রমজানের সংযম বাজার দরে প্রতিফলিত হওয়া প্রয়োজন
- By Article Poster
- Published 08/23/2008
- রোযা
- Unrated
রমযানের আগমনের সকল মুসলমানের মধ্যেই এক বিশেষ ধরনের আনন্দধারা বয়ে যায়। কারণ রমযান মুমিন-মুসলমানের জন্য রহমত, বরকত ও মাগফিরাতের বারতা নিয়ে উপস্থিত হয়। কিন্তু দেশের অবৈধ মজুতদার আর মুনাফাখোরেরা দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি করে দিয়ে পুরো আনন্দটা ম্লান করে দেয়। রমযান এলেই এখন অল্প আয়ের লোকদের জন্য আনন্দের পরিবর্তে নাভিশ্বাস শুরু হয়। কিন্তু অবৈধ মজুতদার ও মুনাফাখোরেরা ঠিকই পুরো রমযান ও ঈদ অত্যন্ত জাঁক-জমকের সাথে প্রতিপালন করে যায়। পুরো রমযান মাসে দুহাতে যা পায় তা লুটে নেয়। রমযান এলে মনে হয় তাদের পোয়াবারো শুরু হয়। প্রতিটি রমযানেই তাদের অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় যে এটিই তাদের শেষ রমযান, সামনের রমযান হয়তো বা ভাগ্যে নাও জুটতে পারে। ফলে সারা বছর মুনাফার জেরটুকু রমযানেই সমান করে নেয়। বর্তমান সময়ে আমাদের দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অন্যায়-অপরাধের বা অসাধু ব্যবসায়ীদের অভয়রাণ্যে পরিণত হয়েছে। তাদের কেশাগ্র স্পর্শ করার মত কোন শক্তি যেন এখনো জন্মায়নি। মজুতদারীর মাধ্যমে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি করা, প্রতারণাপূর্ণ দালালীর মাধ্যমে উক্ত দাম হাঁকা, মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের নিমিত্তে লোভনীয় বিজ্ঞাপন ও কৃত্রিম উপায় অবলম্ব করা, মিথ্যা শপথ করা, বিক্রিত মালের দোষ-ত্রম্নটি গোপন করা, চোরাই কারবার করা, খাদ্যদ্রব্যসহ অন্যান্য জিনিসে ভেজাল মেশানো, ওজনে কারচুপি করা ইত্যাদি আজ মামুলী ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নবী করীম (সাঃ) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ঈমান ও এহতেসাবের সহিত রোযা রাখবে তার অতীতের গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে। ‘হাদীসে বিবৃত ঈমান ও এহতেশাম তাকওয়ার অপরিহার্য উপাদান। এ দু’টি ছাড়া তাকওয়ার কোন অস্তিত্বই থাকে না। প্রথম উপাদানটি হলো, এমন এক বিশ্বাস, যে বিশ্বাস সর্বদা পরাক্রমশালী এক সত্বার ভীতি প্রদর্শন করতে থাকে। যে সত্বা নিখিল বিশ্বের স্রষ্টা ও মহাপরিচালক, যিনি সর্বময় ক্ষমতা ও সার্বভৌম শক্তির অধিকারী, যিনি বিশ্বজাহান পরিচালনা করছেন এবং মহাপরিকল্পনা মোতাবেক, যিনি গোটা দুনিয়ার প্রতিটি অণু-পরমাণুর পূর্ণ খোঁজ-খবর রাখেন, মানুষের দৈনন্দিন কল্যাণ-অকল্যাণ, ভালো-মন্দ যার নিয়ন্ত্রণাধীন, প্রকৃতিরাজ্যের যিনি মালিক ও নিয়ন্ত্রণকারী। দ্বিতীয় উপাদানটি হলো, সর্বদা নিজের চিন্তা-কল্পনা ও কাজ কর্মের প্রতি সতর্ক সৃষ্টি রাখা। রোযাদারদের মধ্যে অবশ্যই আমাদের ব্যবসায়ী বন্ধুগণও রয়েছেন। তারা যদি ঈমান ও ইহতেসাবের সাথে রোযা রাখে, তাহলে তাদের মধ্যেও তো উল্লেখিত বোধটুকু উদয় হওয়ার কথা। প্রতি বছরই যদি দ্রব্যমূল্য উল্লেখিত খবরাখবর আমাদের কাছে আসে তবে বুঝতে হবে তাদের রোযা শুধুমাত্র উপোস এবং কিয়ামূল লাইন শুধু রাত্রি জাগরণ ছাড়া আর কিছুই দিতে পারিনি।
