যে কজন সাধারণ নারী আল্লাহর অনুগ্রহপ্রাপ্ত হয়ে জগতের বুকে অসাধারণ ও মহিমাম্বিত হয়ে আছেন তাদের মধ্যে উম্মে মূসা অর্থাৎ মূসার জননী অন্যতম। বলা বাহুল্য যে পবিত্র কোরআনে মূসার জননীকে তার নিজ নামে বা অন্য কোন নামে সম্বোধন করা হয় নাই। তিনি উম্মে মূসা নামেই অভিহিত হয়েছেন। তার প্রকৃত নাম ইয়ূকাবিদ (ামডদণঠণঢ)। তিনি সেই মহিয়সী নারী যিনি দুই নবী হযরত হারুন ও হযরত মূসা (আঃ) কে গর্ভধারণ করে গৌরবাম্বিত হয়ে আছেন।

ফিরআউনের রাজত্বকাল। ফিরআউন অবহিত হন যে, বনী ইসরাইল বংশে জন্মগ্রহণকারী এক পুত্র সন্তান কর্তৃক ১) তিনি বিতাড়িত হবেন ২। তার রাজত্বের অবসান ঘটবে এবং ৩) তার প্রবর্তিত দ্বীনের পরিবর্তন হবে। এ বিষয় অবগত হওয়ার পরে প্রতিকার হিসেবে তিনি ফরমান জারি করেন যে, ইসরাইল বংশে কোন পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করলেই যেন তাকে হত্যা করা হয়। প্রতিটি সন্তান-সম্ভবা মায়ের প্রতি যেন নজরদারী রাখা হয়। এভাবে কিছুকাল অতিবাহিত হওয়ার বনী ইসরাইলের পুত্র সংখ্যা হ্রাস পেতে থাকে এবং এতে করে ফিরআউনের সম্প্রদায়ের লোকজন আশংকা প্রকাশ করে যে ইসরাইল বংশের বিলুপ্ত ঘটলে তাদের দাস ও শ্রমিকের অভাব ঘটবে এবং দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে বিঘ্ন সৃষ্টি হবে। তারা এ আশংকার বিষয়টি ফিরআউনকে অবহিত করেন। অতঃপর তিনি নির্দেশ দেন যে, বছর অন্তর অন্তর যেন পুত্র সন্তান হত্যা করা হয় তবে গোপনে গোপনে সার্বিক হত্যার ঘটনা কার্যক্রম অব্যাহত থাকে। বর্ণিত আছে যে বছর হত্যার আদেশ রহিত ছিল সেই বছর হযরত হারুন (আ) জন্মগ্রহণ করেন। আর হত্যার আদেশ যখন বলবৎ ও কার্যকরী ছিল সেই বছর হযরত মূসা (আ·) মায়ের পেটে আসেন। বিষয়টি তার স্বীয় কন্যা মরিয়ম ব্যতীত আর কেউ জানত না। কথিত আছে ‘কাবেলা’ নামক এক কিবতী স্ত্রী মূসার মাতার প্রতি প্রহরী রূপে নিযুক্ত ছিল। ভূমিষ্ট কালীন সময়ে সে হাজির হয় সদ্যোজাত মূসার রূপ লাবণ্য দর্শনে কাবেলা মুগ্ধ হয়ে পড়ে এবং শিশুর প্রতি তার স্নেহ-মায়া সৃষ্টি হয়। সে মূসার জননীকে অভয় দিয়ে বলে, ‘তুমি চিন্তা করিওনা, আমি এ বিষয় প্রকাশ করিব নাঃ·। এভাবে মূসা জননী শিশু মূসাকে তিন চার মাস পর্যন্ত গোপনে রেখেছিলেন। শিশু মূসার জন্মের পর থেকেই উম্মে মূসা বিচলিত হয়ে পড়েন এই ভেবে না জানি এ সংবাদ ফিরআউনের দরবারে পৌঁছে যায়। নিষেধাজ্ঞার কালে গর্ভধারণ, পুত্র সন্তান প্রশব এ সমগ্র বিষয়টি উম্মে মূসাকে সার্বক্ষণিকভাবে চিন্তাক্লিষ্ট ও তটস্থ করে রাখে। ভয় ও শংকায় তার দিন অতিবাহিত হতে থাকে। কিভাবে শিশুটিকে বাঁচিয়ে রাখা যায় এই ভেবে তিনি দুঃশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। এ প্রেক্ষাপটেই তার নিকট প্রত্যাদেশ আসে, ‘আমি মূসার জননীর নিকট আদেশ পাঠালাম যে, তাকে স্তন্য দান করতে থাক। অতঃপর যখন তুমি তার সম্পর্কে বিপদের আশংকা কর তখন তাকে দরিয়ায় নিক্ষেপ কর এবং ভয় করো না, দুঃখও করো না। আমি অবশ্যই তাকে তোমার কাছে ফিরিয়ে দেব এবং তাকে পয়গম্বরগণের একজন করব।’ ২৮:৭। পরবর্তী পর্যায়ে ফিরআউনের অনুচরগণ যখন শিশু হত্যার বিশেষ অভিযান শুরু করে তখন মূসা-জননী অত্যন্ত ভীত সন্ত্রস্ত ও বিচলিত হয়ে পড়েন। পুত্রের আশু বিপদ আশংকায় অস্থির ও অধৈর্য হয়ে উঠেন-চিত্তে সৃষ্টি হয় বৈকল্য। এই অবস্থায় তিনি সম্পূর্ণ আল্লাহর উপরে নির্ভর করে একটি সিন্দুক তৈরি করে এর মধ্যে শিশু মূসাকে স্থাপনপূর্বক চাদরে আবৃত করে এটিকে আল্লাহর নির্দেশ অনুসারে নীল দরিয়া ভাসিয়ে দেন। কথিত হয়ঃ তিনি সিন্দুকটিকে রশি দিয়ে বেঁধে রাখেন যাতে করে সুযোগ ও সুবিধা বুঝে শিশুকে দুধ পান করানো যায়। ঘটনাক্রমে, একদিন রশি ছিন্ন হয়ে যায়। সিন্দুক নীল নদের অসীম সীমানায় ভেসে বেড়াতে থাকে। এ অবস্থায় উম্মে মূসা অত্যন্ত অসহায় বোধ করেন। মাতৃহ্নদয়ে জেগে উঠে পুত্র হারানোর বেদনা। সিন্দুক ভেসে ভেসে অবশেষে ফিরউনের বাড়ীর সন্নিকটে এসে পৌঁছলো। ফিরাআউনের লোকজন এটিকে উঠিয়ে নেয় এবং পরবর্তীতে ফিরআউনের স্ত্রী ‘আসিয়া’ এর নিকট নিয়ে এল। সিন্দুক খুলে আবরণমুক্ত করে দেখা গেলঃ এতে রয়েছে অপরূপ সুন্দর মায়াবী চেহারা বিশিষ্ট ফুটফুটে এক নিষ্পাপ শিশু। শিশু দর্শনে সবার মন স্নেহসিক্ত হয়ে উঠে। বিশেষ করে, ফির আউন-স্ত্রী আসিয়ার কোমল অন্তর মাতৃস্নেহে বিগলিত হয়। বিষয়টি ফিরআউনকে অবহিত করা হলে তিনি শিশুটিকে মেরে ফেরার নির্দেশ দেন-কিন্তু, এতে বাধ সাধেন স্ত্রী আসিয়া। পাক কোরআনের উল্লেখঃ ‘ফিরাআউনের স্ত্রী বলল, এ শিশু আমার ও তোমার নয়ন প্রীতিকার। একে হত্যা করোনা। ২৮ঃ৯। এদিকে মূসা জননী যখন জানতে পারেন যে, কিন্তু এবার ফেরআউনের হস্তে সমর্পিত তখন তার মাতৃহ্নদয় সমূহ বিপদ আশংকায় পরিপূর্ণ হয়ে উঠে তিনি ধৈর্য হারা হয়ে উঠেন এবং সমগ্র বিষয়টি ফিরআউনের নিকট অকপটে ব্যক্ত করতে উদ্যত হন। এ সময় আল্লাহপাক তাকে আবারও সহায়তা দান করেন। ‘এবং মূসার জননীর অন্তর ধৈর্য শূন্য হয়ে গেল, নিশ্চয় সে তা প্রকাশ করতে উদ্যত ছিল, যদি না আমি তার অন্তর দৃঢ় রাখতাম। ২৮:১০। ফিরআউনের স্ত্রীর তত্ত্বাবধানে এবার শিশু প্রতিপালিত হতে থাকে-তবে সমস্যা দেখা দেয় স্তনপান নিয়ে- শিশু কোন ধাত্রীরই স্তন পান করছে না। বিষয়টি ফিরআউন স্ত্রী আসিয়াকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলে। অবশেষে মূসার ভগ্নী মরিয়ম যে গোপনে সমস্ত ঘটনা পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছিল সে এসে আবেদন জানায় যে আমি এমন একজন মহিলার কথা জানি যার স্তন এই শিশু পান করতে পারে। সেই মহিলাটিকে হাজির করতে তাকে আদেশ দেয়া হয়। অতঃপর সে নিজ মাতা অর্থাৎ মূসার জননীকে সবার সামনে উপস্থিত করে। স্তন দেয়া হলে পর মূসা নির্বিঘ্নে দুগ্ধ পান করতে থাকেন। এ ঘটনায় সবাই বিস্ময়াভিভূত হয়। উম্মে মূসাকে রাজপরিবারের অবস্থান করার অনুমতি প্রদান করা হল। কিন্তু তিনি সেখানে থাকতে অস্বীকার করেন এবং বলেন যে তার স্বীয় স্বামী-পুত্র-কন্যা-পরিবার রয়েছে। অবশেষে কিছু শর্তসাপেক্ষে তাকে শিশুসহ নিজ গৃহে অবস্থান করার অনুমোদন দেয়া হয়। উম্মে মূসা অত্যন্ত প্রফুল্ল চিত্তে স্বীয় পুত্র শিশু মূসাকে নিয়ে নিজগৃহে প্রত্যাবর্তন করে।

