স্মরণকালের ভয়াবহতম সাইক্লোনগুলোর একটি ঘটে গেল গত ১৫ নভেম্বর রাতে। দেশের উপকূলীয় বিশটি জেলার ওপর দিয়ে ঘণ্টায় প্রায় ২৪০ কিলোমিটার বেগে বয়ে যাওয়া ঘূর্ণিঝড়ে বিপুল ক্ষয়ক্ষতির শিকার হতে হয়েছে এখানকার মানুষকে। কমপক্ষে দশ হাজার বনি আদম দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছে এতে। আহত হয়েছে আরো বেশি। গৃহহারা, সম্পদহারা হয়েছে লাখ লাখ মানুষ। পালিত ও বন্য পশু-পাখির প্রাণহানি অপূরণীয়। গাছপালা ও ফসল ধ্বংস হয়ে গেছে গোটা এলাকায়। বিশেষ করে সুন্দরবনের গাছ ও জীব-বৈচিত্র্যের যে ক্ষতি হয়েছে তার পরিমাণ নির্ণয় করা দুরূহ। স্বাভাবিক পরিস্থিতি বজায় থাকলেও এ ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে বিশ বছরেও কুলাবে না বলে বিশেষজ্ঞরা মন্তব্য করছেন। বন্যার ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার আগেই দেশের মানুষ আরেক আকস্মিক দুর্যোগের শিকার হলো। অসংখ্য মানুষ দুর্গতির মধ্যে পড়েছে। অবশ্য সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে যথাসাধ্য চেষ্টা চালানো হচ্ছে দুর্গতদের সহায়তা করার।
পৃথিবীতে বিপর্যয় ও দুর্যোগের ঘটনা নতুন নয়। স্মরণাতীতকাল থেকেই এসব ঘটনার সাক্ষী হয়ে আছে আশরাফুল মাখলুকাতের ঠিকানা পৃথিবী নামক গ্রহটি। মানব জাতির ইহ ও পরকালীন জীবনের সার্বিক কল্যাণ ও সাফল্যের চূড়ান্ত নির্দেশিকা গ্রন্থ আল কুরআনুল কারিমেও বেশ কয়েকটি ভয়াবহ ধ্বংসলীলার উল্লেখ রয়েছে। তেমনি আখেরী নবী হজরত মোহাম্মদ সাঃ-এর হাদিসেও আছে আগের যুগের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর ওপর ঘটে যাওয়া ভীষণ ঘটনাবলির বিবরণ। আর এ ধরনের ঘটনার সময়ে মুমিন বান্দাদের করণীয় কী, তারও উল্লেখ রয়েছে কুরআন মজিদ ও হাদিস শরিফে।
কেন এসব ভয়াবহ ঘটনা ও ধ্বংসলীলা সংঘটিত হয়? প্রথমত, মহান আল্লাহর অসীম কুদরতের প্রকাশ ঘটে এগুলোর মাধ্যমে। বিশ্বজগতের পরিচালন, প্রতিপালন ও নিয়ন্ত্রণ যে তাঁরই একচ্ছত্র ক্ষমতার অধীনে তার প্রকাশ ঘটানো হয় এভাবে। মহাবিশ্বের সব কিছু একটি নিয়ম মেনে চলে। এই নিয়মকে সাধারণভাবে প্রাকৃতিক বিধান বলা হয়। রাব্বুল আলামিন যে শৃঙ্খলা ও ব্যবস্থাপনায় জগতের সবকিছু পরিচালনা করছেন, আমাদের কাছে তা প্রকৃতি নামে পরিচিত। এই ব্যবস্থাপনা ও শৃঙ্খলা অত্যন্ত সংহত। কিন্তু এরও পেছনে যে এক মহাশক্তির নিয়ন্ত্রণ ক্রিয়াশীল। তা মানুষ উপলব্ধি করতে পারে অস্বাভাবিক ঘটনাবলির সময়ে। স্বাভাবিকতার মধ্যেও যে অস্বাভাবিকতা আসতে পারে। নিয়মের কঠোর বন্ধনও যে ঢিল হয়ে যেতে পারে, তা প্রত্যক্ষ করে মানুষ অনুভব করতে সক্ষম হয় নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী এক সত্তার অস্তিত্ব। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির চরম উন্নতি সত্ত্বেও পৃথিবীর সেরা জীব শ্রেণীটি নিজেদের অসহায়ত্ব ও সীমাবদ্ধতার সন্ধান পায় এ ধরনের সময়ে। মহাবিশ্বে সবচেয়ে ক্ষমতার অধিকারী দাবিদার হয়ে আদম সন্তানরা সীমা লঙ্ঘন থেকে সংযত হতে পারে অস্বাভাবিক পরিস্থিতির সামনে। জগৎ নিয়ন্তার অপার ক্ষমতার সামনে মস্তক অবনত করার প্রেরণা জোগায় ঘূর্ণিঝড় ও সুনামির মতো বিপর্যয়ের কারণগুলো।
