বিদায় হজের শাশ্বত পয়গাম
- By Article Poster
- Published 12/9/2007
- হজ্জ্ব
- Unrated
দশম হিজরি শেষ নাগাদ আরব উপদ্বীপের সর্বত্র ইসলামের জয়জয়কার সুচিত হয়। পবিত্র ও মহান হজের দিন প্রিয় নবী (সা.) আরাফাতের মাঠে শুভাগমন করলেন এবং সেখানেই অবস্হান করলেন। পরে যখন সুর্য পশ্চিম দিকে ঢলে পড়তে লাগল তখন তিনি (স্বীয় বাহন) কসওয়াকে আনার জন্য হুকুম দিলেন। উটনিকে প্রস্তুত করে পেশ করা হলে তিনি তার উপর সওয়ার হলেন এবং সমতল ক্ষেত্রে উপস্হিত হয়ে এক ঐতিহাসিক ভাষণ দান করলেন। তিনি আল্লাহতায়ালার হামদ ও প্রশংসার মাধ্যমে ভাষণ শুরু করলেন-
* আল্লাহ ছাড়া আর কোনো মাবুদ নেই। তিনি একক। কেউই তাঁর সমকক্ষ নয়। আল্লাহতায়ালা স্বীয় প্রতিশ্রুতি পুর্ণ করেছেন। তিনি তাঁর বান্দাকে সাহায্য করেছেন এবং তাঁর একক সত্তাই বাতিলের সামগ্রিক শক্তিকে পরাভুত করেছে।
* হে মানবমন্ডলী, তোমরা আমার কথা শোন। আমি জানি না যে, এরপর এভাবে আর কোনো মজলিসে আমি তোমাদের সঙ্গে পুনরায় একত্রে মিলিত হতে পারব কিনা।
* হে উপস্হিত সকল, আল্লাহতায়ালা এরশাদ করেছেন, হে মানব জাতি আমি তোমাদিগকে একজন পুরুষ ও একজন নারী হতে পয়দা করিয়াছি এবং পরে তোমাদের দল ও গোত্রে বিভক্ত করে দিয়েছি, যেন তোমরা একে অন্যের সঙ্গে পরিচিত হতে পার। তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই আল্লাহর দরবারে অধিকতর সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী, যে আল্লাহকে বেশি ভয় করে চলে, সুতরাং কোনো আরব অন্য কোনো অনারব বা আজমী লোকের তুলনায় মোটেই শ্রেষ্ঠ নয়, পক্ষান্তরে কোনো অনারব বা আজমী ব্যক্তিও কোনো আরব লোকের তুলনায় মোটেই শ্রেষ্ঠ নয়। কালো ব্যক্তি যেমন সাদা ব্যক্তির তুলনায় শ্রেষ্ঠ নয়, তদ্রুপ সাদা ব্যক্তিও কালো ব্যক্তির তুলনায় শ্রেষ্ঠ নয়। হঁ্যা, মর্যাদা ও সম্মানের যদি কোনো মাপকাঠি থাকে, তবে তা হলো একমাত্র তাকওয়া বা পরহেজগারী। সমগ্র মানব জাতি একই আদমের সন্তান এবং আদমের প্রকৃত পরিচয় এটাই যে, তাকে মাটি দ্বারা সৃষ্টি করা হয়েছে। এখন মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের সব মিথ্যা দাবি, রক্ত ও বিত্ত সম্পদের সব দাবি এবং সব প্রতিশোধ আমার পদতলে লুণ্ঠিত হয়েছে। আল্লাহর ঘরে হেফাজত, সংরক্ষণ ও হাজীদের পানি পান করানোর ব্যবস্হা পুর্ববৎ বহাল থাকবে।
* হে কোরাইশ মন্ডলী, এমন দশা যেন না হয় তোমরা যখন আল্লাহ পাকের দরবারে হাজির হবে তখন তোমাদের ঘাড়ে দুনিয়ার বোঝা চাপান থাকবে, আর অন্য লোকজন আখেরাতের সামাননিয়া উপস্হিত হইবে। সত্যই তোমাদের অবস্হা যদি তেমনই হয় তবে সেদিন আমি তোমাদের কোনো কাজেই লাগতে পারব না।
* হে মানব সকল, আল্লাহতায়ালা তোমাদের মিথ্যা অহংকার অহমিকা নির্মুল করে দিয়েছেন। এক্ষণে বাপ-দাদার কীর্তি কাহিনী নিয়ে অহংকারের আর কোনো অবকাশ নেই।
