সমাজে বছরের পর বছর শোষণ-নির্যাতন চলতে থাকলে, মানুষের হক বা অধিকার লঙ্ঘিত হলে, সুবিচার প্রতিষ্ঠিত না হলে, নৈতিকতা বা মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় হলে, মানবতা বিপর্যস্ত হলে এক অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি হয়। এ অবস্থায় মানুষ পরিত্রাণ চায়, চায় নিষ্কৃতি। ফলে সংস্কারের দাবি ওঠে, পরিবর্তনের কথা আসে, আসে ভাঙাগড়ার প্রশ্ন। বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রাকৃতিক নিয়মনীতি লঙ্ঘিত হলে অথবা কোনোভাবে তা বাধাগ্রস্ত হলে প্রকৃতি বিরূপ হয়ে পড়ে। কখনো কখনো এ কারণে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ও ঘটতে পারে। অনুরূপভাবে সমাজ বা দেশ পরিচালনার দায়িত্বে যারা নিয়োজিত তাদের দ্বারা সমাজে সুশাসন ও সুবিচার প্রতিষ্ঠিত না হলে, নৈতিকতা ও মূল্যবোধের অবক্ষয় হলে, মানুষের হক ও অধিকার প্রতিষ্ঠিত না হলে, জনকল্যাণের পরিবর্তে ব্যক্তিস্বার্থ প্রাধান্য পেলে সমাজে জুলুমের মাত্রা বৃদ্ধি পায়। এ অবস্থায় সমাজে অসহনীয় শ্বাসরুদ্ধকর এক পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। দুঃশাসন, অবিচার, দুর্নীতির কারণে সমাজ পরিবর্তনের দাবি অনিবার্য হয়ে ওঠে।

আমরা একটু গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখতে পাই, প্রকৃতিতে উদ্ভিদ ও প্রাণিকুল এক দিকে স্রষ্টা নির্দেশিত পন্থায় মহান স্রষ্টার মহিমা ঘোষণা করে চলেছে; আরেক দিকে এরা মানুষ ও অন্যান্য সৃষ্টির সেবাদান করে চলেছে। এ ক্ষেত্রে দুনিয়ার কোথাও কোনো ব্যতিক্রম লক্ষ করা যায় না। আর আমরা মহান আল্লাহতায়ালার সেরা সৃষ্টি হিসেবে মানুষ হয়ে আরেক মানুষের হক ও অধিকার হরণ করি। এ অবস্থায় সমাজ পরিবর্তনের অনিবার্য দাবি প্রতিরোধ করা যায় না। দমন করা সম্ভব হয় না। এরূপ পরিস্থিতিতে কিছু সৎ ও ভালো লোককে সমাজ পরিবর্তনে এগিয়ে আসা ছাড়া কোনো বিকল্প থাকে না। সমাজ পরিবর্তনের সফলতার জন্য প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য, উদ্দেশ্য; সৎ, দক্ষ ও নিবেদিত কর্মীবাহিনী এবং ঐক্য বা সঙ্ঘবদ্ধতা।

একটা ম্যাগনিফায়িং গ্লাসের মধ্য দিয়ে সূর্যরশ্মিকে পরিচালিত করা গেলে তা প্রচণ্ড শক্তিতে রূপান্তর হয়। এ শক্তি এতই প্রচণ্ড হয় যা এক পর্যায়ে আগুন ধরিয়ে দিতে সক্ষম। বাস্তবে দেখা যায়, ম্যাগনিফায়িং গ্লাসের বিপরীতে এক খণ্ড কাগজ ধরলে তাতে আগুন ধরে যায়। সমাজ পরিবর্তনে অল্পসংখ্যক বা মুষ্টিমেয় যে লোক এগিয়ে আসে তারা ঐক্যবদ্ধ হলে প্রচণ্ড শক্তিশালী একটি শক্তিতে পরিণত হয়। সমাজ পরিবর্তনে তারা অগ্রণী ও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে সমর্থ হয়। যুগে যুগে সমাজের ভালো মানুষগুলো সমাজ পরিবর্তনে এভাবে এগিয়ে এসেছেন; তারা নিমজ্জমান সমাজের হাল ধরেছেন। সমাজ থেকে জুলুমের মূলোৎপাটন করেছেন, সমাজে পরিবর্তন এনেছেন। আত্মশাসনে কামিয়াব এ ধরনের সৎকর্মপরায়ণ ব্যক্তিরা মহান আল্লাহতায়ালার কাছে অত্যন্ত প্রিয় বলে বিবেচিত হন। হাদিসে বর্ণিত হয়েছেঃ

