ঘুর্ণিঝড় অধিকাংশ সময় অনেক ধ্বংসযজ্ঞের কারণ। আমাদের দেশে প্রতিবছর ঘুর্ণিঝড় সংঘটিত হয়। মাঝে মাঝে তা ব্যাপক ধ্বংস, অনিষ্ট ও কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আবহাওয়া বিজ্ঞানীরা ঘুর্ণিঝড়ের গতি-প্রকৃতি বিশ্লেষণ করে নানা শ্রেণীতে একে ভাগ করেছেন। কিছুদিন আগে ঝড় ও জলোচ্ছ্বাস আমাদের উপকুলবর্তী অঞ্চলে ব্যাপক ধ্বংস বয়ে আনে। অতিসম্প্রতি মিয়ানমারে লক্ষাধিক লোকের প্রাণ সংহার হয়েছে ‘নার্গিস’ নামের এ ঘুর্ণিঝড়ের দ্বারা। প্রকৃতপক্ষে ঘুর্ণিবায়ু প্রবল হয়ে প্রবাহিত হলে তখন তাকে ঘুর্ণিঝড় বলে।

পবিত্র কোরআন মজিদে বেশ কয়েকটি স্হানে ঝড়ের উল্লেখ লক্ষ্য করা যায়। শুধু ঝড় কেন জলবায়ুর অন্যতম উপাদান বায়ু, বৃষ্টি ও পানি সম্পর্কেও বর্ণনা লক্ষ্য করা যায়। তবে বর্ণনার ভঙ্গি ও প্রেক্ষাপট ভিন্ন ভিন্ন এবং তাৎপর্যপুর্ণ। এসব বর্ণনা বিশ্লেষণ করলে অভিভুত হতে হয়। এগুলো শুধু তাৎপর্যপুর্ণ নয়-অনেক বিস্ময়কর এবং বিজ্ঞানভিত্তিক। পবিত্র কোরআন মজিদের ১১৪টি সুরার ৬ হাজার ৬৬৬টি আয়াতের মধ্যে ৫১টি সুরার প্রায় ১০০টি আয়াতে জলবায়ু বিজ্ঞান সম্পর্কিত শব্দ বা শব্দাবলী বিষয়ে বর্ণনা রয়েছে। আবহাওয়া বিজ্ঞান সংশ্লিষ্ট বিষয় যেমন-বৃষ্টিপাত, বায়ু প্রবাহ, মেঘ, বজ্রপাত, ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বিদ্যুৎ চমক, শিলাবৃষ্টি ইত্যাদি আলোচিত হয়েছে।
পবিত্র কোরআন মজিদে সুরা মুরসালাতে বর্ণিত হয়েছেঃ ‘শপথ কল্যাণস্বরুপ প্রেরিত বায়ুর, আর প্রলয়ঙ্করী বায়ুর, শপথ সঞ্চালনকারী বায়ুর আর মেঘপুঞ্জ বিচ্ছিন্নকারী বায়ুর, ... ... ... নিশ্চয়ই তোমাদের যে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে তা অবশ্যম্ভাবী’ (৭৭: ১-৪, ৭)। পবিত্র এ আয়াতগুলোয় চার প্রকার বায়ুর উল্লেখ লক্ষ্য করা যায়। আবহাওয়া বিজ্ঞানে বিশেষজ্ঞদের মতানুযায়ী বাস্তবে চার ধরনের বায়ুর অস্তিত্ব অত্যন্ত সহজে অনুধাবন করা যায়। এক প্রকার বায়ু সব জীবের দেহ ও প্রাণ এবং পরিবেশকে সতেজ ও শীতল করে। আরেক প্রকার বায়ু আকাশের মেঘমালাকে ছড়িয়ে দেয়, বিস্তৃত করে যা বৃষ্টিপাত ঘটাতে সাহায্য করে। ভিন্ন আরেক ধরনের বায়ু বা বায়ুপ্রবাহ বৃষ্টিপাতের পর ভাসমান মেঘমালাকে অন্যত্র সরিয়ে দেয়, মেঘমালাকে বিচ্ছিন্ন করতে সাহায্য করে। আর প্রলয়ঙ্করী বায়ু যাকে আমরা ঘুর্ণিবায়ু হিসেবে অভিহিত করতে পারি। বায়ুর এ ধরনের ভিন্ন ভিন্ন রুপ বা বৈশিষ্ট্য মুলত মহান আল্লাহতায়ালার অসীম শক্তিমত্তা ও কুদরাতের বহিঃপ্রকাশ।

