(শেষাংশ)
সূরা হুদ-এর ৬৪-৬৫নং আয়াতে বলা হয়েছে, ‘‘আর হে আমার জাতি! আল্লাহর এ উষ্ট্রীটি তোমাদের জন্যে নিদর্শন, অতএব, তাকে আল্লাহর জমিনে বিচরণ করতে দাও এবং তাকে মন্দভাবে স্পর্শ করবে না। নতুবা অতিসত্ত্বর তোমাদেরকে আযাব পাকড়াও করবে। তবু তারা উহার পা কেটে দিলঃ আর ভয়ংকর গর্জন পাপিষ্ঠদের পাকড়াও করল। ফলে ভোর হতে না হতেই তারা নিজ নিজ গৃহে সমূহে উপুড় হয়ে পড়ে রইল।” ১১:৬৭
অশ্ব বা উষ্ট্রে আরোহণ করে যুদ্ধ করা প্রসঙ্গে বর্ণিত হয়েছে, ‘‘আল্লাহ বনু-বুন যায়রের কাছ থেকে তার রাসূল যে ধন-সম্পদ ফা’য় যে সম্পদ যুদ্ধ ব্যতীত হস্তগত হয় দিয়েছেন, তজ্জন্যে তোমরা ঘোড়ায় কিংবা উটে চড়ে যুদ্ধ করনিঃ” ৫৯:০৬
উপমা বা দৃষ্টান্ত হিসাবে ‘উট’ শব্দ ব্যবহ্নত হয়েছে সূরা ৭৭:৩৩ আয়াতে। ‘‘জাহান্নামের অগ্নি বিশালাকায় স্ফুলিঙ্গ নিক্ষেপ করবে যা বিরাট অট্টালিকার ন্যায় মনে হবে। অতঃপর তা বিচ্ছিন্ন হয়ে ছোট ছোট খণ্ডে বিভক্ত হবে এবং খণ্ডগুলো পীত বর্ণ উষ্ট্র শ্রেণীর সমান হবে। যেন সে পীতবর্ণ উষ্ট্র শ্রেণী” ৭৭:৩৩। অনুরূপভাব পরিব্যক্ত হয়েছে ’ঃ যখন পূর্ণ-গর্ভা উষ্ট্রী উপেক্ষিত হবে।’ ৮১:৪
ব্যাপারে সর্তক থাক। অতঃপর ওরা তাঁর প্রতি মিথ্যারোপ করেছিল এবং উষ্ট্রীর পা কর্তন করেছিলঃ৯১:১৩-১৪
উকুন ও ব্যাঙ এর উল্লেখ (সূরা আ’রাফে) দেখতে পাই।
হযরত মূসা (আঃ)-এর সময় অভিশপ্ত ফেরআউন-এর উপর নিপতিত দুর্ভিক্ষ ও ফল-ফসলের ক্ষতি প্রসঙ্গে বিশিষ্ট কয়েকটি জীবজন্তুর নাম উল্লিখিত হয়েছে। এ জীবজন্তুগুলো বিভিন্নভাবে ফেরআউন সম্প্রদায়ের লোকদের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলে। ‘সুতরাং আমি তাদের উপর পাঠিয়ে দিলাম, তুফান, পঙ্গপাল, উকুন, ব্যাঙ, রক্ত প্রভৃতি বহুবিধ বিদর্শন একের পর এক। তারপরও তারা গর্ব করতে থাকল। বস্তুতঃ তারা ছিল অপরাধপ্রবণ।” ৭:১৩৩
অশ্বের উল্লেখ রয়েছে
সূরা আনফাল, সূলা নাহল, সূরা বনি ইসরাঈল, সূরা সা’দ ও সূরা জাফরে পবিত্র কোরআন -এ জেহাদে যুদ্ধোপকরণ হিসেবে অশ্ব বা ঘোড়ার প্রসঙ্গ বর্ণিত হয়েছে। ইসলামের শক্রু ও কাফেরদের মোকাবেলা করার জন্য অশ্ব প্র‘ত করে রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তৎকালীন সময়ে যুদ্ধের সাজ-সরঞ্জাম হিসেবে অশ্ব এবং উষ্ট্র এক বিরাট ভূমিকা রাখে। “ আর প্র‘ত কর তাদের সাথে যুদ্ধের জন্যে যা কিছু সংগ্রহ করতে পার নিজের শক্তি সামর্থের মধ্য থেকে এবং পালিত ঘোড়া থেকে, যেন প্রভাব পড়ে আল্লাহর শত্রম্নুদের উপর এবং তোমাদের শত্রম্নুদের উপর আর তাদের ছাড়া অন্যান্যদের উপরও যাদেরকে তোমরা জান না, আল্লাহ তাদেরকে চেনেন। ব‘তঃ তোমরা যা কিছু ব্যয় করবে আল্লাহর রাহে, তা তোমরা পরিপূর্ণ ফিরে পাবে এবং তোমাদের কোন হক অপূর্ণ থাকবে না।” ৮:৬০
