ইসলাম ক্যালিগ্রাফি শিল্পে সর্ববৃহৎ চালিকা শক্তি। আল্লাহ তায়ালা এ পৃথিবীকে নানা অপূর্ব সাজে সজ্জিত করেছেন। সবুজ ঘাস, পত্র-পল্লব,বৃক্ষের শাখা, বনাঞ্চলের প্রাণী এবং উড়ন্ত পাখি সব কিছুতেই বিধাতার অনন্য সাধারণ পরিপূর্ণতা আমরা দেখতে পাই। বিশ্বাসের নির্ভরতায় মুসলিম শিল্পীরা আল্লাহর এই রূপ-দক্ষতাকে অত্যন্ত অভিনিবেশ এবং আন্তরিকতার সাথে অবলোকন করেন। সৃষ্টির সকল বিমুগ্ধতাকে গ্রহণ করে শিল্পীরা রঙে রেখায়, প্রকাশ করেন তাদের শিল্পমন। আর এমনইভাবে নির্মিত হতে থাকে অসাধারণ বহু শিল্পকর্ম। শিল্পকর্মের এই প্রাসঙ্গিকতা থেকে মুসলিম শিল্পীরা বিশেষভাবে একটি শিল্প শাখায় তাদের মনের অনুভব এবং মহান বাণীর প্রতি ভালোবাসার উন্মোচন ঘটান। ক্যালিগ্রাফি শিল্প এমনই একটি অন্যতম শিল্পভুবন। ক্যালিগ্রাফি শিল্পীগণ পৃথিবীর পত্রপুষ্প এবং বৃক্ষলতার আকৃতিগত সৌন্দর্য ও অলঙ্কৃত সম্ভারের গতিময়তার সঙ্গে অক্ষর লিপির বিন্যাস ঘটিয়ে শিল্পকর্ম এঁকে চলেন। ক্যালিগ্রাফি শিল্পী শুধু অক্ষর আঁকেন তা নয়, বরং পৃথিবীতে যে সমস্ত আকৃতি তিনি দেখতে পান সে সমস্ত আকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধান করে তার লিপি প্রকরণ পায়।
গত দুই দশক ধরে বাংলাদেশে এ ক্যালিগ্রাফি শিল্পের চর্চা ও প্রসার লক্ষ্য করার মত। আমাদের দেশের বহু প্রবীণ-নবীন প্রথিতযশা শিল্পীরা এই ক্যালিগ্রাফি এঁকে চলছেন। তবে আরবী লিপিশিল্প থেকে উদ্ভাবিত এই ক্যালিগ্রাফি শিল্পকে এই দেশে বিশেষভাবে অনন্য মাত্রা সংযোজনের ক্ষেত্রে যাদের অবদান অনস্বীকার্য, শিল্পী আমিনুল ইসলাম তাদের মধ্যে অন্যতম।
বিশিষ্ট ক্যালিগ্রাফি শিল্পী আমিনুল ইসলামের ‘৩য় একক ক্যালিগ্রাফি প্রদর্শনী’ গত ২ আগস্ট ০৮ থেকে সপ্তাহব্যাপী এশিয়াটিক সোসাইটির গ্যালারিতে প্রদর্শিত হচ্ছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তাকে একজন বিশিষ্ট ইসলামী চিত্রশিল্পী এবং একজন ইসলামী ভাস্কর শিল্পী হিসাবে সংবর্ধনা প্রদান করা হচ্ছে। ‘এশিয়াটিক সোসাইটি বাংলাদেশ’ এবং ইসলামিক আর্ট অর্গানাইজেশন অব বাংলাদেশ’ সংগঠন দুটির যৌথ উদ্যোগে শিল্পীর প্রদর্শনী এবং তাকে সংবর্ধনা প্রদানের এ মহতি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। আজ প্রদর্শনীর শেষ দিন। শিল্পীর উক্ত একক ক্যালিগ্রাফি প্রদর্শনীতে পঞ্চাশের অধিক ক্যালিগ্রাফি শিল্প প্রদর্শিত হচ্ছে।
