- Home
- দৈনন্দিন জীবনে ইসলাম
- ইসলামে জ্ঞান, মূল্যবোধ ও কর্ম
ইসলামে জ্ঞান, মূল্যবোধ ও কর্ম
- By Article Poster
- Published 08/23/2008
- দৈনন্দিন জীবনে ইসলাম
-
Rating:




শরিয়তি কাজ ও কর্তব্যের মূল্য উপলব্ধিতে ফিকাহর জ্ঞান সহায়ক ভূমিকা পালন করে। আর আদেশ ও নিষেধের মানদণ্ডে এসব কাজ ও কর্তব্যের সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এই জ্ঞান বিবিধ ও সাদৃশ্যের মধ্যকার বিভ্রান্তি প্রতিরোধ করে। জীবনের ওপর ইতিবাচক ও নেতিবাচক প্রভাবের আলোকে ইসলাম প্রতিটি কর্মের মূল্যমান নির্ধারণ করে দিয়েছে।
মুস্তাহাব (প্রশংসনীয়) কাজগুলো না করলে শাস্তি নেই, কিন্তু করলে পুরস্কার আছে। আবার এমন বিষয় আছে যা রাসূলুল্লাহ সাঃ সর্বদা করেছেন, পরিহার করেননি; কিন্তু অন্যকে করার জন্য সুস্পষ্ট আদেশ দেননি। এগুলো যে বাধ্যতামূলক নয় তা প্রমাণ করার জন্য সাহাবায়ে কিরাম এসব কাজের কিছু কিছু করেননি। মাজহাবগুলোর মত অনুযায়ী মুস্তাহাবের আদেশ আছে; কিন্তু সুস্পষ্টভাবে নয়। ফরজ দ্ব্যর্থহীনভাবে বাধ্যতামূলক, করলে সওয়াব, উপেক্ষা করলে গুনাহ। আর পালন না করলে ফিস্ক, পাপকাজ। আর বিশ্বাস না করলে কুফরি। ফরজ দু’ভাগে বিভক্ত। ফরজে কিফায়াহ (সামষ্টিক কর্তব্য) ও ফরজে আইন (ব্যক্তিগত কর্তব্য)। ব্যক্তিগত কর্তব্য প্রত্যেক মুসলমানকে পালন করতে হবে। আর সামষ্টিক কর্তব্য কেউ করলেই চলবে, অন্যরা না করলে গুনাহ নেই। ব্যক্তিগত কর্তব্যের শ্রেণী বিভাগ আছে। এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ফারাইজ যা ঈমানের মৌলিক অঙ্গ, যেমন শাহাদাহ অর্থাৎ সাক্ষ্য দেয়া যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই এবং হজরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাঃ তাঁর রাসূল এবং কর্মে প্রতিফলন হচ্ছে সালাত, জাকাত, সিয়াম ও হজের মাধ্যমে। আরো কম গুরুত্বপূর্ণ ফারাইজ আছে, কিন্তু এগুলোও বাধ্যতামূলক। ফরজে কিফায়ার চেয়ে ফরজে আইনের গুরুত্ব অধিক। পিতার প্রতি সদাচার ফরজে আইন যা জিহাদের চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ, জিহাদ ফরজে কিফায়াহ। পিতার অনুমতি ছাড়া পুত্র জিহাদে অংশ নিতে পারবে না। এ সম্পর্কে প্রামাণিক হাদিস আছে। আবার ব্যক্তিগত অধিকারের সাথে সংশ্লিষ্ট ফরজে আইনের ওপর সামাজিক অধিকারের সাথে সম্পৃক্ত ফরজে কিফায়াহ অগ্রাধিকার পাবে। মুসলিম ভূখণ্ড আক্রান্ত হলে জিহাদ ফরজে আইন। তখন পিতার অধিকার গৌণ হয়ে যায়। এমনিভাবে ওয়াজিবের ওপর ফরজ, সুন্নাতের ওপর ওয়াজিব ও