দ্বিতীয়ত, পৃথিবীতে বিপর্যয় ঘটে মানুষের অন্যায় কাজের প্রতিফল হিসেবে। কুরআন মজিদে এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে জলস্থলে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে মানুষের কৃতকর্মের কারণে, যাতে তিনি (আল্লাহ) তাদেরকে তাদের কিছু কাজের প্রতিফল আস্বাদন করান। (সূরা রুম-৪১)। অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, তোমাদের যে বিপদই আসে তা তোমাদের কৃতকর্মের কারণে, আর তিনি (আল্লাহ) অনেকটাই ক্ষমা করে দেন। (সূরা শূরা-৩১)। পৃথিবীতে এসে আল্লাহর নাফরমানি করতে করতে মানুষ যখন সীমা ছাড়িয়ে যায়, তখন তাদের ওপর নেমে আসে খোদায়ী শাস্তি, যা প্রতিরোধ করার ক্ষমতা মানুষের থাকে না। কুরআন মজিদে আদ, ছামুদ প্রভৃতি জনগোষ্ঠীর ওপর ভীষণ গজব নাজিল হওয়ার বর্ণনা রয়েছে। তা ছাড়া আল্লাহ তায়ালা মহাবিশ্বের পরিচালনায় যে নিয়ম ও শৃঙ্খলা দিয়েছেন, মানুষ যখন তা লঙ্ঘন করে, তখনো বিপর্যয় ঘটে। জলবায়ুর পরিবর্তন ও পৃথিবীর তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে যাওয়ার পেছনে যে মানুষেরই অদূরদর্শী ও অসংযমী আচরণ দায়ী তা বারবার উচ্চারিত হচ্ছে বিজ্ঞানী মহলে। গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণের মাত্রা কমিয়ে না আনলে সাইক্লোন-সুনামির মতো ঘটনার ঘন ঘন আবির্ভাব পৃথিবীতে মানুষের বসবাস কঠিন করে তুলবে বলে তারা হুঁশিয়ার করে দিচ্ছেন। এভাবে মনুষ্যসৃষ্ট বিপর্যয় মানুষকে সংযমী জীবন ও দায়িত্বশীল আচরণের প্রণোদনা দেয়।
পৃথিবীতে আপদ ও দুর্বিপাকের তৃতীয় কারণ মানুষকে পরীক্ষা করা। যেকোনো পরিস্থিতি ও অবস্থা যে আল্লাহরই পক্ষ থেকে আসে, তা বিশ্বাস করা ঈমানের অপরিহার্য অংশ। আর সে জন্য ধৈর্য ধারণ করা মুমিনের কর্তব্য। এ প্রসঙ্গে কুরআন মজিদে বলা হয়েছে আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব কিছুটা ভীতি, ক্ষুধা ও জান-মাল-ফসলের ক্ষতির মাধ্যমে। আর সুসংবাদ দিন ধৈর্যশীলদের, যারা যখন তাদের কোনো বিপদ হয়, তখন বলে নিশ্চয় আমরা আল্লাহর জন্য নিবেদিত এবং আমরা তাঁরই কাছে ফিরে যাব। (সূরা বাকারা- ১৫৫-১৫৬)। বিপদ-বিপর্যয়ের সময় পরীক্ষা হয় কে আল্লাহর ওপর ভরসা করে আর কে করে না। যারা আক্রান্ত হয়, তাদের পরীক্ষা নেয়া হয় ঈমান ও ধৈর্যের। আর যারা সুস্থ থাকে তাদের পরীক্ষা হয় আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রতি কর্তব্য পালনের।
আরেকটি কারণ উল্লেখ করা যায়। সৃষ্টি জগতে আল্লাহর কুদরত ও আচরণে রহস্যের শেষ নেই। ভাঙা আর গড়াই আল্লাহর রাজ্যে নিয়মিত ব্যাপার। এতে কী রহস্য তা তিনিই জানেন। আপাতদৃষ্টিতে মানুষ কোনো কারণ খুঁজে পায় না অনেক ক্ষেত্রে। অনেক ঘটনার যৌক্তিকতা নির্ণয়ে ব্যর্থ হয় মানুষের সব বিদ্যা ও বুদ্ধিবৃত্তি। সুতরাং স্রষ্টার ইচ্ছা ও পরিকল্পনার কাছে হার মানতে হয় সবার সেরা জীব মানুষকে। মেনে নিতে হয় খোদায়ী লীলা।
