ইসলামের দৃষ্টিতে বিশ্বায়ন
- By Article Poster
- Published 07/12/2008
- অন্যান্য
- Unrated
এ যাবৎ অনেক সমাজ, সম্প্রদায় ও সমাবেশের পক্ষ থেকে বিশ্বায়ন খারাপ ধারণার মুখোমুখী হয়েছে। এর জ্বলন্ত প্রমাণ, যেসব শহরে বিশ্বায়নের সেমিনার হয়েছে সেখানে বিশ্বায়নবিরোধী বিক্ষোভসমূহ। আমরা বিশ্বাস করি, বিশ্বায়ন ইতিহাসের শেষ কথা হবে না। বিশ্বায়ন এক দিন কিন্তু বিলুপ্ত হবেই। এটা শুধু মুসলমানদের কথাই নয়, অন্যদের কথাও বটে। আমরা এ-ও বিশ্বাস করি যে, ইসলামের বিশ্বজনীনতা এবং তার বিশ্বায়ন মোকাবেলার সক্ষমতাই বিশ্বায়নের ক্ষতিকর প্রভাবগুলো বন্ধ করতে পারে। সব মুসলমানের দায়িত্ব ইসলামের সেই বিশ্বজনীনতা ও সার্বজনীনতা কার্যত প্রমাণ ও বাস্তবায়ন করার পূর্ণ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া। অর্থাৎ বিশ্বজনীন মানবতাবাদী ইসলামের বার্তাকে সব মানুষের সভ্যতারূপে প্রচার-প্রসার করা, যা তাদেরকে এক আল্লাহতায়ালার ইবাদত, তার হিদায়াত অনুসারে ন্যায়-ইনসাফ, দয়া-অনুগ্রহ প্রতিষ্ঠার দিকে আহ্বান করে। মুসলমানদের বুঝতে হবে, তারাই সর্বোত্তম জাতি। তারা সমগ্র বিশ্বের প্রতি হজরত মুহাম্মদ সাঃ-এর আনীত দাওয়াতের ধারক ও বাহক। তাদের কর্তব্য আল্লাহর পথে জিহাদ করা। মহান আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা রুকু করো, সিজদা করো, তোমাদের প্রতিপালকের ইবাদত এবং সৎ কর্ম করো যাতে সফল হতে পারো এবং আল্লাহর পথে যথার্থ জিহাদ করো।’ (হাজঃ ৭৭) জিহাদের অর্থ কেবলই যুদ্ধের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা এবং দাওয়াতকে শুধুই ওয়াজের মাঝে সীমিত করে ফেলা এটা ভুল। ফরজে কিফায়ার ব্যাপারে অন্যের ওপর নির্ভর করা, অন্যরা ফরজে কিফায়ার দায়িত্ব আদায় করবে এ অপেক্ষায় থাকা একটা বিভ্রান্তি। ইসলামের বার্তা শুধু দাওয়াতের একটি পন্থার পদ্ধতিতেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং সেটা সব মুসলমানেরই বার্তা।
মুসলমানদের পক্ষ থেকে যে দায়িত্বটি আদায় করা সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, শরিয়তের সঠিক নির্ভুল প্রয়োগ ও ব্যবহার। যাতে মুসলমানরা বিশ্বায়নের মুখোমুখি হওয়ার জন্য ইসলামী শৃঙ্খলাবদ্ধতার অস্ত্রে সজ্জিত হতে পারে। আর এই শৃঙ্খলাই মানুষকে উন্নীত করে এবং মৃত্যুপরবর্তী পরিণতির বিবেচনা ছাড়া শুধুই বস্তুগত ও অর্থনৈতিক প্রাচুর্য এবং সমৃদ্ধির মধ্যেই তার মনোযোগ সীমাবদ্ধ থাকে না।
মুসলমানদের পৃথক বিশ্বায়নে উদ্যোগী হতে সব মুসলমানকেই ইসলাম ও তার ইতিহাস থেকে উৎসারিত পূর্ণাঙ্গ স্ট্র্যাটেজি অনুসারে চলতে হবে। আর তা কার্যকর ও বাস্তবায়ন করতে প্রত্যেক বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিকেই অংশ নিতে হবে। পরিকল্পনা এবং শাসক-শাসিত এবং উলামা ও সভ্য সমাজের মাঝে সমন্বয়, পরস্পর সাহায্য-সহযোগিতা ছাড়া এ যুগে কোনো সফলতা সম্ভব নয়।
