পৃথিবীতে মহান আল্লাহ্ তা’আলার অসংখ্য নেয়ামত বা অবদান বিদ্যমান, যা গণনা করে শেষ করা যায় না। এর মধ্যে বৃক্ষরাজি মানুষের পরম উপকারী ও জীবন রক্ষাকারী অন্যতম নেয়ামত।
বৃক্ষরাজিকে মানুষের জীবনও বলা যেতে পারে। কেননা, প্রতিটি নিঃশ্বাসে মানুষ বৃক্ষরাজি থেকে অক্সিজেন গ্রহণ করে এবং এরই ফলশ্রুতিতে মানুষ বেঁচে থাকে। মানুষ যে শ্বাস প্রশ্বাস ত্যাগ করে তা থেকে গাছ পালা ও বৃক্ষরাজি কার্বনডাই অক্সাইড গ্রহণ করে, পৃথিবীর দূষিত বায়ুকে দূষণমুক্ত করে, বিশুদ্ধ বায়ুতে পরিণত করে। বৃক্ষরাজির ফল-মূল মানুষের প্রিয় খাদ্য, যা শরীরের পুষ্টি সাধন করে এবং রোগ প্রতিরোধে মহামূল্যবান উপাদান এতে বিদ্যমান রয়েছে। ফলে মানুষ সারা জীবন বৃক্ষরাজি ও লতাগুল্মের প্রয়োজনীয়তা সর্বক্ষণ অনুভব করে থাকে।
এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন, “মানুষ তাঁর খাদ্যের প্রতি লক্ষ্য করুক, আমি আশ্চর্য উপায়ে পানি বর্ষণ করি, অতঃপর আমি ভূমিকে বিদীর্ণ করি, অতঃপর তাতে উৎপন্ন করি শস্য, আঙ্গুর, শাক-সবজি, যয়তুন, (তেলের বৃক্ষ) খেজুর, বহুবৃক্ষ বিশিষ্ট উদ্যানসমূহ, (বড় বড় বন) ফল এবং ঘাস (পুশ খাদ্য) এসব তোমাদের এবং তোমাদের পশুদের (উপকারার্থে) ভোগের জন্য।” (সূরা আবাসা, ২৪-৩২) মহান আল্লাহ্ আরো বলেন, “তোমরা যে আগুন জ্বালাও তা লক্ষ্য করেছ কি? তোমরাই কি অগ্নি-উৎপাদক বৃক্ষ সষ্টি কর, না আমি করি? আমিই এসবকে করেছি নিদর্শন এবং মরুবাসীদের জন্য সামগ্রী।” (সূরা ওয়াক্কিয়া- ৭২-৭৪)
মহান আল্লাহ তা আলা বৃক্ষরাজি ও উদ্ভিদ সমূহের মাধ্যমে বন-জংগল তৈরি করে মানব জাতির যে কত শত উপকার এবং পৃথিবীর সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেছেন, তা বলে শেষ করা যাবে না। এর প্রত্যক্ষ প্রমাণ আমাদের বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত বিশ্ব-বিখ্যাত বন, সুন্দর বন। যা বিশ্বের অন্যতম সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।
সুন্দর বনে প্রচুর গাছপালা ও বৃক্ষ রাজি থাকার ফলে, ২০০৭ সালের ১২ নভেম্বরের কিয়ামতসম প্রলংকরী সামুদ্রিক ঘূর্নিঝড় ‘সিডরের’ ধ্বংসলীলার কবল থেকে দেশ বহুলাংশে রক্ষা পেয়েছে বলে পরিবেশ বিজ্ঞানী ও আবহাওয়াবিদরা মন্তব্য করেছিলেন। তা না হলে অধিকাংশ বাংলাদেশই ধ্বংস ‘পে পরিণত হতো বলে, জাতীয় দৈনিক পত্রিকাগুলোতে প্রকাশিত হয়েছিল।
বৃক্ষরাজি ও বনজসম্পদের উপকারের আরো প্রমাণ পাওয়া গেল, গত মে মাসের প্রথম সপ্তাহে, দুনিয়া কাঁপানো সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝর ‘নার্গিসের’ মহাতান্ডবে মায়ানমায়ের লক্ষাধিক লোকের প্রাণহানি ঘটেছে। হাজার হাজার বাড়ি ঘর ধ্বংস ‘পে পরিণত হয়েছে। সম্ভবতঃ সেই দেশে প্রয়োজনীয় পরিমাণে গাছ-পালা, বৃক্ষরাজি এবং বনজ-সম্পদ না থাকার কারণেই দেশ এতবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বৃক্ষরাজি প্রচুর পরিমাণে থাকলে ঝড়ের গতিবেগ বাঁধাপ্রাপ্ত হয় এবং দেশের ক্ষয়ক্ষতি তুলনামূলকভাবে কম হয়।