‘... তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাসো তবে আমাকে অনুসরণ করো, আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের অপরাধ ক্ষমা করবেন।’ (৩ঃ৩১)। প্রত্যেকে ভালো বা মন্দ কাজের ফলাফলপ্রাপ্ত হবে এ বিষয়ে একই সূরায় মহান আল্লাহতায়ালার স্পষ্ট ঘোষণা দেখা যায়। বর্ণিত হয়েছেঃ ‘... প্রত্যেকে সে যে ভালো কাজ করেছে এবং সে যে মন্দ কাজ করেছে তা বিদ্যমান পাবে ...’ (৩ঃ৩০)।
দুঃশাসন, অবিচার, দুর্নীতি ইত্যাদি কারণে সমাজ যখন শাসরুদ্ধ হয়ে পড়ে তখন গোটা সমাজ তথা সমগ্র দেশের সব পর্যায় ও স্তরে সংস্কার বা পরিবর্তনের দাবি সোচ্চার হয়ে ওঠে। এ অবস্থায় সমাজের মুষ্টিমেয় কিছু ভালো ও সৎলোকের এগিয়ে আসা ছাড়া বিকল্প থাকে না।

অত্যন্ত সংখ্যালঘিষ্ঠ ভালো মানুষগুলোকে সঙ্ঘবদ্ধ করা গেলে প্রচণ্ড শক্তিশালী একটি শক্তি সৃষ্টি করা সম্ভব। সমাজ পরিবর্তনে তারাই অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে সক্ষম। সেই আল্লাহর রাসূল সাঃ-এর যুগ থেকে শুরু করে এভাবে সমাজ পরিবর্তন সূচিত হয়েছে। নবী-রাসূলগণ সমাজ থেকে অন্যায়, অবিচার, দুর্নীতি ও জুলুমের মূলোৎপটন করতে সচেষ্ট ছিলেন। পরবর্তীকালে যুগে যুগে সমাজের ভালো লোকগুলো এ কঠিন দায়িত্ব পালন করেন। সমাজ থেকে জুলুমের মূলোৎপাটন করতে ইসলামের আহ্বান অত্যন্ত স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন। ইসলামে জুলুমকে সব ধরনের অন্যায়, অবিচার, শোষণ, নির্যাতন ও অপকর্মের সাথে তুলনা করা হয়েছে। মনে রাখা দরকার, জুলুমের মাধ্যমে সমাজের অন্যদের তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। এ কারণে মানুষকে সৎকর্মপরায়ণ হওয়ার জন্য ইসলামে আহ্বান জানানো হয়েছে। সৎকর্মশীল ব্যক্তিরা আল্লাহতায়ালার কাছে বেশি সম্মানিত। এ মর্মে পবিত্র কুরআন মজিদে উল্লেখ করা হয়েছে। হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়েছেঃ

‘... একমাত্র সৎকর্মশীলতা ছাড়া একজন অনারবের ওপর একজন আরবের অথবা একজন কৃষ্ণকায়ের একজন শ্বেতাঙ্গের ওপর কোনো আধিপত্য নেই।’ ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গিতে মানুষের মর্যাদা নির্ধারণের মানদণ্ড হচ্ছে চরিত্র এবং মানবতার প্রতি সেবার মাত্রা। আবার আগের কথায় ফিরে গিয়ে আমরা বলতে পারি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং সব ধরনের অবিচার নির্মূল করা রাসূলগণের অন্যতম দায়িত্ব ছিল। ইসলামে ন্যায়বিচারকে তাকওয়ার পরে স্থান দেয়া হয়েছে। ইসলামী পরিভাষায়, পাপাচার থেকে নিজেকে আত্মরক্ষা করার নাম হলো তাকওয়া। তাকওয়া সুবিচার প্রতিষ্ঠা করতে মানুষকে অনুপ্রেরণা জোগায়। সমাজ পরিচালনায় খোদাভীরু লোকের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি পেলে জনকল্যাণের পরিধি বৃদ্ধি পায়।