রাসুল (সঃ) বলেছেন, ঐ ব্যক্তি মুসলিম, যার হাত ও মুখ থেকে অন্য মুসলিম নিরাপদ থাকে। কৃত্রিম খাদ্য সংকট সৃষ্টি করে মুসলিমকে কষ্ট দেয়া হারাম। বিশেষত কোন রোযাদারকে কষ্ট দেয়া আরো মারাত্মক ব্যাপার। বোখারী শরীফের একটি হাদীসে বলা হয়েছে, ‘সমস্ত মানুষের মধ্যে মাল খরচ করার ব্যাপারে রাসুল (সাঃ) এর হস্ত অধিক প্রসারিত ছিল। কিন্তু পবিত্র রমযান মাসে যখন জিবরাইল আমিনের সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হতো তখন তার দানের সীমা থাকতো না। তিনি এমনভাবে দান খয়রাত করতেন যেমনিভাবে ঝড়ে সব উড়িয়ে নিয়ে যায়। ‘অন্য হাদীসে আছে রমযান মাসের একটি ফরয ৭০টি ফরযের সমান হয়ে থাকে এবং একটি নফল একটি ফরযের সমান হয়ে থাকে। আল-কুরআনে ঘোষণা করা হয়েছে যে, আল্লাহর পথে একটি পয়সা, একটি শস্য, একটি দানার বিনিময়ে কমপক্ষে সাত শত গুণ প্রতিদান দেয়া হবে। এর পর বলা হয়েছে এর চেয়েও অধিক দেয়া হবে। হযরত ইবনে আব্বাস আঃ রমযানে অন্যান্য সময় অপেক্ষা অধিক দয়ালু ও সহানুভূতিশীল হতেন। কিন্তু আমাদের ব্যবসায়ীগণ রমযান এলে বিপরীত দৃশ্যের অবতারণা করেন। যা একজন মুসলমান ব্যবসায়ীর জন্য তার ঈমানের জন্য সম্পূর্ণ পরিপন্থি।
ইসলাম আয়-উপার্জনকে কখনো নিরুৎসাহিত করেনি। বরং রাসুল (সাঃ) এর অসংখ্য বাণীতে রুজি-রোজগারের ব্যাপারে উৎসাহ দানের প্রমাণ পাওয়া যায়। কিন্তু আয়-উপার্জনে হালাল-হারামের একটি সীমারেখা রয়েছে। অর্থ-সম্পদের প্রতি মোহ শাশ্বত। কিন্তু অতিরিক্ত মোহ মানুষকে দুর্নীতির দিকে ঠেলে দেয়। তাই রাসুলে আকরাম (সাঃ) বলেছেন, ধনী হওয়া সম্পদের প্রাচুর্যের নাম নয় বরং প্রকৃত সম্পদশালী সেই, যার অন্তর সম্পদশালী। অবৈধভাবে আহরিত সম্পদ অপবিত্র। তিনি আরো বলেছেন, আল্লাহ পবিত্র। পবিত্র জিনিস ব্যতীত তিনি অন্য কিছু গ্রহণ করেন না। (মুসলিম) বৈধভাবে যতটুকু সম্পদ অর্জন করা হয়, ততটুকুতেই আল্লাহর অবারিত বরকত নিহিত থাকে। হারাম বা অবৈধভাবে আহরিত সম্পদে আল্লাহর বরকত থাকে না। যার ফলে দুর্নীতিবাজ অঢেল সম্পত্তিতেও তৃপ্তি লাভ করতে পারে না। বরং তার লোভের জিহ্বাটি লম্বা হতেই থাকে। ফলে আরো সম্পদ চাই আরো সম্পদ চাই’ করতে করতে এক সময় তার জন্য ধ্বংস অনিবার্য হয়ে পড়ে। পৃথিবী জুড়ে তার অসংখ্য নজীর আমরা দেখতে পাই।
সাধারণ অবস্থায় সরকার কর্তৃক দ্রব্যমূল্য নির্ধারণ করে দেয়া ঠিক নয়। কারণ এতে উৎপাদনকারীর উৎপাদনে আগ্রহ ও উদ্দীপনা কমে যায়। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, তোমরা মূল্য বেঁধে দিও না। কেননা আল্লাহ তায়ালাই মূল্য নিয়ন্ত্রণ করেন, হ্রাস-বৃদ্ধি করেন এবং রিযিক প্রদান করেন। হযরত আনাস রাঃ বলেন, নবী করীম (সাঃ) এর যামানায় একবার দ্রব্যমূল্য বেড়ে গেলে লোকেরা বললো হে আল্লাহ রাসুল, আপনি দ্রব্যমূল্য ধার্য করে দিন। নবী করীম (সাঃ) বললেন, আল্লাহ তাআলাই মূল্য নিয়ন্ত্রণ করেন, হ্রাস-বৃদ্ধি করেন এবং রিযক প্রদান করেন। আমি আশাবাদী যে, আমি আল্লাহর সাথে এমন অবস্থায় সাক্ষাৎ করবো যে, রক্তপাত ও আত্মসাৎ করে জুলুম করেছি বলে তোমাদের কেউ আমার বিরুদ্ধে কোন কিছুর দাবি উত্থাপন করতে সক্ষম হবে না।