প্রকৃত পক্ষে একটি দেশের মূল ভূখন্ডের এক চতুর্থাংশ বনভূমি বা বনাঞ্চল থাকার প্রয়োজন। অথচ আমাদের দেশে বর্তমানে এর পরিমাণ ৭-৮ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বৃক্ষবাজি দেশের পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখে। আবহাওয়া আর্দ্র ও নাতিশীতোষ্ণ রাখতে, জলীয় বাষ্প পূর্ণ বাতাসে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে বৃষ্টিপাত ঘটাতে, ভূমিক্ষয়, বন্যা, ঝড়-তুফান ও ঘূর্ণিঝড় রোধ করতে এবং মাটিকে সরস ও উর্বর করতে বৃক্ষরাজি ও তরুলতা প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালন করে।
এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের বাণী বিশেষভাবে আকর্ষণীয়। ইরশাদ হচ্ছে- ‘পৃথিবীকে আমি বিস্তৃত করেছি এবং ওতে পর্বতমালা সৃষ্টি করেছি, আমি পৃথিবীতে প্রত্যেক ব‘ সুপরিমিতভাবে সৃষ্টি করেছি। এবং ওতে তোমাদের জন্য জীবিকার ব্যবস্থা করেছি আর তোমরা যাদের জীবিকাদাতা নও তাদের জন্যও। প্রত্যেক ব‘র ভান্ডার আমার নিকট আছে এবং আমি তা প্রয়োজনীয় পরিমাণেই সরবরাহ করে থাকি। আমি বৃষ্টিগর্ভ বায়ু প্রেরণ করি, অতঃপর আকাশ হতে বারি বর্ষণ করি এবং তা তোমাদের পান করতে দেই, ওর ভান্ডার তোমাদের নিকট নেই।’ (সূরাহিজর-১৯-২২)
বৃক্ষরাজি পৃথিবীর সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে এবং মানুষের জীবনোকরণের জন্য যেমন প্রয়োজনীয় ও উপকারী, তেমনিভাবে পরকালেও মুক্তি পাওয়ার জন্য পুণ্যের (সওয়াবের) স্থায়ী সম্পদ ভান্ডার। কেননা বৃক্ষরোপণকে প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাদকায়ে জারিয়া বা প্রবাহমান দান বলে ইরশাদ করেছেন অর্থাৎ যে দানের পুণ্য (সওয়াব) মৃত মুমিন ব্যক্তি কবরের মধ্যে সর্বদা পেতে থাকবে।
হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাহি ওয়া সাল্লাম বলেন, মানুষ যখন মারা যায়, তার সমস্ত আমল (কাজ) বন্ধ হয়ে যায়। তবে তিনটি আমলের সওয়াব জারি থাকেঃ সাদকায়ে জারিয়া- যেমন, গাছ-বৃক্ষ রোপণ করা, মানুষের কল্যাণে রাস্তা নির্মাণ করা, পানির অসুবিধা দূর করার জন্য পুকুর খনন করা বা জলাধার তৈরি করা। পুণ্যের আশায় আল্লাহর নামে মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুল-কলেজ, মুসাফিরখানা তৈরি করা, লেখাপড়ায় কাউকে টাকা-পয়সা দিয়ে সাহায্য করা। এমন ইলমে বা বিদ্যা, যা থেকে লাভবান হওয়া যায় অর্থাৎ বিদ্যার্জন করে মানুষের উপকারে বিতরণ করে যাওয়া। সুসন্তান রেখে যাওয়া, যে তার জন্য (মৃত ব্যক্তির জন্য) দোয়া করবে।
হযরত আনাস ইবনে মালেক (রাঃ) থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, যখনই কোনো মুসলমান গাছ লাগায় বা শস্য বপন করে এবং এ থেকে মানুষ, পাখি বা পশু তাদের আহার গ্রহণ করে, তখন এটা তার পক্ষে (গাছ রোপণকারীর পক্ষে) সদকাহ বা একটি দান হিসাবে পরিগণিত হয়।