পবিত্র কোরআনুল কারীমে সুরা হাককা-য় ঝঞ্ঝাবায়ুর উল্লেখ দেখা যায়। ইরশাদ হয়েছেঃ ‘আর আদ সম্প্রদায়, ওদের ধ্বংস করা হয়েছিল এক প্রচন্ড ঝঞ্ঝাবায়ু দ্বারা, ... ... ... (৬৯:৬)।’ সুরা হা-মীম-এ অনুরুপ আরেকটি বর্ণনা লক্ষ্য করা যায়। ইরশাদ হয়েছেঃ ‘অতঃপর আমি উহাদিগকে পার্থিব জীবনে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি আস্বাদন করার জন্য উহাদের বিরুদ্ধে প্রেরণ করেছিলাম ঝঞ্ঝাবায়ু অশুভ দিনে (৪১: ১৬)।’ আদ সম্প্রদায় নিজেদের নিয়ে খুব অহঙ্কার ও গর্ব করত। আল্লাহতায়ালা সাত রাত ও আটদিনব্যাপী প্রচন্ড তুফান দ্বারা তাদের ধ্বংস করে দেন।

ঝঞ্ঝাবায়ু সম্পর্কে ভুগোলে বর্ণিত হয়েছে এটা এমন ধরনের ঝড় যে ক্ষেত্রে অল্প পরিসর দিয়ে ঘুর্ণায়মান বাতাস খুব দ্রুতবেগে প্রবাহিত হয়। ঘণ্টায় এর গতিবেগ হয় ২০০ থেকে ৫০০ কিলোমিটার পর্যন্ত। এ ধরনের ঝড়ের কেন্দ্রে বাতাসের চাপ এত কম থাকে যে, এর গতিপথে কোনো কিছু পড়লে তা শোষিত হয়ে উপরে উঠতে থাকে। এর আরেকটি বৈশিষ্ট্য ধাবমান ঘুর্ণি হাওয়া এত দ্রুত আয়তনে বৃদ্ধি পায় যে, গতিপথে দালান-কোঠা পর্যন্ত চুরমার করে কাগজ টুকরার মতো উড়িয়ে নিয়ে যায়। ঝঞ্ঝাবায়ু বা টর্নেডো হলে প্রচন্ড শব্দসহ বজ্রপাত হয়। বজ্রপাতের প্রভাবে গাছপালা, বাড়িঘর পুড়ে হয়ে যায়।
পবিত্র কোরআনুল কারীমে সুরা বনী ইসরাইলে ঝঞ্ঝা ঝড়ের উল্লেখ পাওয়া যায়। এ সুরায় ইরশাদ হয়েছেঃ ‘তোমরা কি নির্ভয় হয়েছো যে, তিনি ... ... তোমাদের ওপর শিলা বর্ষণকারী ঝঞ্ঝা প্রেরণ করবেন না (১৭ঃ ৬৮)? পরের আয়াতেও বর্ণিত হয়েছেঃ ‘অথবা তোমরা কি নির্ভয় হয়েছো যে, তিনি ... ... ... তোমাদের বিরুদ্ধে প্রচন্ড ঝটিকা পাঠাবেন না ... ... ... (১৭: ৬৯)।’ মহান আল্লাহতায়ালা অসীম শক্তির অধিকারী। তিনি কাউকে শাস্তি দিতে মনস্হ করলে কেউই তা থেকে রক্ষা পেতে পারবে না। আল্লাহর প্রতি ঈমান না আনার কারণে আদ জাতির ওপর গজব নাজিল করেন। ঔদ্ধত্য ও অহঙ্কারের শাস্তি হিসেবে আল্লাহতায়ালা আদ জাতির ওপর তিন বছর পর্যন্ত বৃষ্টিপাত সম্পুর্ণরুপে বন্ধ রাখেন। সেখানে শুধু শুষ্ক বায়ু চলাচল করত। অতঃপর এক পর্যায়ে সাত রাত ও আট দিন যাবৎ নিরবচ্ছিন্নভাবে গজব অব্যাহত থাকে।