বিপর্যয় ও দুর্যোগের সময় ঈমানদার ব্যক্তিরা যেসব শিক্ষা লাভ করে এবং যেসব করণীয় তাদের ওপর বর্তায়, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রথমত, আল্লাহর অসীম কুদরত অনুধাবন ও তাঁর সমীপে নিজের সার্বিক নিবেদন। একনিষ্ঠ মনে তাঁর প্রতি আনুগত্য ও বাধ্যতার অঙ্গীকার করতে হয় সব সময়। কিন্তু এসব ঘটনায় এই মানসিকতা অবশ্যই সজীব থাকতে হয়। দ্বিতীয়ত, নিজেদের পাপ ও অন্যায় কাজের ব্যাপারে কখনই নির্ভয় হওয়া উচিত নয়। যেকোনো মুহূর্তে আল্লাহর পক্ষ থেকে পরোয়ানা আসতে পারে এমন প্রস্তুতি থাকা প্রয়োজন প্রত্যেক মুসলমানের। তাই কোনো পাপ বা অন্যায় হয়ে গেলে অবিলম্বে তওবা করা মুমিনের বৈশিষ্ট্য। অস্বাভাবিক ঘটনার সময়ে তওবা ইস্তিগফার ও আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করতে মহানবী সাঃ উপদেশ দিয়েছেন। আল্লাহ থেকে বিমুখ হওয়া ও অন্যায় কাজের পরোয়া না করা খুবই অকল্যাণকর। তৃতীয়ত, যারা হতাহত হয়েছে তাদের প্রতি কিছুতেই এমন মনোভাব পোষণ করা সঠিক নয় যে, তারা পাপী। কেননা পাপের শাস্তি হিসেবে বিপর্যয় ঘটলেও তার শিকার হয় ভালো-মন্দ সব শ্রেণীর মানুষ। যারা প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তারাই যে অন্যায় করছিল, এমনটি নয়। অন্যদের পাপের ফলে নিরপরাধ মানুষও দুনিয়াতে দুর্ভোগ পোহায়। কিন্তু এ জন্য আখিরাতে তারা শুধু নাজাত নয়, প্রতিদানও লাভ করবে। যারা প্রকৃত অপরাধী, তারা দুনিয়াতে পার পেয়ে যেতে পারে। কিন্তু আখিরাতে অবশ্যই শাস্তি পেতে হবে তাদের।
চতুর্থত, কোনো দুর্যোগের আলামত দেখা গেলেই আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা প্রয়োজন। মহানবী সাঃ যেকোনো দুশ্চিন্তা ও আশঙ্কার সময়ে নামাজ আদায় করে আল্লাহর কাছে দোয়া করতেন। কুরআন মজিদে এটাই বলা হয়েছে হে মুমিনরা, তোমরা সাহায্য প্রার্থনা কর নামাজ ও ধৈর্যের মাধ্যমে। নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে রয়েছেন। (সূরা বাকারা ১৫৩)।
পঞ্চমত, ক্ষতিগ্রস্ত লোকদের সহায়তা করা সুস্থ ব্যক্তিদের অপরিহার্য কর্তব্য। যারা নিহত হয়, তাদের জানাজা, দাফন ইত্যাদি সম্পন্ন করা। তাদের জন্য মাগফিরাতের দোয়া করা এবং তাদের আপনজনদের সান্ত্বনা দেয়া নবীজী সাঃ-এর সুন্নত। আর যারা আহত হয়, তাদের চিকিৎসা ও সেবায় কোনো ত্রুটি না করা অন্যদের দায়িত্ব। সাধারণভাবে দুর্গতদের প্রতি সদয় হওয়া ও তাদের প্রয়োজনাদি মেটানোর জন্য সাধ্যমতো চেষ্টা করা উচিত। তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। ব্যক্তিগত পর্যায়ে প্রাথমিক সহায়তা হতে পারে। কিন্তু স্থায়ী ব্যবস্থা ও পুনর্বাসনের জন্য সামষ্টিক উদ্যোগের কোনো বিকল্প নেই।
***************************
লেখকঃ লিয়াকত আলী
উৎসঃ দৈনিক নয়াদিগন্ত, ৩০ নভেম্বর