* হে উম্মত সকল, তোমাদের রক্ত, বিত্ত-সম্পদ ও ইজ্জত পরস্পরের জন্য চিরস্হায়ীভাবে হারাম করা হলো। আজিকার এই দিন এই পবিত্র মাস বিশেষভাবে এই শহরে অবস্হানকালে তোমরা যেভাবে এর গুরুত্ব দিয়ে থাক।
* হে মানবমন্ডলী, একজন মুসলমান আরেকজন মুসলমানের ভাই। মুসলমানগণ পরস্পর ভাই ভাই।
* নিজের চাকর-বাকর সম্পর্কে খেয়াল রাখবে। তাদের তা-ই খেতে দেবে যা তোমরা নিজেরা খাও, যে ধরনের জামা-কাপড় তোমরা পরিধান করবে তাদেরও তেমন জামা-কাপড় পরিধান করাবে।
* অন্ধকার জাহেলিয়াত যুগের সব নাম-নিশান আমি আমার পদতলে নিক্ষিপ্ত করে ফেলেছি। জাহেলিয়াত যুগের রক্তের সব প্রতিশোধ দাবি রহিত করা হলো। জাহেলিয়াত যুগের সুদ এখন আর পরিশোধযোগ্য বলে গণ্য হবে না।
* হে মানব জাতি মহান আল্লাহতায়ালা প্রত্যেকটি হকদারকে ন্যায্য অংশ বা অধিকার নির্ধারিত করেছেন, কোনো ব্যক্তি যাতে উত্তরাধিকারীর জন্য ওছিয়াত না করে।
* সন্তান তারই নামে পরিচিত হবে যার শয্যায় সে ভুমিষ্ঠ হয়েছে। যার উপর ব্যাভিচারের অভিযোগ প্রমাণিত হবে তার শাস্তি প্রস্তরদন্ড।
* ঋণ অবশ্যই পরিশোধ করতে হবে। কোনো ভাইয়ের সন্তুষ্টি ব্যতীত তার কাছ থেকে কোনো জিনিস গ্রহণ জায়েজ নয়। তবে সন্তুষ্টচিত্তে যদি কিছু দান করা হয় সে কথা আলাদা। ধার হিসেবে গৃহীত জিনিস ফেরত দেয়া আবশ্যক। উপহারের বিনিময় করা উচিত। যদি কেউ কারো জামিনদার হয় তবে জামিনের শর্ত পালন করা আবশ্যক।
* স্ত্রীর পক্ষে স্বামীর অনুমতি ব্যতীত তার কোনো জিনিস অন্য কাউকে দেয়া জায়েজ নয়।
* হে উম্মতসকল! তোমাদের উপর নারীদের অধিকার রয়েছে। তাদের উপরও তোমাদের সুনির্দিষ্ট অধিকার রয়েছে।
* স্ত্রীদের প্রতি তোমরা সদ্ব্যবহার করিও। তাদের ব্যাপারে আল্লাহর কথা স্মরণ রাখবে, কারণ আল্লাহর নামেই তোমরা তাহাদিগকে হাসিল করেছ এবং তাঁর নামেই তোমাদের জন্য তাঁর হালাল রুপে গণ্য হয়েছে।
* হে মানবমন্ডলী, তোমরা নিজেদের প্রতিপালকের ইবাদত কর। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় কর, পুর্ণাঙ্গ একটি মাস রোজা রাখ, সন্তুষ্টিচিত্তে নিজেদের ধন সম্পদের যাকাত আদায় কর, আল্লাহর ঘরের ইজ্জত কর এবং নেতৃস্হানীয় ব্যক্তিদের কথা মেনে চল, এর ফলে তোমরা জান্নাতে দাখিল হবে।
শোন এখানে যারা উপস্হিত রয়েছ তাদের কর্তব্য হবে, এই নির্দেশ ও বাণীসমুহ তাহাদিগকে পৌঁছে দেবে যারা আজ এখানে উপস্হিত নেই। হয়তো অনুপস্হিত লোকদের মধ্যেই কেউ তোমাদের তুলনায় এটা উত্তম রুপে বুঝবে। হে বিশ্ববাসী, তোমাদের আমার বিষয় জিজ্ঞাসা করা হবে। বল সেদিন তোমরা আমার সম্পর্কে কি উত্তর দেবে? সমবেত জনতা উত্তর দিল, আমরা সাক্ষ্য দেব যে, আপনি রেসালতের হক আদায় করেছেন। এটা শুনে রাসুল (সা.) নিজের সাহাদাত অঙ্গুলি আসমানের দিকে তুললেন এবং বললেন ইয়া আল্লাহু তুমি সাক্ষী থাক, ইয়া আল্লাহু তুমি সাক্ষী থাক, ইয়া আল্লাহু তুমি সাক্ষী থাক।
***************************
লেখকঃ মোহাম্মদ ইয়াছিন আরাফাত
উৎসঃ দৈনিক আমারদেশ, ০৮ ডিসেম্বর ২০০৭