অশ্ব পৃষ্ঠে আরোহণ এবং শোভা সৌন্দর্য প্রসঙ্গে বর্ণিত হয়েছে ‘তোমাদের আরোহণের জন্যে এবং শোভার জন্যে তিনি ঘোড়া, খচ্চর ও গাধা সৃষ্টি করেছেন।” ১৬:৮
হযরদ আদম (আঃ)-কে সেজদা করার জন্যে যখন আল্লাহ ফেরেশতাদের নির্দেশ দেন, তখন সবাই সেজদাবনত হল-ইবলিস ব্যতীত। সে বলল, দেখুন তো এ না সেই ব্যক্তি, যাকে আপনি আমার চাইতেও উচ্চ মর্যাদা দিয়ে দিয়েছেন। যদি আপনি আমাকে কেয়ামত দিবস পর্যন্ত সময় দেন, তবে আমি সামান্য সংখ্যক ছাড়া তার বংশধরকে সমূলে নষ্ট করে দেব। এ প্রেক্ষিতে আল্লাহ উল্লেখ করেন, “তোমার আহবানে এদের, মধ্যে যাকে পার পদস্খলিত কর, তোমার আশ্বারোহী ও পদাতিক বাহিনী দ্বারা এদেরকে আক্রমণ কর এবং এদের ধনে ও সন্তান-সন্ততিতে শরীক হয়ে যাও ও এদেরকে প্রতিশ্রুতি দাও’। শয়তান এদেরকে যে প্রতিশ্রুতি দেয় তা ছলনা মাত্র। নিশ্চয় আমার বান্দাদের উপর তোমার কোন ক্ষমতা নেই। কর্ম বিধায়ক হিসেবে তোমার প্রতিপালকই যথেষ্ট।” ১৭:৬৪-৬৫
মৌমাছির বর্ণনা রয়েছে
সূরা নাহলেঃ মানুষের নিকট শিক্ষণীয় মৌমাছির গৃহ নির্মাণ পদ্ধতি এবং মানুষের নিকট উপকারী মৌমাছির উদরে নিঃসৃত রস (মধু) সম্পর্কে পবিত্র কোরআন-এ বর্ণনাঃ “আপনার পালনকর্তা মধুমক্ষিকাকে আদেশ দিলেন, পর্বত গাত্রে, বৃক্ষ এবং উঁচু ডালে গৃহ তৈরি কর, এরপর সর্ব প্রকার ফল থেকে ভক্ষণ কর এবং আপন পালনকর্তার উন্মুক্ত পথসমূহে চলমান হও। তার পেট থেকে বিভিন্ন রঙের পানীয় নির্গত হয়। তাতে মানুষের জন্যে রয়েছে রোগের প্রতিকার। নিশ্চয় এতে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শন রয়েছে।” ১৬:৬৮-৬৯
পাখি বিহঙ্গ এর উল্লেখ রয়েছেঃ সূরা বাকারা, সূরা ইমরান, সূরা মায়েদা, সূরা আন’আম, সূরা ইউসুফ, সূরা নাহল, সূরা নূর, সূরা নামল, সূরা সাবা, সূরা সা’দ, সূরা মুলক ও সূরা ফীলে
পবিত্র কোরআন-এ বহুস্থানে আল্লাহর নিদর্শন স্বরূপ পাখি বা বিহঙ্গকুলের কথা বর্ণনা করা হয়েছে। “তারা কি উড়ন্ত পাখিকে দেখে না? এগুলো আকাশের অন্তরীক্ষে আজ্ঞাধীন রয়েছে। আল্লাহ ছাড়া কেউ এদেরকে আগলে রাখে না। নিশ্চয় এতে বিশ্বাসীদের জন্যে নিদর্শন রয়েছে।” ১৬:৭৯
হযরত সোলায়মান (আঃ)-কে পাখির ভাষা শিক্ষা দেয়ার প্রসঙ্গে উল্লেখিত হয়েছে, ‘সোলায়মান দাউদের উত্তরাধিকারী হয়েছিলেন। বলেছিলেন, হে লোকসকল আমাকে উড়ন্ত পাখিকুলের ভাষা শিক্ষা দেয়া হয়েছে। নিশ্চয় এটা সুষ্পষ্ট শ্রেষ্ঠত্ব। সোলায়মানের সামনে তার সেনাবাহিনীকে সমবেত করা হল। জ্বীন, মানুষ ও পক্ষীকুলকে, অতঃপর তাদেরকে বিভিন্ন ব্যুহে বিভক্ত করা হল।” ২৭: ১৬-১৭
“তুমি কি দেখ না যে, নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলে যারা আছে তারা এবং উড়ন্ত পক্ষীকুল তাদের পাখা বিস্তার করতঃ আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে? ২৪: ৪১