মুস্তাহাবের ওপর সুন্নাতের অগ্রাধিকার রয়েছে। একইভাবে ইসলাম ব্যক্তিগত আত্মীয়তার ওপর সমাজিক দায়িত্ব এবং এক ব্যক্তির জন্য উপকারী কাজের ওপর একাধিক ব্যক্তির উপকার হতে পারে এমন কাজে অগ্রাধিকার দেয়। এ জন্য ইসলাম ব্যক্তিগত ইবাদতের চেয়ে জিহাদ ও ফিকাহের প্রতিবেশী গুরুত্ব দেয়। নফল ইবাদত, দান-খয়রাতের চেয়ে দু’পক্ষের মধ্যকার বিরোধ মীমাংসার প্রতিও ইসলাম অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। একজন শাসককে তার নফল ইবাদতের চেয়ে তার সুবিচারের জন্য বেশি পুরস্কার দেয়া হবে। অবক্ষয়ের যুগে মুসলমানরা যেসব ভুল করেছিল তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ নিচে দেয়া হলোঃ
১. তারা উম্মাহর স্বার্থসংশ্লিষ্ট বৈজ্ঞানিক শিল্প ও সামরিক ক্ষেত্রে উদ্ভাবন ও উৎকর্ষ অর্জনের প্রচেষ্টা উপেক্ষা করেছে। এ ছাড়া ইজতিহাদ, আহকাম ও দাওয়া এবং স্বৈরশাসনের বিরোধিতা উপেক্ষা করেছে।
২. তারা ভালো কাজের আদেশ ও খারাপ কাজের নিষেধের মতো ব্যক্তিগত কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করেনি।
৩. তারা কোনো মৌল বিশ্বাসকে কম গুরুত্ব দিয়ে অপর একটিকে বেশি পালন করেছে। তারা রমজানে নামাজের চেয়ে রোজাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। এ জন্য নামাজির চেয়ে রোজাদারের সংখ্যা বেশি দেখা গেছে, বিশেষ করে মহিলাদের ক্ষেত্রে। এদের মধ্যে আবার কেউ কখনো সিজদাই করেনি। অনেকে জাকাতের চেয়ে সালাতের বেশি গুরুত্ব দিয়েছে যদিও আল্লাহতায়ালা কুরআনে একত্রে বাইশবার এ দুটো কাজের আদেশ দিয়েছেন। এ জন্য সাহাবায়ে কিরাম বলতেন, ‘জাকাত ছাড়া সালাত বাতিল।’ আর হজরত আবু বকর রাঃ তো জাকাত অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন।
৪. ফরজগুলো ও ওয়াজিবাতের চেয়ে নাওয়াফিলের প্রতি বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। এ প্রসঙ্গে সুফিদের দৃষ্টান্ত উল্লেখযোগ্য। তারা নানা আচার-অনুষ্ঠান, জিকর ও তাসবিহর ওপর বেশি মনোযোগ দিয়েছেন; সামাজিক ও রাজনৈতিক অনাচার প্রতিরোধের মতো সামাজিক দায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসেননি।
৫. তারা জিহাদ, ফিকাহ, আপস-মীমাংসা, সৎকর্মে সহযোগিতা ইত্যাদির মতো সামাজিক দায়িত্ব অগ্রাহ্য করে ব্যক্তিগত ইবাদত-বন্দেগিতে ব্যস্ত থেকেছেন।
৬. শেষত, অধিকাংশ মানুষ ঈমান, তাওহিদ নৈতিক উৎকর্ষের মাধ্যমে আল্লাহর রেজামন্দি হাসিল ইত্যাদি মৌলিক বিষয় বাদ দিয়ে গৌণ বিষয়ের ওপর অযথা গুরুত্ব দিয়েছেন।
