পরশ্রীকাতরতা দ্বারা মানুষের মনের এমন অবস্থাকে বোঝানো হয়ে থাকে যা দ্বারা অন্য মানুষের উন্নতিতে যৎপরোনাস্তি মনোস্তাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অন্যের ধন-ঐশ্বর্য-প্রভাব-প্রতিপত্তিতে মন যারপরনাই থাকে দুঃখিত। তাই মন চায় অন্যের ধ্বংসে জ্বলে উঠতে।
পরশ্রীকাতরতা আমাদের দেশে বহুল আলোচিত ও পরিচিত একটি বিশেষণ। এটা সমাজের আনাচে-কানাচে এমনকি খোদ ঘরে পর্যন্ত বহালতবিয়তে বিদ্যমান। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে অন্যের ক্ষতি করতে গিয়ে ধ্বংসাত্মক টর্নেডোর আকারে নিজের আমলনামায় কী পরিমাণ ক্ষতি করে তা আমরা জেনে-বুঝেও অনেক সময় ঈর্ষাকাতর মন না জানার মতো আচরণ করে থাকে। এমনই সর্বগ্রাসী আমাদের বিকার।
আমরা বুঝতেই চাই না অন্যের ধনসম্পদ, উন্নতি ও সম্মান বৃদ্ধিতে সমাজের শীর্ষে অবস্থান করলেও তাতে বিদ্বেষবিষ উচ্চারণ করার কোনো হেতু নেই।
সম্ভব হলে নিজে ধৈর্য ধারণ করে আল্লাহতায়ালার অশেষ কৃপা থাকলে বহু রৈখিক সংগ্রাম দ্বারা অচলাবস্থার দরোজা এক দিন খুলে আশার আলো দেখা দেবে। বস্তুত রাব্বুল আলামিনের সৃষ্টিরহস্য বোঝার ক্ষমতা আমাদের আদৌ আছে কি? কাউকে তিনি রাজা-বাদশাহ, ধনী, নির্ধন সুস্বাস্থ্য-রুগ্ণ করে বানিয়েছেন। কারো মর্যাদা অন্যের চেয়ে ওপরে বা নিচে করে দিয়েছেন। এর কোনোটাই কিন্তু আমাদের বোধগম্য নয়। তাই আল্লাহতায়ালা আমাদের যা দিয়েছেন তাতে অক্ষেপ না করে আমাদের শোকরানা আদায় করা উচিত। আমাকে যদি তিনি রুগ্ণ বানিয়ে থাকেন তাহলে ধরে নিতে হবে এর মধ্যেই হয়তো কোনো কল্যাণ নিহিত আছে। কারণ লাল গালিচা বিছিয়ে তিনি একজনের ভেতরে যা দিয়েছেন অন্যের ভেতর আদৌ তার লক্ষণ নাও থাকতে পারে। আবার অন্যকে যা দিয়ে তুষ্ট রাখতে চেয়েছেন তাতে সে ভাবছে তার জীবন অন্য রকম হওয়া উচিত ছিল। জীবন তার কাছে মসিলিপ্ত চ্যাপ্টার বই কিছু নয়। আমরা বুঝতে চাই না এসবই দু’দিনের দুনিয়ার লীলাখেলা। নিজের অজান্তে পাকানো দড়ির মতো পুড়ে শেষ হয়ে গেলেও আল্লাহতায়ালার ওপর গভীর বিশ্বাস থাকলে ঈমান মজবুত থাকলে অন্যের ভালোতে ঈর্ষার নীল চোখ জ্বলে ওঠার কথা নয়। অন্তর্জাত তাড়না থেকে আমাকে আল্লাহপাক যা দিয়েছেন তাতেই শান্তি-স্বস্তি থাকার কথা। সৃষ্টির মধ্যে ভিন্নতা না থাকলে নানা রূপ বিশৃঙ্খলা ও সঙ্কট দেখা দিত। কেউ কাউকে সম্মান বা মান্য করত না। যেমন, যাকে আল্লাহপাক গরিব বানিয়েছেন অনুভবের ব্যক্তিময়তার তার ভেতর এমন কোনো গুণ আছে যাতে সে পরিতৃপ্ত সুখী। এমনই শোকরানা আদায় করে নজরুল বলেছেন
‘একি আল্লাহর সাহায্য নয়, একি আল্লাহর কৃপা নয়? যেথা ছিল শুধু পরাজয় ভয়, সেথায় পাইলে জয়?’
কিন্তু অতীব পরিতাপের বিষয়, নিষ্ঠুর বাস্তব কোনো সময় ভিন্ন চিত্র দেয়। যেমন একজন ধনী যার সম্পূর্ণভাবে সুখী হওয়ার কথা আদতে কোনো পর্বতপ্রমাণ সমস্যায় সে গলদঘর্ম জীবনযাপন করছে। কাজেই বলা যেতে পারে সুখ একটা সাংঘাতিক সূক্ষ্ম অনুভূতি। যা এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তির মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করে। মহান সৃষ্টিকর্তা কুরআন মাজিদে ইরশাদ করেছেন, যারা অন্য বান্দার সুখ দেখে হিংসাত্মক হয়ে যায় তারাই আমার বণ্টন ব্যবস্থায় অসন্তুষ্ট হয়। অতএব মহান আল্লাহর ইশতেহার মেনে চলার মধ্যেই মঙ্গল নিহিত। তার ইজাজত ছাড়া কিছুই হয় না। বহু দৌড়ঝাঁপ করে অন্যের প্রভাব-প্রতিপত্তিতে ঈর্ষান্বিত হলে মনের অশান্তি বাড়ে। ইত্যবসরে খোদার খাতায় জমা হয় মহা শাস্তি। ক্যাচ টুয়েন্টি টুতে (প্যাঁচে পড়ে) পড়ে তার নেক আমল যাকে সে ঈর্ষা করছে তার খাতায় জমা হয়। বিফলতার চাদরে সে কারোই কোনো ক্ষতি করতে পারেন না উল্টো নিজে সর্বস্বান্ত হন। তাই বলা যায়, দু’দিনের দুনিয়ার এই কাল হরণের খেলায় আল্লহপাকের অশেষ কুদরতে আজ্ঞাবহ মানুষ ক্রমে উন্নতিও করতে পারে। এই ক্রেডিবিলিটি আল্লাহর রহমতে তার ওপর বর্তায়। এটাই নেক বান্দার লক্ষণ।
**************************
রেহানা ফারুক
দৈনিক নয়া দিগন্ত, ১১ জুলাই ২০০৮