পরিবর্তন প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআন মজিদের এই আয়াতে কারিমায় ইরশাদ হয়েছেঃ ‘... এবং আল্লাহ কোনো সম্প্রদায়ের অবস্থা পরিবর্তন করেন না যতক্ষণ না ওরা নিজ অবস্থা নিজে পরিবর্তন করে।’ (১৩ঃ১১)। কুরআন পাকে আরো বর্ণিত হয়েছেঃ ‘... যদি কোনো সম্প্রদায় নিজের অবস্থার পরিবর্তন না করে তবে আল্লাহ এমন নন যে, তিনি ওদের যে সম্পদ দান করেছেন, উহা পরিবর্তন করবেন...।’ (৮ঃ৫৩)। এ কথা আমরা বলতে পারি, সমাজগঠনমূলক ও কল্যাণধর্মী পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি ইতিবাচক। শুধু ইতিবাচকই নয়­ ইসলাম এ বিষয়ে যথেষ্ট গুরুত্ব আরোপ করে।

ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে সমাজসংস্কার বা পরিবর্তন এক ব্যাপক কর্মতৎপরতা। পরিবর্তনের ক্ষেত্র শুধু রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা সামাজিক ক্ষেত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। পরিবর্তনের ক্ষেত্র ব্যাপক হওয়া দরকার। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক, বুদ্ধিবৃত্তিক, নৈতিক, চারিত্রিক, জাগতিক, বস্তুগত­ সব ক্ষেত্রেই পরিবর্তন সূচিত হওয়া প্রয়োজন। তবে ইতিবাচক ও কল্যাণকর সংস্কার বা পরিবর্তনের জন্য প্রবল ইচ্ছাশক্তির প্রয়োজন। একই সাথে দরকার নৈতিক মানসম্পন্ন একদল লোক। নিবেদিত একদল সৎ ও যোগ্য কর্মীবাহিনী বৈষয়িক, নৈতিক ও সামাজিক, রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবর্তন আনয়নে একক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে কল্যাণকর ও ইতিবাচক পরিবর্তনে পরিকল্পনামাফিক সমন্বিত কর্মোদ্যোগ গ্রহণ প্রয়োজন। এ জন্য সৎ, সাহসী এবং ঐক্যবদ্ধ জনসমষ্টির এগিয়ে আসা দরকার। লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের প্রতি নিষ্ঠাবান ও নিবেদিত হলে সংখ্যালঘিষ্ঠ হলেও ইতিবাচক ও কল্যাণধর্মী পরিবর্তন আনয়নে তারা সক্ষম হবেন। পরিবর্তনের মাধ্যমে সূচিত ফলাফল জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর আগে প্রবল বাধা ও চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হবে। সুদৃঢ় প্রত্যয়, টেকসই নৈতিক শক্তি এবং দৃষ্টান্তমূলক ঐক্য বাধা ও চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সহায়ক হবে। এ ক্ষেত্রে সুবিচার ও নৈতিকতা পরিবর্তন আনয়নের কাজে দারুণভাবে সাহায্য করে।

