প্রশ্নঃ আসসালামু আলাইকুম, কেমন আছেন স্যার!

উত্তরঃ ওয়ালাইকুমস সালাম ওয়ারহ’মাতুল্লাহ।

প্রশ্নঃ আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় ‘ইসলামও ও নারী অধিকার’। বিষয়টি একটু বিশেস্নষণ করবেন কি?

উত্তরঃ ইসলাম হচ্ছে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা। এখানে সকল দিক ও বিভাগের বর্ণনা সুনির্দিষ্টভাবে আলোকপাত করা হয়েছে। সে অনুযায়ী আমাদের নারীদের অধিকারের বিষয়টিও গুরুত্ব সহকারে উল্লেখ করা হয়েছে। এখন আসুন নারী অধিকার কি? সকল মানুষের এক একটি অধিকার আছে। যেমন- শিশু অধিকার, শ্রমিক অধিকার, ধর্মীয় অধিকার, রাজনৈতিক অধিকার, সামাজিক অধিকার ইত্যাদি ঠিক তদ্রূপ কেবলমাত্র নারীদের জন্য কিছু অধিকার আছে যা নারীদের ক্ষেত্রে সংরক্ষিত।

প্রশ্নঃ নারীর জন্য ইসলাম কি কি অধিকার দিয়েছে?

উত্তরঃ ইসলাম নারীর জন্য সকল প্রকার কল্যাণকর বাস্তবসম্মত ও বৈধ অধিকার দিয়েছে। যেমন-মা হিসাবে নারীর যে অধিকার ইসলাম দিয়েছে তা পৃথিবীর ইতিহাসে যুগ যুগ ধরে যশোগাঁথা হয়ে থাকবে। যেমন- একজন সাহাবী রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর কাছে গিয়ে বলেছিলেন, কাকে খেদমত করবো? রাসূল (সাঃ) বলেছেন, তোমার মাকে, তারপর কাকে? তোমার মাকে, তারপর কাকে? তোমার মাকে, তারপর কাকে? তোমার পিতাকে। এখানে দেখা যাচ্ছে মা হিসাবে নারী জাতিকে পিতার চেয়ে তিন গুণ অধিকার বেশি দিয়েছে। তাছাড়া রাসূল (সাঃ) বলেছেন, ‘জননীর পদতলে সন্তানের জান্নাত’। এতবড় অধিকারের কথা পৃথিবীর কোন ধর্মে তাদের নারীদেরকে দেয়নি। কন্যা হিসাবে নারীকে ইসলাম অধিকার দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, কারো যদি দু’টি কন্যা সন্তান হয়। আর সে যদি তাদেরকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করতে পারে এবং সৎ পাত্রে পাত্রস্থ করতে পারে তাহলে সে এবং আমি পাশাপাশি থাকব। একজন সাহাবী বললেন, যদি একজন কন্যা সন্তান হয়? রাসূল (সাঃ) বললেন, তাহলেও এই সম্মান ও অধিকার। স্ত্রী হিসাবে ইসলাম নারীদের সম্মান দিয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, সেই ব্যক্তি উত্তম যে তার স্ত্রীর নিকট উত্তম। বিদায় হজ্বের ভাষণে এবং ইন্তেকালের পূর্ব মুহূর্তে স্ত্রীদের অধিকারের ব্যাপারে সাবধান হওয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন। তদুপরি যে সময় নারীদের অধিকার বলে কিছুই ছিল না বরং নারীরা অসম্মান অমর্যাদার পাত্র বলে বিবেচিত এবং তাদের জীবন্ত কবর দেয়া হতো। পুতে ফেলা হতো গর্তের মধ্যে। এমতাবস্থায় ইসলাম তাদেরকে গর্তের ভেতর থেকে টেনে বের করে রাজসিংহাসনে আসন দিয়েছেন।

প্রশ্নঃ তাহলে মুসলিম বিশ্বে নারীদের পশ্চাৎপদতার কারণ কি?