নিষিদ্ধ বিষয়গুলোরও শ্রেণিভেদ আছেঃ যেমন, মাকরুহাত (ঘৃণ্য) কিন্তু গুনাহ নেই। যেগুলো ঘৃণ্য কিন্তু স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ নয়, এসব হালালের চেয়ে হারামের কাছাকাছি। মুতাশাবিহাত (অস্পষ্ট বা নিগূঢ়) সেগুলোই যা অল্প লোকের কাছে জ্ঞাত এবং অজ্ঞাতবশত করে ফেলা হয়। এগুলো হারাম। সুস্পষ্ট নিষিদ্ধ বিষয়গুলো কুরআন ও সুন্নায় বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা কেন খাও না (গোশত) যাতে আল্লাহর নাম উচ্চারিত হয়েছে যখন তিনি নিষিদ্ধ বিষয়গুলো বিস্তারিত ব্যাখ্যা করে দিয়েছেন?’ (৬:১১৯)
এই নিষেধাজ্ঞা দু’ভাগে বিভক্তঃ ছোট ও বড়। ছোট বিষয়গুলো অপসৃত হয় সালাত, সিয়াম ও দান-খয়রাতের মাধ্যমে। কুরআনুল করীম থেকে আমরা জানি, ‘সুকৃতি দুষ্কৃতিকে অপসারিত করে।’ (১১:১১৪)
রাসূলুল্লাহ সাঃ-এর সুন্নাত থেকে আমরা জানি, নিয়মিত সালাত ও সিয়াম আদায় করলে এর মাঝখানের ছোট ছোট গুনাহ মাফ হয়ে যায়। অবশ্য বড় পাপ কেবল খালেস তওবার মাধ্যমে মাফ হতে পারে। এর মধ্যে সবচেয়ে কবিরা গুনাহ হচ্ছে শিরক আল্লাহর সাথে অন্য সত্তাকে শরিক করা। এ গুনাহর কখনো মাফ নেই। আল্লাহ বলেনঃ ‘আল্লাহ্ তাঁর সাথে শরিক করার অপরাধ মাফ করেন না, এ ছাড়া অন্যান্য অপরাধ যাকে ইচ্ছা মাফ করে দেন, যে কেউ আল্লাহ্র সাথে শরিক করে সে এক মহাপাপ করে।’ (৪:৪৮)
অতঃপর হাদিসে উল্লিখিত পাপগুলো হচ্ছেঃ পিতা-মাতার অবাধ্যতা, মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া, জাদু, খুন, সুদ, ইয়াতিমের সম্পদ আত্মসাৎ এবং মিথ্যা অপবাদ, বিশেষ করে সতী মুসলিম মহিলাদের বিরুদ্ধে জিনার অপবাদ।
নিম্নোক্ত বিষয়গুলো থেকে ত্রুটি ও বিভ্রান্তি দেখা দেয়ঃ
ক. মানুষের মধ্যে মুহাররামাতের চেয়ে মাকরুহাত ও মুতাশাবিহাতের প্রতি বাধা দেয়ার প্রবণতা বেশি দেখা যায়। অন্য দিকে ওয়াজিবাতকে উপেক্ষা করা হয়। সুস্পষ্ট হারামের পরিবর্তে মতভেদের বিষয়গুলো নিয়ে বেশি ব্যগ্রতা।
খ. অনেক লোক ভাগ্য গণনা, জাদু, মাজারকে নামাজের স্থান হিসেবে ব্যবহার, মৃতদের উদ্দেশ্যে পশু উৎসর্গ, মৃতদের কাছ থেকে সাহায্য প্রার্থনা ইত্যাদি কবিরা গুনাহর পরিবর্তে ছগিরা গুনাহ প্রতিরোধে বেশি ব্যস্ত। অথচ কবিরা গুনাহগুলো তাওহিদি চেতনাকে দূষিত করে।
