে সাজাতে পারে নিজের জীবন। আয়নার মতো পরিষ্কার করে গোছাতে পারে জীবনের সংসার। নববী ইলমের পরশে কোরআনের আলোর ফোকাসে ধন্য হয় নারী। সফল হয় নারীজীবন। সুন্দর হয় জীবনের পথচলা।

আমাদের দেশে নারীদের আদর্শময়ী, ধর্মপ্রেমিক, মানবীয় গুণে গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে হাজারো মহিলা মাদ্রাসা। আদর্শ মহিলা মাদ্রাসা গড়ার এক স্বপ্নিল কারিগর মুফতি মুহাম্মদ আতাউর রহমান কাসেমী।

কাসেমী আমাদের ধর্মীয় বলয়ের এক বলিষ্ঠ লেখক। ইলমের বিদ্যাপীঠ ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দে দাওরায়ে হাদিস ও ভারতের ভুপালে ইফতা শেষ করে দেশে ফিরে শুরু করেন লেখালেখি, মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা তার অসাধারণ গবেষণা।

প্রতিভাধর এই গুণী মাওলানা ১৯৯২ সালে নারীদের মনবাগানে শিক্ষার ফুল ফোটাতে প্রতিষ্ঠা করেন মাহমুদিয়া মহিলা মাদ্রাসা। ঢাকার বাসাবো কদমতলায় বেশ সুন্দর হয়ে উঠেছে মাদরাসাটি। নিরিবিলি পরিবেশে মাতৃস্নেহ গায়ে মেখে ছাত্রীরা হেরা গুহার নববী ইলম অর্জন করছে। মাহমুদিয়া মহিলা মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল মুফতি কাসেমীর সঙ্গে নারী শিক্ষা বিষয়ে কথা হয় এক ভরদুপুরে-

যুগান্তরঃ একজন আলেম হিসেবে কতকিছু করার আছে। মহিলা মাদরাসা বানানোর কাজে গেলেন কেন?

কাসেমীঃ দেখুন, আজকের বাংলাদেশে পুরুষদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হাজারো আছে। কিন্তু মহিলাদের জন্য হাতেগোনা কয়েকটি মাদ্রাসা মাত্র। অথচ শিক্ষার বেলায় ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের গুরুত্ব বেশি।

কারণ, মেয়েরা মূর্খ থাকলে সন্তান-সমাজ অন্ধকারে চলে যাবে।

আগামী প্রজন্মের কাছে শিক্ষার আলো বিস্তারে নারীদের শিক্ষার কোন বিকল্প নেই। আর ধর্মীয় শিক্ষা দেয়া না গেলে সমাজ আলোকিত হবে না।

যুগান্তরঃ সমাজে মহিলা মাদ্রাসার প্রভাব কতটুকু? এবং মহিলা মাদরাসা সমাজকে কী উপহার দিচ্ছে।

কাসেমীঃ বৃক্ষ তার ফলে পরিচয়। মহিলা মাদ্রাসা ও তার ছাত্রীর মাধ্যমে পরিচয়, যেমন আতরের দোকানের পাশে হাঁটলে আতরের ঘ্রাণ পাওয়া যায়। তেমনি ওহির পরশে, নববী ইলমের ছোঁয়া পেলে রমণীরা নম্র, ভদ্র, আর মায়াময় হয়ে ওঠে।

মুফতি এএম তাজুল ইসলাম, ধর্মীয় অঙ্গনে রম্য লেখকদের অন্যতম। ইতিমধ্যে তিনি শয়তানের সংসদ লিখে পাঠক মনে ঝড় তুলেছেন। তার রচিত শয়তান থেকে সাবধান লিখেও পাঠক মহলে সমাদর কুড়িয়েছেন। তরুণ এ কথাশিল্পী শুধু কলম হাতে বসে নেই। আদর্শনগর মধ্যবাড্ডায় গড়ে তুলেছেন এক আদর্শিক মহিলা মাদ্রাসা।

পরিশ্রমী এ মানুষ একই সঙ্গে বাড্ডার বায়তুল আমীন জামে মসজিদের ইমাম ও খতিব।

কথা হল এক বৃষ্টিভেজা দুপুরে। চানাচুর আর চায়ের আড্ডায় আলাপের বিশেষ অংশ-

যুগান্তরঃ আপনার মাদ্রাসার প্রতি এলাকার লোকজনের সহযোগিতা কতটুকু?