উত্তরঃ মুসলিম বিশ্বে নারীরা পশ্চাৎপদ একথা সর্বাবস্থায় গ্রহণযোগ্য নয়। তবে অনেক আগে ধর্মীয় চর্চা কম হওয়ার কারণে এবং ধর্মীয় কিছু কুসংস্কার থাকার কারণে নারীদের কেবলমাত্র গৃহের অভ্যন্তরে আবদ্ধ রাখা হতো। কিন্তু মুসলিম বিশ্বে বর্তমানে এই অবস্থা কোথাও নেই। এখন ইসলাম ধর্মের যথেষ্ট চর্চা সকল স্থানে হচ্ছে। মানুষ সচেতন হচ্ছে। নারীরাও পুরুষের পাশাপাশি স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মিল, কল-কারখানায়সহ সামাজিক, অর্থনৈতিকসহ সকল স্তরে তারা সাফল্যের দৃষ্টান্ত স্থাপন করে চলেছেন। কারণ ইসলাম কখনো নারীদেরকে বলেনি যে, তারা গৃহের কাজ ছাড়া বা রান্না-বান্না ছাড়া অন্যান্য কাজ করতে পারবে না বরং শালীনতার সাথে সকল বৈধ ক্ষেত্রে তারা কর্মের মাধ্যমে অবদান রাখতে পারে। একটি দৃষ্টান্ত দিলে বোঝা সহজ হবে যে, এক মহিলা রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর কাছে এসে বলছেন, ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ (সাঃ) যুদ্ধে আমার স্বামী শহীদ হয়েছেন। এমতাবস্থায় আমার দেখাশোনা করার মত কেউ নেই। রাসূল (সাঃ) বললেন, তোমার স্বামী কি তোমার জন্য কিছুই রেখে যায়নি? সে বললো, একটি খেজুরের বাগান রেখে গিয়েছেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, ‘তাহলে ঐ খেজুরের বাগানে যাও এবং গাছের ডাটা কাটো এবং তা বাজারে বিক্রি করে নিজের জীবিকা নির্বাহ কর। এখানে স্পষ্ট বোঝা যায়, প্রয়োজনে একজন নারী বাইরে অবশ্যই আসার অধিকার রাখে। তবে তা হবে শালীনতার সাথে। এ সমস্ত বিষয়গুলো যারা চর্চা করেন তারা অবশ্যই বুঝবেন ইসলামই নারীদের কোন অধিকার অন্যায়ভাবে হরণ করেনি। তাই বলতে পারি বর্তমান মুসলিম বিশ্বে নারীরা আর অধঃপতিত ও অবহেলিত নেই। তারা পশ্চাৎপদ ও নেই। তবে এতটুকু বলা যেতে পারে যে, পাশ্চাত্য জগতে নারীরা স্বাধীনতার নামে যেভাবে তাদের স্বকীয় মর্যাদাকে বিলীন করছে এটার কোন অনুমতি ইসলামে না থাকায় মুসলিম বিশ্বের নারীরা উশৃঙ্খল ও বেলেল্লাপনা জীবন-যাপন না করতে পারাটাকে কিন্তু নারীদের সম্মানজনক অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে বলা যাবে না।

প্রশ্নঃ নারী অধিকার বাস্তবায়ন এর অন্তরায় কি?

উত্তরঃ নারীদেরকে তাদের অধিকার সম্বন্ধে আগে সচেতন হতে হবে। নারী অধিকার কি? এটা তাদের জানতে হবে। কোরআনের নাযিলকৃত প্রথম আয়াত হলো ‘ইকরা’ অর্থাৎ পড়। এই পড়তে বলার নির্দেশ কিন্তু আল্লাহতা’য়ালা কেবলমাত্র পুরুষদেরকে দেননি। সেহেতু নারীরা যদি জ্ঞান অর্জনে ব্রতী হয়। শিক্ষা-দিক্ষায় অগ্রগতি অর্জন করতে পারে তাহলে তাদের অধিকার সমাজে বাস্তবায়ন তরাম্বিত হবে। কারণ নারী অধিকার হরণ করা হয় সেই সব নারীদের যারা স্বল্প শিক্ষিত বা একেবারে শিক্ষিত নয়। যদি তারা জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে তাহলে তাদের অধিকার বাস্তবায়ন সম্ভব। তাছাড়া রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে নারী অধিকার বাস্তবায়নের জন্য গণজাগরণমূলক কর্মসূচি হাতে নিতে হবে তার মাধ্যমেও নারী অধিকার বাস্তবায়ন সম্ভব।

প্রশ্নঃ নারীদের অর্থনৈতিক অধিকারের বিষয়টি বিশেস্নষণ করবেন কি?