অনেকের ধারণা, শুধু চিন্তার পুনর্গঠন অথবা ইসলামের নৈতিক ও চারিত্রিক মূল্যবোধগুলোর পুনরাবৃত্তি বা পুনর্বিন্যাস হলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সম্ভব। সামগ্রিক পরিবর্তনের জন্য সর্বাগ্রে মানবসত্তার পরিবর্তন প্রয়োজন। মানবসত্তার পরিবর্তন আনয়ন করতে হলে ব্যাপক তৎপরতা দরকার। তাহলে ব্যাপক এই পরিবর্তনের পূর্ণ ব্যাপ্তি ও প্রতিফলন লক্ষ করা যাবে। পরিবর্তনের সুফল জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর জন্য মানুষের বৈষয়িক, আধ্যাত্মিক, বুদ্ধিবৃত্তিক, নৈতিক ও চারিত্রিক গুণাবলির পরিপূর্ণ বিকাশ ও প্রসার প্রয়োজন। শিক্ষার মৌল চেতনা দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আনয়ন, চারিত্রিক ও মানবীয় গুণাবলি তৈরি ও বিকাশে সাহায্য করে।
মানবপ্রকৃতি অত্যন্ত নিরপেক্ষ এবং সৎপ্রবণ। মানবপ্রকৃতির মধ্যে অনেক শুভ গুণের অস্তিত্ব বিদ্যমান। মানুষের বিপদ-আপদে, দুর্যোগে মানুষ মানুষের পাশে এসে দাঁড়ায়। দুর্গত ও আর্তমানুষের সেবায় সমাজের সৎপ্রবণ এই মানুষগুলো ঝাঁপিয়ে পড়ে। মানুষের মধ্যে অন্তর্নিহিত কল্যাণ করার সদিচ্ছা বা প্রবণতা বিদ্যমান রয়েছে এ কারণে মানুষ অন্যের উপকারার্থে এগিয়ে আসে। কাজেই মুষ্টিমেয় ভালো মানুষ যখন সমাজে কোনো পরিবর্তন বা সংস্কারে এগিয়ে আসে তখন উপকারপ্রবণ সাধারণ মানুষগুলো তাদের সমর্থন দেয়।

সমাজ পরিবর্তনের আগে সমাজে বা রাষ্ট্রে একটা অস্বস্তিকর, অগ্রহণযোগ্য, অবিচার ও দুর্নীতিযুক্ত শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এরূপ পরিস্থিতি সৃষ্টির পেছনে কিছু কারণ রয়েছে। এগুলোর মধ্যে অন্যতম হলোঃ সমাজ পরিচালনার দায়িত্বে যারা নিয়োজিত তাদের মধ্যে আল্লাহভীতি বা তাকওয়া না থাকা, আদল বা সুবিচার না করা। জবাবদিহিতার অভাব, সুশাসন না থাকা। এ সময় সমাজ পরিচালনার দায়িত্বে যারা নিয়োজিত থাকেন তাদের মধ্যে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের অভাব পরিলক্ষিত হয়।

খোদাভীতি বা তাকওয়ার সহজ অর্থ পাপাচার থেকে বিরত থাকার বিরামহীন প্রচেষ্টা। তাকাওয়ার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো যাবতীয় অসৎ কর্ম থেকে বিরত থাকা। যেসব পাপাচার পরিবর্তন আনয়নকে অনিবার্য করে তোলে সে বিষয়ে কিঞ্চিৎ আলোকপাত করা প্রয়োজন। পবিত্র কুরআন মজিদে কিছু জঘন্য ধরনের পাপাচারের উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন­ খাতিয়াঃ স্বেচ্ছায় যেসব অপরাধ বা পাপ করা হয় সেগুলো এর অন্তর্ভুক্ত। ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে উল্লেখযোগ্য পাপাচারগুলোর বিবরণ এরূপঃ মানবিঃ অন্যায় ও অবাধ্যতা ধরনের পাপাচার, ইসমঃ অবৈধ জাতীয় পাপাচার; ফুসুক্কঃ নাফরমানিমূলক কাজ; সায়্যিআঃ মন্দ কাজ; ইসইয়ানঃ ঔদ্ধত্যমূলক, অবাধ্যজনিত পাপাাচর; উতুঃ বিরুদ্ধাচরণ বা সীমালঙ্ঘন জাতীয় কাজ; ফাসাদঃ বিপর্যয় বা অশানি, সৃষ্টিমূলক পাপাচার। পাপাচারের কারণে মানুষের মধ্যে অবর্ণনীয় কষ্ট-দুঃখ-দুর্দশা সৃষ্টি হয়। মানুষের হক ও অধিকার লঙ্ঘিত হয়। মানুষ দুঃখ-দুর্দশা ও দুর্যোগের শিকার হয়। সমাজে বা দেশে অবাধে পাপাচার চলতে থাকলে জুলুম ও নিবর্তনমূলক, অনাকাঙ্ক্ষিত ও শ্বাসরুদ্ধকর এক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। সাধারণ মানুষের চরম মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। মানুষ সেই অসহনীয় পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ পেতে সদাতৎপর থাকে।