একইভাবে বিভিন্ন মুসলমানের আচরণও বিভিন্ন। কোনো কোনো ধার্মিক যুবক জ্ঞান, ঈমান ও শক্তির ব্যাপারে অন্য সবাইকে এমন চোখে দেখে যেন তারা সবাই সমান। সুতরাং তারা সাধারণ ও জ্ঞানী-গুণী মানুষের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে না। এ ছাড়া পুরনো মুসলমান ও নওমুসলিম এবং শক্তিশালী ও দুর্বলের মধ্যেও পার্থক্য করতে পারে না। ইসলাম এই প্রাকৃতিক ভিন্নতার দিকে লক্ষ রেখেই শ্রমসাধ্য ও সহজবোধ্য, ফারাইজ ও নাওয়াফিল, বাধ্যতামূলক ও ঐচ্ছিক আমলের সুযোগ দিয়েছে। তাই আল্লাহ বলেনঃ ‘তারপর আমি কিতাবের অধিকারী করলাম আমার বান্দাদের মধ্যে তাদেরকে যাদেরকে আমি মনোনীত করেছি; তবে তাদের মধ্যে কেউ নিজের ওপর জুলুম করে, কেউ মধ্যপন্থী এবং কেউ আল্লাহর ইচ্ছায় কল্যাণকর কাজে অগ্রগামী। এটাই মহাঅনুগ্রহ।’ (৩৫:৩২)
এ প্রসঙ্গে ‘যে ব্যক্তি ভুল করেছে’ বলতে ‘যে নিষিদ্ধ কাজ এড়িয়ে গেছে’ এবং ‘যার ফরজ কর্তব্য পালন অসম্পূর্ণ’ বোঝানো হয়েছে। ‘যে ব্যক্তি মধ্যম পন্থা অনুসরণ করে’ বলতে ‘যে কেবল অবশ্য পালনীয় কাজ সম্পন্ন করে এবং নিষেধাজ্ঞা পরিহার করে’ এমন ব্যক্তিকে বুঝানো হয়েছে। যে ব্যক্তি সৎকর্মে অত্যন্ত অগ্রণী বলতে ‘যে ব্যক্তি বাধ্যতামূলক ও অনুমোদিত কর্তব্য পালন করে এবং নিষিদ্ধ কাজ’ কেবল পরিহার করে না সব ধরনের বাজে ও নিন্দনীয় কাজ থেকে বিরত থাকে এমন ব্যক্তিকে বোঝানো হয়েছে। উপরি উক্ত ধরনের সব লোকই ইসলামী উম্মাহর অন্তর্ভুক্ত যাদের আল্লাহ্ কিতাব দিয়েছেন। এই দৃষ্টিতে কেউ ভুল করলেই ইসলামের আওতা থেকে বের হয়ে যায় না। সুতরাং কেউ ছোটখাটো ভুল করলেই তাকে ফিসকের অভিযোগে অভিযুক্ত করা ঠিক হবে না অথবা মতভেদ আছে এমন আমল দেখলেই তাকে হারাম ফতোয়া দেয়াও যুক্তিযুক্ত নয়। যেসব তরুণ মুসলমান এরূপ তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে তাদের এ কথা ভুললে চলবে না যে, কুরআন স্পষ্টভাবে ছোট ও বড় গুনাহর পার্থক্য রেখা টেনে দিয়েছে। আল্লাহতায়ালা বলেনঃ
‘আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে তা আল্লাহর। যারা খারাপ কাজ করে তাদের তিনি দেন মন্দ ফল আর যারা ভালো কাজ করে তাদের দেন উত্তম পুরস্কার, তারাই বিরত থাকে গুরুতর পাপ ও অশ্লীল কাজ থেকে ছোটখাটো অপরাধ করলেও। তোমার প্রতিপালকের ক্ষমা অপরিসীম।’ (৫৩:৩১-৩২) ছোটখাটো ত্রুটির প্রতি সহনীয় দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাখ্যা একটি আরবি শব্দ ‘লামাম’-এ (ছোট ত্রুটি) পাওয়া যায়। লামামের দু’টি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা আছে। আল-হাফিজ ইবনে কাছির রঃ সূরা আন-নিসার ২৫৫-২৫৬ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেছেনঃ ‘আলমুহসিমুনুন’ শব্দের ব্যাখ্যা হচ্ছে যারা কবিরা গুনাহ ও লজ্জাকর কাজ পরিহার করে অর্থাৎ বড় বড় নিষিদ্ধ কাজ পরিত্যাগ করে। এরূপ লোক যদি ছোটখাটো ভুল করে বসে, আল্লাহ তাকে মাফ করবেন এবং রক্ষা করবেন; যেমন তিনি আরেকটি আয়াতে ওয়াদা করেছেনঃ