তাজুল ইসলামঃ আল হামদুলিল্লাহ। এলাকার লোকজন খুবই ধর্মপ্রেমিক। নারী শিক্ষার প্রতি আন্তরিক। ফলে আমার এ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই তারা সহযোগিতা করে আসছেন এবং আগামীতেও করবেন।

যুগান্তরঃ আপনাদের মহিলা মাদ্রাসা সিলেবাসে কোন বিষয়গুলো প্রাধান্য দিয়ে পড়ানো হয়?

তাজুল ইসলামঃ নারীদের জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত মাসায়েল, আদব-কায়দাসহ কোরআন-হাদিসের সঙ্গে মিল রেখে আধুনিক সিলেবাসে নারীকে সভ্য-সামাজিক, ধার্মিক ও দেশপ্রেমিক হিসেবে গড়ে তোলার ট্রেনিং দেয়া হয়। কেননা নারী ধার্মিক এবং আধুনিক হলে তার প্রভাব পড়বে সমাজে।

জামিয়া কারিমিয়া মিছবাহুল উলুম মহিলা মাদরাসা। ঢাকার অদূরে মিজমিজি বোতানপাড়া পাইনাদী, সিদ্ধিরগঞ্জ, নবায়ণগঞ্জে অবস্থিত। খুব চমৎকার পরিবেশ। গ্রামীণ আঙ্গিনা। শরীয় পর্দায় রেখে মেয়েদের শেখানো হয় দ্বীনি ইলম।

মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা হাবীবুর রহমান আনসারী। তিনি দেশবিখ্যাত একজন বক্তা। দ্বীন-ধর্ম ও ইসলামের কথা বলে দেশজুড়ে বেশ খ্যাতি অর্জন করেছেন। ২০০১ সালে গড়ে তোলেন মাদ্রাসা। মাদ্রাসা গড়ার লক্ষ্য, আগামীর স্বপ্ন নিয়ে কথা হয় তারই সুযোগ্য সাহেবজাদা মাদরাসার ভাইস প্রিন্সিপাল হাফেজ মাওলানা ইব্রাহীম খলীল আনসারীর সঙ্গে।

যুগান্তরঃ মহিলা মাদ্রাসাগুলোর মৌলিক লক্ষ্য, উদ্দেশ্য কী?

ইব্রাহীম খলীলঃ আমার জানা মতে, ধর্মের ক্লান্তিকালে বেপর্দা, অশ্লীলতা, মূর্খতার অভিশাপ থেকে নারী জাতিকে মুক্ত করে মায়াময়, প্রেমময় ও ধার্মিক হিসেবে গড়ে তোলা জরুরি।

যুগান্তরঃ ধর্মশিক্ষায় নারীদের অতীত ইতিহাস ঐতিহ্যের কথা বলবেন কী?

ইব্রাহীম খলীলঃ বেশিদূর যাওয়ার দরকার নেই। হজরত আয়শার জীবনটা একটু দেখুন।

রাসূল (সা·) বলেন, আমার ওহির ইলমের অর্ধেক পেয়েছে সাহাবায়ে কেরাম। আর বাকি অর্ধেক আয়শা থেকে শিখে নাও।

যুগান্তরঃ মাদ্রাসাকে সামনে এগিয়ে নেয়ার জন্য আপনাদের আগামী কর্মসূচি কি?

ইব্রাহীম খলীলঃ ঠিক এগিয়ে নেয়া নয়। সবে মিলে একটি মিলন মেলা করার ইচ্ছা করেছেন আব্বাজান। আগামী ২০০৯ সালে অষ্টম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে বিগত সব ছাত্রীকে নিয়ে অষ্টম সালা করার ইচ্ছা আছে। তখন আমরা বুঝতে পারব আমাদের মাদ্রাসার ছাত্রীরা সমাজে ইসলামী আদর্শের কতটা প্রভাব ফেলতে পেরেছে।

**************************
সাজিদ মাহমুদ
যুগান্তর, ৪ জুলাই, ২০০৮