আদল বা ন্যায়বিচারকে ‘মাকাসিদ আল শরিয়াহ’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গিতে ন্যায়বিচারের লঙ্ঘন জুলুমের জন্ম দেয়। ন্যায়বিচারকে উপেক্ষা করা হলে জুলুমবাজির সম্প্রসারণ ঘটে। অথচ সমাজ থেকে জুলুমের মূলোৎপাটনের জন্য ইসলামের আবির্ভাব। ইসলামের আহ্বান এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন। জুলুমকে অন্যায়, অবিচার ও দুষ্কর্ম, দুর্নীতি, শোষণ ও নির্যাতনের সাথে তুলনা করা যায়। জুলুমের মাধ্যমে ব্যক্তির বৈধ হক বা অধিকারকে হরণ করা হয়। এর ফলে সমাজে দরিদ্রতা ও বঞ্চনার সৃষ্টি হয়। সুবিচার প্রাপ্তি থেকে মানুষকে বঞ্চিত করা হয়। সুতরাং সমাজে জুলুমের মাত্রা বৃদ্ধি পেলে মানুষ পরিত্রাণ লাভের জন্য পাগলপারা হয়ে ওঠে। দুঃশাসনের অবসানের জন্য মানুষ প্রবলভাবে পরিবর্তনকামী হয়ে ওঠে। সমাজ সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা সুতীব্রভাবে অনুভূত হতে থাকে।

জবাবদিহিতা দায়িত্ববোধ সৃষ্টিতে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে। আমাদের সবাইকে আল্লাহতায়ালার কাছে জবাবদিহি করতে হবে। আমাদের বিশ্বাস করতে হবে প্রত্যেকে তার অধীনস্থদের ক্ষেত্রে একজন তত্ত্বাবধায়ক। প্রতিটি মন্দ কাজের শাস্তি পেতে হবে প্রত্যেককে। প্রত্যেককে তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনের জন্য মহান আল্লাহতায়ালার কাছে জবাবদিহি করতে হবে। কেউ এর বাইরে নয়। কেউ পাপাচার করলে সে জন্য তাকে শাস্তি ভোগ করতে হয়। অন্য দিকে উত্তম বা ভালো কাজ করলে তাকে পুরস্কৃত করা হবে। পবিত্র কুরআন মজিদে ইরশাদ হয়েছেঃ ‘যারা পাপ করে তাদের অচিরেই তাদের পাপের সমুচিত শাস্তি দেয়া হবে।’ (৬ঃ১২০)। ইসলাম মানবজাতিকে প্রভুত্বের (ড়ৎলপড়ঢ়ভমহ) পরিবর্তে প্রতিনিধিত্বের (ংমধপড়পবপষধী) অধিকার প্রদান করেছে। প্রত্যেক ঈমানদার মূলত আল্লাহর প্রতিনিধি। সব ঈমানদারকে দায়িত্ব পালন করতে হবে তার মহান স্রষ্টা প্রদত্ত ক্ষমতা (উপলপবথয়পন হসাপড়) অনুযায়ী। সমাজ বা রাষ্ট্র পরিচালনা থেকে শুরু করে জীবনের সব ক্ষেত্রে স্রষ্টা নির্দেশিত মৌল কাঠামোর বাইরে কোনো কিছু করার অধিকার বা এখতিয়ার কোনো ঈমানদারের নেই। কোনো সময় ব্যত্যয় পরিলক্ষিত হলে সে ক্ষেত্রে জবাবদিহি অনিবার্য হয়ে পড়বে। একটি হাদিসে রাসূল সাঃ বলেছেনঃ ‘তোমাদের প্রত্যেক ব্যক্তিই দায়িত্বসম্পন্ন এবং তোমাদের প্রত্যেককেই আল্লাহর কাছে নিজ নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে।’ সুতরাং ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে নিজের খেয়ালখুশিমতো যা ইচ্ছা তাই করার এখতিয়ার অনেকটা ইসলামী শরিয়াহর নিয়মে নিয়ন্ত্রিত। এ বিবেচনায় মানুষকে বল্গাহীনভাবে স্বাধীনতা দেয়া হয়নি।

