আজ বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ দিবস। তাই আসুন, ইসলামে মাতৃদুগ্ধের ব্যাপারে যে গুরুত্ব ও আদেশ রয়েছে তা আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে মেনে চলি। মাতৃদুগ্ধ শিশুর অধিকার। সে অধিকার যাতে কোন কারণে খর্ব না হয়, সে ব্যাপারে যথেষ্ট দৃষ্টি রাখতে হবে। কেননা ‘আজকের শিশু, আগামী দিনের ভবিষ্যৎ’। ভবিষ্যৎ কর্ণধার শিশুদের এই অধিকারের ব্যাপারে মায়েদের ভূমিকাটাই সবচেয়ে বেশি। এ ব্যাপারে মায়েরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করবেন- সেই প্রত্যাশাই কামনা করি।
মা ও লা না শা হ মো হা ম্ম দ হা বি বু র র হ মা ন
আল্লাহ পাক মানুষকে ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ হিসাবে সৃষ্টি করেছেন। মানুষকে সৃষ্টি করার পাশাপাশি তার যাবতীয় লালন-পালনের ব্যবস্থা তিনিই করেন। শিশুর জন্মের পর তার মায়ের দুধই তার প্রথম খাবার। যা হালকা, মিষ্টি ও উষ্ণ, তা শিশুর স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী। মাতৃদুগ্ধ সন্তানের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ইসলামই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।
শিশুকে দুধ পান করানোর সময়সীমা সম্পর্কে আল্লাহ পাক আল কুরআনে সুন্দর করে বলেছেন- যে, সমস্ত জননী সন্তানদেরকে পুরো সময় পর্যন্ত দুগ্ধ পান করার ইচ্ছা রাখেন, তারা নিজেদের শিশুদেরকে পুরো দু’বছর ধরে দুগ্ধ পান করাবে।’ (সূরা-বাকারা-২৩৩)। অপর এক আয়াতে এরশাদ হচ্ছেঃ আমি তো মানুষকে তার পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছি। তার মা তাকে কষ্টের পর কষ্ট করে গর্ভধারণ করে। এরপর তার দুধ ছাড়ানো হয় দু’বছরে’ (সূরা-লুকমান, আয়াত-১৪)। আয়াতগুলো দ্বারা বোঝা যায় যে, শিশুকে পূর্ণ দু’বছর তার মা তাকে দুধ পান করাতে হবে। প্রয়োজনে আরো ছয়মাস সময় বাড়ানো যেতে পারে। আর এ ব্যাপারে আল্লাহতা’য়ালা বলেন- ‘তাকে গর্ভে ধারণ করতে ও দুধ ছাড়াতে লাগে ত্রিশ মাস।’ (সূরা-আহকাফ-২৫)।
মায়ের বুকের দুধ শিশুর জন্য আল্লাহ পাকের পক্ষ থেকে এক মহা নেয়ামত। মাতৃদুগ্ধ ভেতর দিয়ে মা ও শিশুর মাঝে এমন এক আত্মার বন্ধন সৃষ্টি হয়, তা অবশ্যই চিরস্থায়ী। আর দুধের মাধ্যমে মায়ের আচার-আচরণ ও স্বভাবের আদান-প্রদান হয়, তা কুরআন ও হাদীসে এ ব্যাপারে স্পষ্ট বলা হয়েছে। মহান আল্লাহ পাক কালামে এরশাদ করেন-‘আমি মুসার মায়ের অন্তরে এই ইলহাম করলাম যে, তুমি তাকে (মুসাকে) দুগ্ধদান কর। আর যদি তার নিরাপত্তা বিষয়ে তোমার ভয় হয়, তাহলে তাকে নদীতে ভাসিয়ে দিও এবং তুমি কোন ভয় বা চিন্তা করো না। আমি একে তোমার কাছে অচিরেই ফিরিয়ে দিব এবং একে অচিরেই একজন প্রেরিত রসূল করতে যাচ্ছি। (সূরা কাসাস-৭)
দুধের মাধ্যমে মায়ের আচার-আচরণ যে স্বভাবের প্রকাশ পায় সে সম্পর্কে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) বলেছেন- তোমরা তোমাদের সন্তানদেরকে দুশ্চরিত্রা ও অপ্রকৃতিস্থ রমণীর দুগ্ধ পান করানোর ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন কর।
আমাদের দেশে অনেক মহিলা তার শিশু সন্তান বুকের প্রথম শাল দুধ খাওয়ান না। তারা মনে করেন যে, শিশুর জন্য এটা ক্ষতিকর। অথচ মায়ের বুকের দুধ হচ্ছে প্রয়োজনীয় পুষ্টি সমৃদ্ধ, যা শিশু সহজেই হজম করতে পারে। শারীরিক বৃদ্ধিসহ সার্বিক ভিটামিন সমৃদ্ধ। সাধারণ যে শিশু পরিতৃপ্তভাবে মায়ের দুধ পান করেছে তার মেধাশক্তিও প্রখর হয়। তাছাড়া চেহারার লাবণ্য, বাকশক্তি ও সাধারণ বুদ্ধি বিকাশেও মাতৃদুগ্ধ সাহায্য করে। এছাড়া বাচ্চার ডায়রিয়া, কানপাকা রোগ, শ্বাসনালীর রোগ, হ্নদপিন্ডের রোগ, খাদ্যনালীর রোগ কম হয়।
মাতুদুগ্ধের গুরুত্বের প্রতি লক্ষ্য করলে হযরত ওমর (রাঃ)-এর শ্বাসনামলের একটি ঘটনা এখানে উল্লেখ করছি- হযরত ওমর (রাঃ)-এর শাসনামলের প্রথমদিকে যেহেতু মাতৃদুগ্ধ পানরত শিশুরা রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে আথির্ওক অনুদান পেত না। সেহেতু মায়েরা শিশুদের জন্য অনুদান পাওয়ার আশায় তাড়াতাড়ি বুকের দুধ খাওয়ানো বন্ধ করে দিতেন।
এ অবস্থা লক্ষ্য করে হযরত ওমর (রাঃ) শিশুদেরকে বুকের দুধ দানে মায়েদেরকে উৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে জন্মের পর থেকে এই আর্থিক অনুদান চালু করেন। কৃত্রিম দুধ শিশুর জন্য মোটেই কল্যাণকর নয়। কৃত্রিম দুধ শিশুর স্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। মায়ের বুকের দুধ ছাড়া অন্য দুধ পান করালে, শিশুর এলার্জি, একজিমা, খাদ্যনালীর ব্যথা, ডায়রিয়া, হ্নদরোগ, ডায়াবেটিসসহ আরো নানা রোগে আক্রান্ত হতে পারে।
আজ বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ দিবস। তাই আসুন, ইসলামে মাতৃদুগ্ধের ব্যাপারে যে গুরুত্ব ও আদেশ রয়েছে তা আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে মেনে চলি।
মাতৃদুগ্ধ শিশুর অধিকার। সে অধিকার যাতে কোন কারণে খর্ব না হয়, সে ব্যাপারে যথেষ্ট দৃষ্টি রাখতে হবে। কেননা ‘আজকের শিশু, আগামী দিনের ভবিষ্যৎ’। ভবিষ্যৎ কর্ণধার শিশুদের এই অধিকারের ব্যাপারে মায়েদের ভূমিকাটাই সবচেয়ে বেশি। এ ব্যাপারে মায়েরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করবেন- সেই প্রত্যাশাই কামনা করি।
*************************
দৈনিক ইত্তেফাক, ০৮ আগষ্ট ২০০৮