পৃথিবীর সৌন্দর্য বৃদ্ধির প্রয়াসে (সহীহ বুখারী) মানবকল্যাণার্থে এবং আখিরাতেও পুণ্য বা সওয়াব লাভ হবে, এসব কথা ভেবেই বহু মানুষ পৃথিবীতে দেশপ্রেমিক ও বৃক্ষপ্রেমিক বলে পরিচিতি লাভ করেছেন। তাদের অন্যতম হলেন একজন মকুর উদ্দিন এবং অন্যজন মোল্লা রিয়াছত উল্লাহ।
“দিনাজপুর ঘোড়াঘাট উপজেলার ৯৪ বছর বয়স্ক মকুর উদ্দিন সেই ব্রিটিশ আমল থেকে নিজের অক্লান্ত পরিশ্রমে সর্বত্র গাছ লাগান। মকুর উদ্দিনের এই বৃক্ষপ্রেম মূলত দেশ-প্রেমেরই নামান্তর। এমনি বৃক্ষপ্রেমী এক শিক্ষক মোল্লা রিয়াছত উল্লাহ, যিনি প্রায় সাত হাজার বিভিন্ন জাতের গাছ লাগিয়েছেন জমিতে।” (উপসম্পাদকীয়, দৈনিক ইত্তেফাক, ১০ জুন, মঙ্গলবার-২০০৮)
বৃক্ষরাজি তো বেহেশতী উপহার। প্রিয় নবী (সাঃ) মি’রাজ গমনের পথে তিনি ‘সিদরাতুল-মুসতাহা’ দেখেন (সিদরাতুন হল একটি কুল বৃক্ষ বা বরই গাছ) যেখানে আল্লাহতাআলার নির্দেশে স্বর্ণের প্রজাপতি এবং বিভিন্ন রং-এর প্রজাপতি ইতঃস্তত ছোটাছুটি করছিল এবং ফেরেশ্তারা স্থানটিকে ঘিরে রেখেছিল। গাছের উপকারের আলোচনা শুধু পৃথিবীতেই নয়, এর আলোচনা ঊর্ধ্বাকাশেও আছে। বৃক্ষরাজি মানুষের উপকারই করে না, মহান আল্লাহতাআলার বিধান মেনে চলে এবং প্রশংসায় লিপ্ত থাকে।
এ সম্পর্কে মহান আল্লাহতাআলা মহাগ্রন্থ আল কুরআনে ইরশাদ করেন, “এবং তৃণলতা ও বৃক্ষরাজি সিজদারত অর্থাৎ এরা তাঁর বিধান মেনে চলে।”
“তিনি (আল্লাহ) পৃথিবীকে স্থাপন করেছেন সৃষ্ট জীবের জন্য। এতে আছে ফলমূল এবং বহিরাবরণ বিশিষ্ট খেজুর বৃক্ষ। আর আছে খোসাবিশিষ্ট শস্য ও সুগন্ধি ফুল।”
অতএব, তোমরা উভয়ে (জ্বীন ও ইনসান) তোমাদের পালনকর্তার কোন কোন অনুগ্রহকে (অবদানকে) অস্বীকার করবে? (আর-রহমান- ৬,১০-১৩)
সারাদেশেই এখন বৃক্ষরোপণ অভিযান, বনায়নের আন্দোলন এবং সুমিষ্ট মৌসুমী ফল খাওয়ার ও ফুল সংগ্রহের আনন্দোৎসব চলছে। অতীত ও বর্তমান সরকার প্রধান এবং রাষ্ট্রপ্রধানগণও এ বিষয়ে দেশের জনসাধারণকে সজাগ করে আসছেন এবং নিজেরাও বিশেষ ভূমিকা পালন করছেন। এতে তাঁরা জাতির নিকট থেকে প্রশংসাই প্রাপ্য।
তাই দেশের আপামর জনসাধারণেরও অবশ্য কর্তব্য যে, তাদের শুধু গাছের ব্যবহারই নয়, গাছ রোপণও অপরিহার্য কর্তব্য। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উপকারার্থে গাছ রোপণ করে যাওয়া , নেহাত পুণ্যের কাজ এবং এতে আখিরাতে নিজেদেরও পুণ্যের পথ সুগম হবে।
আসুন আমরা বৃক্ষরাজি রোপণ করে দেশ ও জাতির সেবায় এগিয়ে আসি। আসবাবপত্র, ফল-ফুল ও জীবনরক্ষাকারী ওষুধের প্রয়োজনে বৃক্ষরাজি উৎপন্নে সাধ্যমত চেষ্টা করি। এ কাজ দুঃখ ও দারিদ্র্য বিমোচনে সহায়ক হবে। মহান আল্লাহতাআলা আমাদের সহায় হোন। আমীন।
**************************
মো হা ম্ম দ লু ৎ ফ র র হ মা ন ই ব নে ই উ সু ফ
দৈনিক ইত্তেফাক, ২৫ জুলাই ২০০৮