- Home
- জীবন ও কর্ম
- ক্কারী মুহাম্মদ ওবায়দুল্লাহ এখনো বাকরুদ্ধকণ্ঠে নেই তেলাওয়াতের সেই সুমধুর ধ্বনি
- Home
- জীবন ও কর্ম
- স্মরণীয় ব্যাক্তিত্ব
- ক্কারী মুহাম্মদ ওবায়দুল্লাহ এখনো বাকরুদ্ধকণ্ঠে নেই তেলাওয়াতের সেই সুমধুর ধ্বনি
ক্কারী মুহাম্মদ ওবায়দুল্লাহ এখনো বাকরুদ্ধকণ্ঠে নেই তেলাওয়াতের সেই সুমধুর ধ্বনি
- By Article Poster
- Published 07/31/2008
- জীবন ও কর্ম
- Unrated
যার মধুর কণ্ঠের আজান ধ্বনি আর কোরআনে কারিমের তেলাওয়াত শুনলে আল্লাহপ্রেমে শিহরিত হতো হৃদয়ের অণু-পরমাণু, সেই আন্তর্জাতিক ক্কারী মুহাম্মাদ ওবায়দুল্লাহ আজো বাকরুদ্ধ। হঠাৎ করেই যেন সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেল। থেমে গেল সেই মধুর কণ্ঠের আজানের ধ্বনিও। আজ আর সেই কণ্ঠে কোনো আওয়াজ নেই। নেই তার কণ্ঠে সেই কোরআনে কারিমের তেলাওয়াত। যে হাত দিয়ে কোরআন শরীফ খুলে তেলাওয়াতে বসতেন, সেই হাতও যেন তার কাছ থেকে মুখ ফিরে নিয়েছে। দ্বিতীয়বার ব্রেন ষ্ট্রোক হওয়ার পর তিনি বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেছেন। তার ডান হাতটিও পক্ষাঘাতে আক্রান্ত। গত ফেব্রুয়ারি মাসেও তিনি ব্রেন ষ্ট্রোক করেন।
মাওলানা ক্কারি মুহাম্মাদ ওবায়দুল্লাহর স্বজনরা জানান, ২০০৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি ঢাকার বাইরে তিনি একটি ওয়াজ মাহফিলে যাচ্ছিলেন। যাওয়ার পথে গাড়িতেই তার ব্রেন ষ্ট্রোক হয়। সঙ্গে সঙ্গে তাকে পান্হপথের সমরিতা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তারপর সেখান থেকে তাকে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া হয় ভারতে। জ্ঞান ফিরে এলেও তার কণ্ঠ হয়ে পড়ে বাকরুদ্ধ। দুই বছর পাঁচ মাস তিনি অসুস্হ। হাঁটা, চলাফেরা করতে পারলেও তার ডান হাতের সমস্যাটি এখনো কাটেনি। অবশ হয়ে যাওয়া হাতটি বর্তমানে একটু নাড়াচাড়া করতে পারছেন। তার চিকিৎসা চলছে। সব কথাই তিনি বোঝেন এবং শুনতে পারেন, কিন্তু ভাষায় প্রকাশ করার শক্তি নেই তার। কেমন আছেন? তার কাছে জানতে চাইলে তিনি হেসে আকাশের দিকে ইশারা করে বললেন, আল্লাহ তাকে ভালোই রেখেছেন, তবে তিনি দোয়া করতে বলেন যাতে দ্রুত সুস্হ হতে পারেন।
ব্যয়বহুল চিকিৎসা চালাতে হিমশিম খেলেও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে তার পরিবার। চিকিৎসকরা আশা করছেন, তিনি বাকশক্তি ফিরে পাবেন। আবার তিনি মহান আল্লাহপাকের কোরআনে কারিম তেলাওয়াত করতে পারবেন। চিকিৎসার পাশাপাশি শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছে দোয়া চেয়েছেন ক্কারী মুহাম্মাদ ওবায়দুল্লাহ, যাতে আল্লাহপাক তাড়াতাড়ি তার বাকশক্তি ফিরিয়ে দেন।
তার ছেলে এসএম ওয়ালি উল্লাহ জানান, বাবা মাওলানা ক্কারী ওবায়দুল্লাহর অনেক শুভাকাঙ্ক্ষী ছিলেন, কিন্তু আজ তার এই দুঃসময়ে কেউ নেই। চিকিৎসকরা তাকে জানিয়েছেন, যথারীতি চিকিৎসা চালালে তিনি আবার বাকশক্তি ফিরে পাবেন। তিনি বলেন, তার বাবার ইচ্ছা বিশুদ্ধ কোরআন শিক্ষার জন্য একটি প্রতিষ্ঠান তৈরি করা। নিজ বাসা লালবাগের ৩৩/৩৭ গৌর সুন্দর রায় লেনে (চাঁদনী ঘাটে) একটি রুমে শুরু করবেন বিশুদ্ধ কোরআন শিক্ষার কেন্দ্র।