কোরআন পাকের সুরা জারিয়াতে ধুলিঝড়ের বর্ণনা পাওয়া যায়। ইরশাদ হয়েছেঃ ‘শপথ ধুলিঝঞ্ঝার, ... ... ... (৫১:১)।’ ভুগোলে বর্ণিত হয়েছে শুষ্ক অঞ্চলের ওপর দিয়ে মুলত ধুলিঝড় প্রবাহিত হয়। আরব ও আফ্রিকার মরুজমিতে প্রবাহিত ‘সহিমুম’, সুদানে ধুলিঝড়কে ‘হাববুস’ এবং পাকিস্তান ও ভারতে ধুলিঝড়কে ‘লু’ বলে। ধুলিঝড়ের কারণে পরিবেশ অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে যায় এবং কোনো কিছু দৃষ্টিগোচর হয় না। কোরআন পাকে সুরা ইবরাহীমে বর্ণিত হয়েছেঃ ‘যারা তাদের প্রতিপালককে অস্বীকার করে তাদের উপমা তাদের কর্মগুলো ভস্মসদৃশ, যা ঝড়ের দিনের বাতাস প্রচন্ডবেগে উড়িয়ে নিয়ে যায় (১৪: ১৮)।

সুরা কামারে ইরশাদ হয়েছেঃ ‘আমি উহাদের উপর প্রেরণ করেছিলাম প্রস্তর বহনকারী প্রচন্ড ঝটিকা, ... ... ... (৫৪: ৩৪)।’ প্রস্তর বহনকারী প্রচন্ড ঝটিকা লত (আ.)-এর কওমকে ধ্বংস করেছিল। উল্লিখিত আয়াতে আল্লাহকে অস্বীকারকারীকে ছাইভস্মের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।

ঝড় একটি প্রাকৃতিক ঘটনা। ঝড় কখনো ঝঞ্ঝাবায়ু, কখনো প্রস্তর বহনকারী ঝটিকা, কখনো ধুলিঝড়, কখনো সাইক্লোন বা টর্নেডো হিসেবে আঘাত হেনেছে। পবিত্র কোরআন মজিদে বিভিন্ন সুরায় ঝড়ের নানারুপ উল্লেখ লক্ষ্য করা যায়। ঝড় কখনো গজব হিসেবে আঘাত হেনেছে কয়েকটি জাতির ওপর। আল্লাহর নাফরমানি বা কুফরীর কারণেও কখন ঝড় মানবজাতির ওপর আপতিত হয়েছে। যারা আল্লাহর সঙ্গে নাফরমানী করে, কুফরী করে, নবী রাসুলগণের দাওয়াত প্রত্যাখ্যাত করেছে, সীমাহীন অহঙ্কার, গর্ব ও দম্ভ প্রদর্শন করেছে আল্লাহতায়ালা ছাইভস্মের মতো ঝড় দ্বারা তাদের ধ্বংস করে দিয়েছেন। কখনো আবার সীমালঙ্ঘনকারী একটি গোষ্ঠীর কারণে এ ঝড়ের কবলে পড়ে অনেক নিরপরাধ, নিষ্পাপ মানুষও ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যান। দুনিয়ার জীবনে একের তাপে আরেকজনের ভোগার নিদর্শন বহু। অবশ্য আখেরাতে প্রতিটি মানুষই যার যার কর্ম অনুযায়ী ফলভোগ করবেন।

সুতরাং ঝড় আল্লাহর অসীম শক্তির এক স্বাক্ষর। আল্লাহতায়ালা চাইলে ঝড় দ্বারা সীমালঙ্ঘনকারীদের শাস্তি প্রদান করতে পারেন। আমরা সব সময় ঝড়-ঝঞ্ঝা, টর্নেডো, সাইক্লোন, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, ভুমিকম্প ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে আল্লাহর কাছে পানাহ চাই।

**************************
আ বু হে না মো স্ত ফা কা মা ল 
আমার দেশ, ১৩ জুলাই ২০০৮