বিশ্বায়নের পরিবেশ থেকে আমাদের ইসলামী সভ্যতা-সংস্কৃতির বিকাশ ও বিস্তারের ক্ষেত্রে উপকৃত হওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এর জন্য প্রথমে আমাদেরকে আমাদের দীন-ধর্ম ও সভ্যতা সংস্কৃতি সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান ও পরিচয় লাভ করতে হবে। এরপর দেশ, জাতি, অঞ্চল নির্বিশেষে বিশ্বময় সেই সভ্যতার প্রসারের প্রচেষ্টা চালাতে হবে।
অর্থনৈতিক অঙ্গনে যা করতে হবে তা হলো, ইসলামী ভাবধারার ভিত্তির ওপর অর্থনীতিকে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। অর্থাৎ সত্যকে সত্য হিসেবে প্রমাণ করা। মুসলমানদের পারস্পরিক এবং অন্যান্য জাতি-গোষ্ঠীর সাথে লেনদেনের ক্ষেত্রে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা, জুলুম-অবিচার দূর করা। ইসলামী বিষয়াদির জন্য জীবনের সব বিষয়াদি সংশোধন, মুসলমানদের ঘর ঠিক, পারস্পরিক সম্পর্কোন্নয়ন এবং মুসলিম উম্মাহর বিভিন্ন দল- উপদলের মধ্যে বিরাজমান সঙ্ঘাত দূর করা একান্ত আবশ্যক। যৌথ ইসলামী বাজার প্রতিষ্ঠাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
পাশাপাশি ইসলামী বিশ্বের রাষ্ট্রগুলো, দল উপদলের শিক্ষা-সাংস্কৃতিক পূর্ণাঙ্গতা অর্জন এবং আঞ্চলিক সংস্থাগুলোয় অংশগ্রহণকালে বিশেষভাবে জাতিসঙ্ঘে, যার সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রায় এক-তৃতীয়াংশই ইসলামী রাষ্ট্রএ রাষ্ট্রগুলোকে ইসলামের খিদমতে একটি ইতিবাচক অবস্থান গ্রহণ করতে হবে। অনুরূপভাবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বায়ন যে পৃথক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব ফেলেছে সে সম্পর্কে মুসলিম ধর্মপ্রচারকদের যথেষ্ট জ্ঞান ও সম্যক অবগতি থাকতে হবে। অধিকাংশ যুগেই মুসলমানদের একটি স্বাতন্ত্র্য ও স্বকীয়তা ছিল। তা হলো, অন্যকে গ্রহণ করা। অন্যের প্রতি উদারতা প্রদর্শন করা এবং আপন পর সবাইকে সাহায্য করা।
ইসলামের সব দিক তথা আকিদা-বিধানাবলি, সৃষ্টিগত ও আচরণগত মূল্যবোধ সবকিছুর দাওয়াত প্রকৃত অর্থে এমন কিছু জ্ঞান ও শিক্ষা যা সব মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া আমাদের উচিত।
মুসলিম রেনেসাঁ এবং বিশ্বায়নের বিপদ মোকাবেলায় ইসলামী সাংস্কৃতিক পরিকল্পনা একটি বিশাল পরিকল্পনা বটে, যার জন্য ইসলামী রাষ্ট্র ও সংগঠনগুলো ও ব্যক্তির সমন্বিত পরিকল্পনা ও প্রচেষ্টা প্রয়োজন এবং এর জন্য মুসলমানদের আপন মূল্যবোধ ও আপন ভাষা আরবিকে আঁকড়ে ধরতে হবে।
(রাবেতাতুল আলামিল ইসলাম-ওয়ার্ল্ড মুসলিম লিগ আয়োজিত ‘বিশ্বায়ন ও মুসলিম উম্মাহ’ শীর্ষক সেমিনারে রাবেতার সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল্লাহ ইবন আব্দুল মুহসিন আততুরকির প্রদত্ত ভাষণের চুম্বক অংশগুলোর অনুবাদ। )
**************************
আব্দুল্লাহ ইবন আব্দুল মুহসিন আততুরকি
অনুবাদঃ মুফতী মুফীযুর রহমান
দৈনিক নয়া দিগন্ত, ১১ জুলাই ২০০৮