ক্কারী মুহাম্মাদ ওবায়দুল্লাহ ১৯৪৭ সালে চট্টগ্রাম রাঙ্গুনিয়ার সড়কভাটায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম হজরত মাওলানা মেহেরুজ্জামান ইসলামাবাদী। আর মায়ের নাম মরিয়ম বিবি। বাবার কাছেই তার হাতেখড়ি। সব শেষে জামিয়া কোরআনিয়া আরাবিয়া লালবাগ মাদ্রাসা থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে দাওরায়ে হাদিস পাস করেন। সেই সঙ্গে তিনি তখনকার বরেণ্য ক্কারীদের কাছ থেকে ক্কেরাত ও তাজবিদ শাস্ত্র রপ্ত করেন। ক্কারী মুহাম্মাদ ওবায়দুল্লাহ ছাত্রজীবন শেষ করেই ঢাকার ঐতিহ্যবাহী চকবাজার শাহী মসজিদের ইমামতির দায়িত্ব পান। তিনি ইমাম থেকে পেশ ইমাম, তারপর খতিব নিযুক্ত হন। দীর্ঘ চল্লিশ বছরের বেশি সময় ধরে তিনি এ মসজিদের গুরুত্বপুর্ণ দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।
পারিবারিক সুত্র জানায়, গত ২২ ফেব্রুয়ারি হবিগঞ্জ উমেদনগর মাদ্রাসায় দু’দিনব্যাপী ইসলামী সম্মেলনে ‘আর রাহমান চ্যারেটি ফাউন্ডেশন’ শ্রেষ্ঠ ‘ইসলামী ব্যক্তিত্ব ২০০৮’ ঘোষণা করা হয়। টানা ৫০ বছর তেলাওয়াতের জন্য ১১ জনকে সম্মাননা দেয়া হয়। এর মধ্যে ক্কারী ওবায়দুল্লাহর নামও ছিল। সম্মাননা হিসেবে দেয়া হয়েছে দশ হাজার টাকা, পাগড়ি ও সনদ। অথচ ক্কারী ওবায়দুল্লাহ অসুস্হতার কারণে সেখানে যেতে না পারায় আজো তার এই সম্মাননা হাতে পৌঁছেনি।
২০০০, ২০০৬ ও সর্বশেষ ২০০৮ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি মোট তিনবার ব্রেন ষ্ট্রোক করেন তিনি। দ্বিতীয়বার থেকেই তিনি বাকরুদ্ধ হয়ে যান। ঢাকার শমরিতা হাসপাতাল ও কলকাতায় তাকে চিকিৎসা করানো হয়েছে। এখানো চিকিৎসা চলছে। বহু কষ্টে তার পরিবার চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছে। একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এ ব্যয়বহুল চিকিৎসা চালানো নিঃসন্দেহে কঠিন। বিল অপরিশোধিত থাকায় তার টেলিফোন লাইনটিও কেটে দেয়া হয়েছে। কণ্ঠশিল্পী, কবি-সাহিত্যিকদের জন্য যদি রাষ্ট্রের করণীয় থাকে, তবে তেলাওয়াতের প্রাণপুরুষ ক্কারী ওবায়দুল্লাহর জন্য কি রাষ্ট্র বা সমাজের কিছুই করণীয় নেই? এই ধরনের প্রশ্নই করেন তার শুভাকাঙ্ক্ষীরা।
ক্কারী মুহাম্মাদ ওবায়দুল্লাহ আন্তর্জাতিক ও জাতীয় ক্কেরাত প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে আটবার প্রথম স্হান অধিকার করেন। যার কোরআন তেলাওয়াত শোনার জন্য শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তাকে প্রায় সময় বঙ্গভবনে ডেকে নিয়ে যেতেন। তিনি সর্বপ্রথম ১৯৬৫ সালে আন্তর্জাতিক ক্কেরাত প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। এছাড়া তিনি আন্তর্জাতিক ক্কেরাত মাহফিলে অংশগ্রহণের জন্য কুয়ালালামপুর, ব্যাংকক, রেঙ্গুন, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, লিবিয়া, দুবাই, জর্দান এবং সৌদি আরব সফর করেছেন। তিনি বাংলাদেশ বেতার, বিটিভি, জাতীয় সংসদ, এনটিভি ও চ্যানেল আইয়ের ক্কারী ছিলেন। এছাড়াও জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ ইমাম সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সেক্রেটারি জেনারেল এবং বাংলাদেশ ক্কারী সমিতির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোরআন শিক্ষার ক্লাস নিতেন। জামেয়া তাজবিদুল কোরআন বিষয়ক উচ্চতর প্রশিক্ষণের একটি মাদ্রাসাও প্রতিষ্ঠা করেছেন তিনি। তার উল্লেখযোগ্য ছাত্র হলেন-বর্তমান জাতীয় মসজিদের ভারপ্রাপ্ত খতিব মুফতি ক্কারী মুহাম্মদ নুরুদ্দীন, ক্কারী শহীদুল ইসলাম, ক্কারী হারুন, ক্কারী আনোয়ার হোসেন প্রমুখ। সেনাবাহিনীর অনেক সদস্যও ক্কেরাত প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের জন্য তার কাছে বিশুদ্ধ কোরআন তেলাওয়াত শিখেছেন অথচ আজ এই অবস্হায় কেউ তার দিকে ফিরে তাকায় না। প্রতিটি সময় কেটে যাচ্ছে নীরবে কথা না বলার যন্ত্রণা ও কষ্টকে সঙ্গী করে।
**************************
নেসার উদ্দিন আহাম্মদ
আমার দেশ, ১৯ জুলাই ২০০৮