মূল্য বিক্রেতার অধিকার। তাই বলে খাদ্য দ্রব্যের উৎপাদনকারী ও ব্যবসায়িগণ যেনতেনভাবে মূল্য নির্ধারণ করতে পারেন না। যদি এমনকি কেউ করেন তবে উল্লেখিত হাদীসের আলোকে আত্মসাৎকারী হিসাবে সাব্যস্ত হবেন। এ ধরনের অসাধু, স্বেচ্ছাচারী উৎপাদনকারী ও ব্যবসায়িগণ যদি সীমালংঘনপূর্বক অস্বাভাবিকভাবে দ্রব্যমূল্য বাড়িয়ে দেয় এবং মূল্য নির্ধারণ ছাড়া ভোক্তার অধিকার সংরক্ষণ করা সম্ভব না হয় তাহলে সরকার বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী মূল্য নির্ধারণ করে দিতে পারে। মূল্য নির্ধারণের পর কেউ যদি সীমালংঘন করে অধিক মূল্যে বিক্রয় করে তাহলে এ বিক্রয় যথার্থ হবে না, আইন লংঘনের দায়ে সে দোষী সাব্যস্ত হবে। কুরআন ও হাদীসে ব্যবসা-বাণিজ্যকে ধন-সম্পদ বিনিময় বা আয়-উপার্জনের মাধ্যম বলা হয়েছে। হালাল উপায় আয়-উপার্জন করতে হলে, তার সঠিক পন্থা হলো পারস্পরিক সম্বতির ভিত্তিতে ব্যবসা-বাণিজ্য করা। বাতিল পন্থায় আয় উপার্জন করা হারাম। আল্লাহতাআলা বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ, তোমরা পরস্পরের ধন-সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না। তবে পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে ব্যবসা-বাণিজ্য করা যেতে পারে। (আল কুরআন ৪: ২৯)।
তাই এটি একটি মর্যাদাসম্পন্ন কাজ। কিন্তু এ হালাল ব্যবসায় এমন কতগুলো কাজ আছে যা আপনার পুরো ব্যবসাকে হারামে পরিণত করে দেয়। তন্মধ্যে একটি হলো অবৈধ মজুদদারীর মাধ্যমে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি করা। মানুষ ও পশুর নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য খরিদ করে অস্বাভাবিক ও অধিক মূল্যে বিক্রি করার জন্য তা আটকিয়ে রাখাকে শরীয়তের পরিভাষায় ইহতেকার বলা হয়। ইমাম আবু ইউসুফ (রাঃ) এর মতে যে সব জিনিস আটকিয়ে রাখলে বা মজুদ করে রাখলে সর্বসাধারণের কষ্ট ও ক্ষতি হয় তাকে ইহতেকার বলে। রাসুল (সাঃ) ইরশাদ করেছেন, মজুতদার ব্যক্তি খুবই নিকৃষ্টতম ব্যক্তি। যদি জিনিসপত্রের দাম হ্রাস পায় তবে তারা চিন্তিত হয়ে পড়ে। আর যদি দর পরে বেড়ে যায় তবে আনন্দিত হয়। (মিশকাত) সাঈদ ইবনুল মুসাইব বলতেন, মা’মার বলেছেন, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, যে ব্যক্তি গুদামজাত করে সে পাপী।
সুতরাং আসুন উল্লেখিত খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকি। আসমান ও জমিনের মালিক আপনার ব্যবসায় কোন দিক থেকে বরকত দিবেন তা আপনি টের পাবেন না। রোযাদার আল্লাহর লোক, তাকে কষ্ট দেয়া মানে আল্লাহকে কষ্ট দেয়া। রাসুল (সঃ) হাদীসে কুদসীতে বলেছেন, আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘রোযা আমার এবং আমি নিজেই তার প্রতিদান।’
**************************
জা ফ র আ হ ম দ
দৈনিক ইত্তেফাক, ২২ আগষ্ট ২০০৮