পবিত্র কোরআনের বর্ণনাঃ ‘অতঃপর আমি তাকে জননীর কাছে ফিরিয়ে দিলাম, যাতে তার চক্ষু জুড়ায় এবং তিনি দুঃখ না করেন এবং যাতে তিনি জানেন যে, আল্লাহর ওয়াদা সত্য কিন্তু অনেক মানুষ তা জানেন না।’ ২৮:১৩।

উম্মে মূসার যে সামগ্রিক চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য আমাদের সামনে ধরা পড়ে এতে সুস্পষ্টতই প্রতীয়মান হয় যে, ফিরআউন আরোপিত বিধি নিষেধের মধ্য দিয়ে গর্ভধারণ থেকে শুরু করে নিজ বক্ষে শিশু মূসা পুনরায় ফিরে না আসা পর্যন্ত সমস্ত সময়টা তার অতিবাহিত হয়েছে শংকা, উদ্বেগ ও উৎকক্তায়। অতি উদ্বেগ ও উৎকক্তায় তার ধৈর্যচ্যুত হবারও উপক্রম হয়। একজন মাতা, একজন নারী হিসাবে এ পর্যায়ে তার আবেগ ও আচরণ অন্য সাধারণ নারীদের মতোই। তবে তার প্রতি আল্লাহর অশেষ অনুগ্রহ ও করুণা তাকে অন্য নারীদের চেয়ে বৈশিষ্ট্যমন্ডিত করে রেখেছে। প্রতিটি বিপদ ও দুর্যোগ মোকাবেলায় আল্লাহ তাকে অহরহ সাহায্য করেছেন। আল্লাহর উপর তার অগাধ আস্থা ও বিশ্বাস। আল্লাহর উপর নির্ভর করেই তিনি শিশুর জীবনের ঝুঁকি মনে করেও আল্লাহর নির্দেশ অনুসারে শিশুকে সমুদ্রে নিক্ষেপ করেন একমাত্র ভরসা যে আল্লাহই তাকে হেফাজত করেন। নারী হিসাবে মানবীয় দুর্বলতা থাকা অস্বাভাবিক নয়-মূসা জননীও এর ব্যতিক্রম নন। তবে তার সব দুর্বলতা অপসারিত হয়ে গেছে আল্লাহ কর্তৃক সংশোধিত হয়ে। সেই ঘটনাটি উল্লেখ করা যায় যখন তিনি জানতে পারেন শিশু মূসা এখন ফিরআউনের কবজায়, তখন তার মাতৃয় হ্নদয় শংকায় অজানা ভয়ে বিচলিত হয়ে পড়ে। তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে, সমস্ত বিষয় তিনি ফিরআউনের নিকট অকপটে প্রকাশ করে দেবেন। এ পর্যায় আল্লাহ তাকে এ প্রকাশনা থেকে বিরত রাখেন। পবিত্র কোরআনের উক্তিঃ ‘যদি আমি তার হ্নদয়কে দৃঢ় না করে দিতাম, তবে তিনি মূসার জন্য অস্থিরতা প্রকাশ করেই দিতেন।’ ২৮ঃ১০। অন্য মহিলাদের স্তন থেকে বিরত রেখে শিশু মূসাকে আল্লাহ অত্যন্ত সুকৌশলে মূসার জননীর নিকট প্রত্যানীত করে তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেন। ভয়-ভীতি, অধৈর্য-অস্থিরতা, উদ্বেগ-উৎকক্তা, শংকা-আশংকা সমস্ত কিছু দূরীভূত করে আল্লাহ মূসা জননীকে বুদ্ধিমত্তা ও সহিষ্ণুতা গুণে বিভূষিত করে অবিচল বিশ্বাসে আস্থা রাখতে সহায়তা করেন। আল্লাহর অশেষ রহমত, করুণা ও দয়ায় শিশু মূসা মায়ের কোলে, প্রকারান্তরে, আল্লাহর তত্ত্বাবধানে প্রতিপালিত হন। মূসা জননী আল্লাহর অনুগ্রহ ও আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে বিশ্ব-ইতিহাসে এক গৌরবজনক স্থান অধিকার করে আছেন। যে কয়টি বিশেষ গুণে উম্মে মূসা বিভূষিত তা হচ্ছে,

তিনি দুই নবীর গর্ভধারিনী মা ক· হযরত হারুন ও খ· হযরত মূসা (আঃ), তিনি আল্লাহ ‘ওয়াহি’ বা প্রত্যাদেশপ্রাপ্ত মহীয়শী নারী, আল্লাহ এবং তার নির্দেশনার প্রতি তার অবিচল আস্থা, তার দ্বারা তার গর্ভজাত সন্তান ‘হযরত মূসার মাধ্যমে সত্য ও ন্যায় ধর্ম প্রতিষ্ঠা লাভ ও পবিত্র কোরআনে তিনি ‘উম্মে মূসা’ নামে অভিষিক্ত।

**************************
প্র ফে স র এ ম এ হা লি ম
দৈনিক ইত্তেফাক, ২২ আগষ্ট ২০০৮