উত্তরঃ নারীদের অর্থনৈতিক অধিকার হলো- প্রথমতঃ পিতার সম্পত্তিতে মেয়ের যে অধিকার। এটা আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে বড়ই লজ্জাজনক একটি অধ্যায়। কারণ পিতার জীবদ্দশায় পিতা যদি মেয়ের নামে সম্পত্তির ঔরশি অংশ লিখে না দিয়ে যায় তাহলে দেখা যায়, ঐ মেয়েটির ভাইয়েরা আর ঐ মেয়েটিকে পিতার সম্পত্তিতে ভাগ বসাতে দেয় না। ভাইয়েরা বোনকে কেবলমাত্র আদর-আপ্যায়ন ও মেহমানদারীর মাধ্যমে পরিশোধ করতে চায়। আবার এটাও দেখা যায়, বোন যদি পিতার সম্পত্তি হতে তার অংশ নিতে চায় তাহলে ঐ ভায়ের সাথে তার বোনের আর মুখ দেখাদেখি থাকে না। যার ফলে বোন সারা জীবন স্বামীর সংসারে কষ্ট সহ্য করলেও ভাইয়ের কাছ থেকে তার সম্পত্তি নিতে সাহস পায় না। যার ফলে এই অধিকার হতে নারী জাতির অধিকাংশই বঞ্চিত হচ্ছে। তাছাড়া বিবাহের সময় যে দেনমোহর বাধা হয় এটা নারীর একটি অর্থনৈতিক অধিকার। কিন্তু এটা যেন ‘কাজীর গরু কিতাবে আছে, গোয়ালে নেই’ অবস্থা বিরাজমান। লাখ লাখ টাকা দেনমোহর বাধা হয়। অথচ তার পুরাটাই নামেমাত্র। সামান্য অংশও পরিশোধ করা হয় না। এ ব্যাপারে মেয়েটির জ্ঞানের স্বল্পতা। ঐ জামাই ছেলেটির ও অজ্ঞানতা। কারণ দেনমোহর হলো নারীর বৈধ অধিকার। এটা বিবাহ অনুষ্ঠানেই পরিশোধযোগ্য। কিন্তু বেশিরভাগ লোকই এটা পরিশোধ করে না। আবার কিছু ধুরন্ধর ও ধূর্ত লোক আছে যারা বাসররাতে স্ত্রীর নিকট থেকে মাফ চেয়ে নেয়। এর মাধ্যমে স্থায়ীভাবে ঐ মেয়েটি তার একটি বড় অধিকার হতে বঞ্চিত হয়। সুতরাং এ সমস্ত অধিকার বাস্তবায়ন করতে হলে অবশ্যই নারী-পুরুষ উভয়কেই সামাজিকভাবে সচেতন হতে হবে। তাছাড়া সমাজে কেবলমাত্র যে নারী অধিকার উপেক্ষিত তা কিন্তু নয়। ইসলামের কালজয়ী আদর্শ অনুযায়ী রাষ্ট্র ব্যবস্থা না চলার কারণে সমাজে প্রায় সকল ন্যায্য অধিকার অবহেলিত। যেহেতু ইসলামের অন্যান্য বিধানগুলো সমাজে বাস্তবায়ন নেই। সেহেতু নারী অধিকারের বাস্তবায়নও দীর্ঘমেয়াদী হচ্ছে।

প্রশ্নঃ অন্যান্য ধর্মে নারীর অবস্থান কি?

উত্তরঃ অন্যান্য ধর্মে নারীর অবস্থান জানার আগে ইসলামে নারীর অবস্থান কতটুকু এটা আগে পরিষ্কার হওয়া দরকার। ইসলাম কিন্তু নারীদেরকে সর্বোচ্চ সম্মান দান করেছে। ইসলামের এমন কোন দিক ও বিভাগ নেই যেখানে নারীদেরকে অবজ্ঞা করার সুযোগ আছে। বিবাহ নির্ধারণের মত একটি কঠিন নির্ধারণও নারীর হাতে আল্লাহ রেখেছেন। যেমন বিবাহের সময়- মেয়েটির নিকট থেকে আগে অনুমতি নেয়া হয় যে, তিনি এই বিবাহে রাজি আছেন কিনা। মেয়েটি যদি রাজি না থাকে তাহলে এই বিবাহ সংঘটিত হতে পারে না। তাছাড়া তালাকের বিধানও ইসলাম দিয়েছে যদি মেয়েটি ছেলেটির মধ্যে প্রতারণামূলক কিছু পায় তাহলে তাকে পরিহার করতে পারে। অন্যান্য ধর্মে এমন নারীদের মর্যাদাকর অধিকারের কথা পরিষ্কারভাবে জানা যায় না। যেমন ইহুদি ধর্মে তালাকের অধিকার কেবলমাত্র স্বামীর এবং বিয়েতে মেয়েদের মতামত অপ্রয়োজনীয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ইসলামে যেখানে সামাজিক নিরাপত্তা ও সম্মানের জন্য বিধবাদেরকে বিবাহ করতে উৎসাহিত করা হয়েছে। সেখানে হিন্দু ধর্মে কিছুকাল আগেও সতিদাহ প্রথা প্রচলিত ছিল। তাছাড়া খ্রীষ্ট ও বৌদ্ধধর্মেও নারীদের যে অধিকার দেয়া হয়েছে তার চেয়ে বহুলাংশে বেশি অধিকার ইসলাম নারীদের দিয়েছে।