মৃতকে জীবিত করা প্রসঙ্গে পাখির দৃষ্টান্তঃ “এবং যখন ইব্রাহিম বলল, হে আমার পালনকর্তা, আমাকে দেখাও কেমন করে তুমি মৃতকে জীবিত করবে। বললেন, তুমি কি বিশ্বাস কর না? বলল, অবশ্যই বিশ্বাস করি কিন্তু, দেখতে এজন্য চাইছি যাতে অন্তরে প্রশান্তি লাভ করতে পারি। বললেন, চারটি পাখি ধরে নাও, পরে, সেগুলোকে পোষ মানিয়ে নাও, অতঃপর সেগুলোর দেহের একেকটি অংশ বিভিন্ন পাহাড়ের উপর রেখে দাও। তারপর সেগুলোকে ডাক, তোমার নিকট দৌঁড়ে চলে আসবে। আর জেনে রাখ, নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশালী, অতি জ্ঞানসম্পন্ন।” ২:২৬০
সাপের উল্লেখ রয়েছে
সূরা তা’হাঃ ও সূরা নামলেঃ হযরত মূসা (আঃ)-এর মোজেজা হিসেবে সাপ। “হে মূসা, তোমার ডান হাতে ওটা কি? তিনি বললেন, এটা আমার লাঠি, আমি এর উপর ভর দেই এবং এর দ্বারা আমার ছাগ পালের জন্যে বৃক্ষপত্র ঝেড়ে ফেলি এবং এতে আমার অন্যান্য কাজও চলে। আল্লাহ বললেন, হে মূসা, তুমি ওটা নিক্ষেপ কর। অতঃপর, তিনি তা নিক্ষেপ করলেন, অমনি তা সাপ হয়ে ছোটাছুটি করতে লাগল। আল্লাহ বললেন, তুমি তাকে ধর, ভয় করো না, আমি এখনই একে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে দিব।” সূরা ২০: ২১
“আপনি নিক্ষেপ করুন আপনার লাঠি। অতঃপর যখন তিনি তাকে সর্পের ন্যায় ছুটাছুটি করতে দেখলেন, তখন তিনি বিপরীত দিকে ছুটতে লাগলেন এবং পেছনে ফিরেও দেখলেন না। হে মূসা, ভয় করবেন না। আমি যে রয়েছি আমার কাছে পয়গম্বরগণ ভয় করেন না।” ২৭:১০
অজগরের কথা রয়েছে সুরা শু’আ ৩২ নম্বর আয়াতে।
মোজেজা হিসেবে হযরত মূসা (আঃ) তাঁর লাঠি নিক্ষেপ করলে তৎক্ষণাৎ তা এক সাক্ষাৎ অজগর হয়ে গেল। “অতঃপর তিনি লাঠি নিক্ষেপ করলে মুহূর্তের মধ্যে তা সুস্পষ্ট অজগর হয়ে গেল।” ২৬: ৩২
মাছির কথা রয়েছে
সূরা হাজ্জের ৭৩ নম্বর আয়াতে মূর্তি পূজার অসারতা প্রমাণ করার জন্য ক্ষুদ্রতর প্রাণী ‘মাছিকে উপমা হিসেবে বর্ণিত হয়েছে। যেমন- “হে লোকসকল একটি উপমা বর্ণনা করা হল, অতএব তোমরা তা মনোযোগ দিয়ে শোন, তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যাদের পূজা কর তারা কখনও একটি মাছি সৃষ্টি করতে পারবে না, যদিও তারা সকলে একত্রিত হয়। আর মাছি যদি তাদের কাছ থেকে কোন কিছু ছিনিয়ে নেয়, তবে তারা তার কাছ থেকে তা উদ্ধার করতে পারবে না। প্রার্থনাকারী ও যার কাছে প্রার্থনা করা হয় উভয়েই শক্তিহীন।” ২২: ৩