শিল্পী আমিনুল ইসলাম আরবী ক্যালিগ্রাফিকে ক্যানভাসের জমিনে অপরূপ লাবণ্যে উপস্থাপন করেন। তার লিপির অন্তর্নিহিত ব্যঞ্জনা এবং তার আবেগময়তার উচ্ছ্বাস একাগ্রভাবে সারা ক্যানভাসময় ভেসে বেড়ায়। ক্যানভাসের মাঝে তিনি মহান আল্লাহর বাণীকে বিভিন্ন লিপিশৈলীর নির্ভরতায় এঁকে চলেন। তার ক্যানভাসে বাণীর মাধুর্যতাকে সঙ্গ করে বর্ণের নির্মাণ গড়ে ওঠে। এভাবে ক্যালিগ্রাফিতে তিনি একটি স্বতন্ত্র ধারা সৃষ্টি করেছেন। বিশেষভাবে বিজ্ঞানের সঙ্গে আধ্যাত্মবাদের তুলনামূলক সমম্বয় ঘটিয়ে এক অনন্য ক্যালিগ্রাফি শিল্প সৃষ্টিতে তিনি সিদ্ধহস্ত। তার সবচেয়ে উল্লেখ করার মত একটি বিষয হচ্ছে, আমাদের বাংলাদেশে তিনিই প্রথম একটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী আর্ট মিউজিয়াম নির্মাণের স্বপ্ন উপস্থাপন করেছেন। ”রেমযম্রণঢ অ্রফটবধড ইর্র ুল্রণলবঃ ীটহমর্ল”টি তারই অক্লান্ত পরিশ্রম সাধনা ও অনন্য প্রয়াসের স্বপ্নের বহিঃপ্রকাশ।
উক্ত প্রদর্শনীতে উপস্থাপিত শিল্পীর বিভিন্ন মাধ্যমে করা ক্যালিগ্রাফিগুলো নান্দনিকতায় পরিপূর্ণ। শিল্পীর কিছু অসাধারণ শিল্পকর্মের কথা উল্লেখ না করলেই নয়। ‘সংঘর্ষহীন এক পৃথিবী চাই’ বাংলা লিপিতে একটি শিল্পকর্ম উপস্থাপন করা হয়েছে। এই শিল্পকর্মটি আমাদের হ্নদয়াবেগকে অবশিষ্ট করে ফেলে। যুদ্ধ বিগ্রহের ও অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে সাহস সঞ্চার করে এবং নিপীড়িত মানুষের আর্তনাদ ধ্বনির কান্নাময় আওয়াজ আমাদেরকে আবেগী করে তোলে। এছাড়াও শিল্পী দুইটি ভাস্কর্য উপস্থাপন করেছেন। যা আমাদের দেশে অন্যতম নতুন সংযোজন ক্যালিগ্রাফি শিল্পে। অপূর্ব দুটি ভাস্কর্য আল্লাহর মাহাত্ম্য প্রকাশ করছে। বিশেষ করে সর্বমহলের মানুষের প্রশংসা কুড়িয়েছে একটি ক্যালিগ্রাফি।
শিল্পী তার এই ক্যালিগ্রাফিটিকে আল্লাহর বাণীর সঙ্গে সমম্বয় ঘটিয়ে মানুষের গর্ভধারণের একটি ধারাবাহিক চিত্র নির্মাণ করেছেন। কিভাবে একটি রক্ত বিন্দু থেকে পূর্ণাঙ্গ মানুষ রূপে নির্মিত হয় মায়ের গর্ভক্ষেত্রে। শিল্পীর উপস্থাপিত এইসব ক্যালিগ্রাফি আমাদের দেশে এ শিল্পের অগ্রসরতার একটি অনন্য চিত্র বহন করে। তবে কিছু ভুল সৃষ্টি হয়েছে প্রদর্শনী কেন্দ্রিক কিছু ক্ষেত্রে। এছাড়াও কিছু অনন্য অসাধারণ ক্যালিগ্রাফির পাশে একেবারে সাদামাটা কিছু ক্যালিগ্রাফি দেখা গেছে। যা হবার নয়।
তবুও সর্বদিক বিবেচনায় শিল্পী আমিনুল ইসলামের এ একক ক্যালিগ্রাফি প্রদর্শনী আমাদের ক্যালিগ্রাফি শিল্পে এক নতুন মাত্রা সংযোজন করবে এবং ক্যালিগ্রাফি শিল্পে আধুনিকতা ও উৎকর্ষতার যে ছোঁয়া লেগেছে তার স্থায়িত্ব চিরন্তনী হয়ে উঠবে। মহান প্রভুর কাছে সর্বশেষ এই প্রার্থনাই করি।
*************************
তারিক আজিজ
দৈনিক ইত্তেফাক, ০৮ আগষ্ট ২০০৮