প্রশ্নঃ পুরুষের পাশাপাশি নারীরা কিভাবে তাদের অধিকার ভোগ করছে?

উত্তরঃ আল হামদুলিল্লাহ। অতি সম্প্রতি ইসলামের বিভিন্ন বই পুস্তক ও সেমিনার সিম্পোজিয়াম ও ওয়াজ মাহফিলের মাধ্যমে ইসলামের বিভিন্ন বিষয় সঠিকভাবে উপস্থাপনের যে কাজ চলছে। তার মাধ্যমে বর্তমান সময়ের মেয়েরাও ইসলামী জ্ঞান অর্জনে পিছিয়ে নেই। তাছাড়াও বিভিন্ন সামাজিক এবং জাতীয় প্রতিষ্ঠানে শিক্ষিত মুসলিম মেয়েরা পুরুষের পাশাপাশি সমাজ ও জাতীয় উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। তদুপরি পুরুষের পাশাপাশি মেয়েরা একই সাথে শিক্ষা-দীক্ষায় ও চাকরি-বাকরি করছে এবং আত্মবিশ্বাসী শিক্ষিত মেয়েরা নিজেদের অধিকার-এর ব্যাপারে সচেতন হচ্ছে।

প্রশ্নঃ সমাজ বাস্তবতার নিরিখে কিভাবে নারী উন্নয়ন সম্ভব?

উত্তরঃ যদিও বর্তমানে নারী অধিকার বাস্তবায়নমূলক কিছু সচেতনতা তৈরি হয়েছে। কিন্তু বাস্তবের চাহিদা অনুপাতে তা অপ্রতুল। এ প্রসঙ্গে নারী উন্নয়নের ধারাকে গতিশীল করতে হলে কয়েকটি বিষয়ের দিকে আমাদের নজর দেয়া উচিত বলে আমি মনে করি। যেমন- ১· মেয়েদেরকে ইসলামের আলোকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলা ২· সামাজিকভাবে ইসলামের মৌলিক অধিকারের ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি ৩· সার্বিকভাবে সমাজের বিভিন্ন স্তরে নারী অধিকারের মৌলিক বিধানগুলোর বাস্তবায়ন তরাম্বিত করা।

প্রশ্নঃ নারীবাদ ও নারী প্রগতিবাদ বলতে কি বুঝি?

উত্তরঃ এক কথায় নারীবাদ ও নারী প্রগতিবাদ বলতে সমাজে নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন। সেটা উপরোক্ত পর্যালোচনার আলোকে ইসলাম স্বীকৃত। কিন্তু তথাকথিত নারীবাদ ও নারী প্রগতিবাদীরা ইসলামের বাইরে নারীদের উন্নয়নের জন্য যে সমস্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করছে তা সমাজে নারীদের সম্মান ও মর্যাদাকে অনেকাংশে ভূলুণ্ঠিত করছে। নারীবাদী ও নারী প্রগতিবাদীরা যদি ইসলামের কালজয়ী আদর্শে তাদের কার্যক্রম পরিচালিত করে তাহলে নারী অধিকার ও উন্নয়ন সামগ্রিকভাবে সাফল্যমণ্ডিত হবে বলে আমি মনে করি।

************************
সাক্ষাৎকার গ্রহণে-
মাওলানা জাকির হোসাইন আজাদী
দৈনিক ইত্তেফাক, ১১ জুলাই ২০০৮