এছাড়াও ছাগল-মেষের কথা রয়েছে সূরা আনবিয়ায়। পিঁপিলিকার কথা রয়েছে সূরা নামল- এ। সূরা সাবা-র ১৪নং আয়াতে রয়েছে পোকার কথা। গাঁধা’র কথা উল্লেখ করা হয়েছে সূরা বাকার, সূরা নাহল, সূরা জুমআ ও সূরা মুদাসসির-এ দুম্বার উল্লেখ রয়েছে সূরা সা’দ-এর ২৩ নং আয়াতে। পতঙ্গের কথা রয়েছে সূরা কারীআ-র ৪নং আয়াতে। হস্তী শিরোণামে একটি সূরার নামকরণ করা হয়েছে সূরা ফীল্। কুকুরের কথা আমরা পাই সুরা আরাফ, সূরা কাহফ-এ। মাকরশা-র কথা রয়েছে সূরা আনকাবুত-এ ও মশার কথা রয়েছে সূরা বাকারা-য়। বাঘের কথা রয়েছে সূরা ইউসুফ-এর ১৩, ১৪ ও ১৭ নং আয়াতে।
এছাড়াও সূরা আন্বিয়া উল্লেখ করা হয়েছে ‘প্রাণবন্ত সব কিছু পানি থেকে সৃষ্ট’ এর অর্থ আল্লাহ প্রত্যেক চলন্ত জীবকে পানির দ্বারা সৃষ্টি করেছেন’। কাফেররা কি ভেবে দেখে না যে, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর মুখ বন্ধ ছিল, অতঃপর আমি উভয়কে খুলে দিলাম এবং প্রাণবন্ত সব কিছু পানি থেকে সৃষ্টি করলাম। এরপরও কি তারা বিশ্বাস স্থাপন করবে না।?” ২১:৩০
“আল্লাহু প্রত্যেক চলন্ত জীবকে পানি দ্বারা সৃষ্টি করেছেন। তাদের কতক বুকে ভর দিয়ে চলে, কতক দুই পায়ে ভর দিয়ে চলে এবং কতক চার পায়ে ভর দিয়ে চলে, আল্লাহ যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন। নিশ্চয় আল্লাহ সবকিছু করতে সক্ষম।··” ২৪:৪৫
জীব ও প্রাণীকুলের প্রতি লক্ষ্য করলেই দেখা যায় যে, কিছু কিছু জীবজন্তু পেটের উপর ভর দিয়ে চলে যেমন- কেঁচো, সরীসৃপ, আবার আন্যান্য প্রাণী যেমন- মানুষ ও পাখী দুই পায়ের উপর ভর দিয়ে চলাফেরা করে; অন্যদিকে গরু, ছাগল, ভেড়া, ঘোড়া, উট প্রভৃতি চতুষ্পদ জন্তু চার পায়ের উপর ভর দিয়ে চলাফেরা করে। এসবই হচ্ছে আল্লাহর অপূর্ব সৃষ্টি-কৌশল সমস্ত জীবকুলকে অন্তর্ভুক্ত করতে পবিত্র কোরআন-এ বহুস্থানে প্রয়াশই শব্দ, ‘দাউয়াব্বু’ বাহিমাতুন ‘আন’আম’ ব্যবহারও প্রয়োগ করা হয়েছে। সূরা হাজ্জ ২২:১৮,২৮
“তুমি কি দেখনি যে, আল্লাহকে সেজদা করে যা কিছু আছে নভোমণ্ডলে, যা কিছু আছে ভূমন্ডলে সূর্য, চন্দ্র, তারকারাজী, পর্বতরাজী, বৃক্ষলতা, জীবজন্তুঃ·এবং অনেক মানুষ··” ২২:১৮
“যাতে তারা তাদের কল্যাণ স্থান পর্যন্ত পৌঁছে এবং নির্দিষ্ট দিনগুলোতে আল্লাহর নাম স্মরণ করে তাঁর দেয়া চতুষ্পদ জন্তু জবেহ করার সময়” ২২:২৮ এবং তোমাদের জন্য চতুষ্পদ জন্তুসমূহের মধ্যে চিন্তা করার বিষয় রয়েছে” ২৩:২১
“আল্লাহ তোমাদের জন্যে চতুষ্পদ জন্তু (সৃষ্টি করেছেন, যাতে কোন কোনটিকে ভক্ষণ কর” ৪০:৭৯। “তিনি তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের জন্যে যুগল সৃষ্টি করেছেন এবং চতুষ্পদ জন্তুদের থেকে জোড়া সৃষ্টি করেছেন।” ৪২:১১
চতুষ্পদ জন্তুকে তোমাদের জন্য যানবাহনে পরিণত করেছেন। “তোমাদের ও তোমাদের চতুষ্পদ জন্তুদের উপকারার্থে।” ৭৯:৩৩
**************************
প্র ফে স র এম এ হালিম
দৈনিক ইত্তেফাক, ০১ আগষ্ট ২০০৮