সমাজে বা রাষ্ট্রে সুশাসন না থাকলে অরাজকতা ও নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। এরূপ অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে দুর্নীতির ব্যাপক প্রসার ঘটে। প্রকৃতপক্ষে খোদাভীতি, জবাবদিহিতা, ন্যায়বিচারবোধ না থাকলে সুশাসন থাকে না। সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য নৈতিক শিক্ষা অপরিহার্য। সুতীব্র নৈতিকতাবোধ মানুষের মধ্যে দায়িত্বসচেতনতা সৃষ্টি করে। সমাজে সুশাসন না থাকলে মানুষের অধিকার অর্জিত হয় না। উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়, দুর্নীতির ব্যাপক প্রসার ঘটে। সমাজে বা রাষ্ট্রে সুশাসন নিশ্চিত করতে ধর্মীয় শিক্ষা ও মূল্যবোধভিত্তিক মেকানিজম বা কর্মকৌশল প্রয়োগ করতে হবে। এ মেকানিজম শুধু উপদেশমূলক হলে চলবে না­ এতে দায়বদ্ধতা, জবাবদিহিতা ও শাস্তির বিধান থাকতে হবে। ব্যক্তি বা সমাজ কল্যাণে দায়িত্বশীল সবার জন্য জোরালো উদ্বুদ্ধকরণ ব্যবস্থার উন্মেষ ঘটাতে হবে। আয় ও সম্পদের অসমতা দূর করতে হবে। এ জন্য সরকারের জনকল্যাণমুখী ইতিবাচক ভূমিকা থাকতে হবে। যাবতীয় সরকারি কর্মসূচি বা কার্যক্রমের মধ্যে বিশেষ করে সম্পদ ও আয়ের পুনর্বণ্টনের ক্ষেত্রে বণ্টনমূলক সুবিচারকে (উমঢ়য়ড়মদৎয়মংপ ঔৎঢ়য়মধপ) প্রাধান্য দিতে হবে।

সবচেয়ে নূøনতম পর্যায়ের জীবনমান অনুযায়ী প্রত্যেকের জীবনযাপনের অধিকার রয়েছে। এটি একটি অন্যতম মানবাধিকার। মানুষের জন্মগত মর্যাদার সাথে সঙ্গতিশীল জীবনযাপন করা সবার কাম্য। সমাজ বা রাষ্ট্র তদনুযায়ী জীবনযাপনের নিশ্চয়তা প্রদান করতে ব্যর্থ হলে সে সমাজ কল্যাণকর সমাজ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না। এ ধরনের সমাজ বা রাষ্ট্রে সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত করা যায় না। একটা বিষয় মনে রাখা দরকার, ইসলামে সামাজিক সুবিচার শুধু অর্থনৈতিক ক্ষেত্রের সুবিচার নয়। মানবজীবনের সব দিক, সব ক্ষেত্র এবং সব তৎপরতা ও কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সামাজিক সুবিচারের অন্তর্ভুক্ত। শুধু অর্থনৈতিক মূল্যবোধ দ্বারা সামাজিক সুবিচারের সফলতা বিচার করা যায় না। নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধসহ সব ধরনের শিক্ষা ও মূল্যবোধের সফল বাস্তবায়ন দ্বারা সামাজিক সুবিচারের সুফল নির্ণীত হবে।
ইসলাম একটি সমন্বিত ব্যাপক ধারণা। এটি অবিভাজ্য একটি জীবনদর্শন। বস্তুগত, বুদ্ধিবৃত্তিক, নৈতিক, অর্থনৈতিক, জাগতিক ইত্যাদি সব বিষয়সহ জীবনের কোনো একটি উপাদানও ইসলামে উপেক্ষিত হয়নি। ইসলাম যুগোপযোগী বাস্তবধর্মী কল্যাণকর একটি জীবনব্যবস্থা। স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনযাপনের জন্য যুক্তিসঙ্গত ও কল্যাণকর সমাজ পরিবর্তনে ইসলামের ভূমিকা ইতিবাচক। তবে সমাজ পরিবর্তনে লক্ষ্য হিসেবে শাশ্বত ও কল্যাণকর আদর্শ, অবিচ্ছেদ্য ঐক্য এবং পরিবর্তন আনয়নে নৈতিক মানসম্পন্ন একদল জনগোষ্ঠী দরকার।

**************************
আবু হেনা মোস্তফা কামাল
দৈনিক নয়া দিগন্ত, ১১ জুলাই ২০০৮