‘ তোমাদের যা নিষেধ করা হয়েছে তার মধ্যে যা গুরুতর তা হতে বিরত থাকলে তোমাদের লঘু পাপগুলো মোচন করব এবং তোমাদের সম্মানজনক স্থানে দাখিল করব।’ (৪:৩১)
তিনি আরো বলেন, ‘...যারা কবিরা গুনাহ ও লজ্জাকর কাজ পরিহার করে, কেবল ছোটখাটো ভুল (করে)’ এখানে ছোটখাটো ত্রুটিকে (লামাম) সম্পূর্ণ বাদ দেয়া হয়েছে, কেননা এগুলো ছগিরা গুনাহ ও লজ্জাকর কাজের উপ-শ্রেণিভুক্ত।
ইবনে কাছির রঃ এরপর বলেছেনঃ ইবনে আব্বাস রাঃ বলেন, আবু হুরায়রাহ রাঃ থেকে নিম্নোক্ত হাদিস শোনার পরই কেবল লামামের (ছোটখাটো ত্রুটি) বিষয়টি আমি উপলব্ধি করেছিঃ ‘আল্লাহ্ পাক আদমের পুত্রের (মানুষ) জন্য ব্যভিচারের অংশ নির্দিষ্ট করে রেখেছেন যা সে অনিবার্যভাবেই করবে। চোখের জিনা হচ্ছে একদৃষ্টে সেই বস্তু দেখা যা নিষিদ্ধ করা হয়েছে; জিহবার জিনা হচ্ছে উচ্চারণ; অন্তরে কামনা-বাসনার উদ্ভব এবং গোপন অঙ্গের মাধ্যমে যার আস্বাদন অথবা প্রত্যাখ্যান।’
তাই আবু মাসউদ রাঃ ও আবু হুরায়রাহ রাঃ বলেন, ‘লামামের অন্তর্ভুক্ত হচ্ছেঃ ‘স্থির দৃষ্টিতে তাকানো, চোখের ইশারা, চুম্বন এবং প্রকৃতপক্ষে ব্যভিচার করা ছাড়াই যৌনসঙ্গমের নিকটবর্তী হওয়া।’
লামামের অন্য ব্যাখ্যাও ইবনে আব্বাস রাঃ দিয়েছেনঃ লজ্জাকর কাজ বটে কিন্তু এর জন্য অনুতপ্ত হয়। তিনি পদ্যাকারে একটি হাদিসের উদ্ধৃতি দেন যার রূপান্তর করলে দাঁড়ায়, ‘হে আল্লাহ, আপনার ক্ষমা সীমাহীন, কেননা আপনার বান্দাদের মধ্যে এমন কেউ নেই যে, ছোটখাটো ভুল করে না।’ (ইবনে কাছির) আবু হুরায়রাহ রাঃ ও আল হাসান রাঃ যুক্তি দেখানঃ গুরুত্বসহকারে বিবেচনা না করেই যে ভুল করা হয় তাই লামাম এবং যা ঘন ঘন করা হয় না। উপরি উক্ত আলোচনার তাৎপর্য দাঁড়ায়ঃ যারা নিয়মিত কবীরা গুনাহ করে না তাদের জন্য ইসলামের অঙ্গন বিস্তৃত; কেননা যারা অনুতপ্ত তাদের জন্য আল্লাহর দয়া প্রশস্ত।
যারা নিয়মিত ফরজ কাজ আদায় করে, তাদের নগণ্য ভুলগুলোকে উপেক্ষা করা যায় কিভাবে, তার একটি শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত উমর ইবনে খাত্তাব রাঃএর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পাওয়া যায়। বর্ণিত হয়েছে, আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাঃ যখন মিসরে ছিলেন তখন তার কাছে কিছু লোক গিয়ে বলল, অনেকেই আল কুরআনের শিক্ষা মেনে চলছে না এবং তারা এ ব্যাপারে খলিফা উমর ইবনে খাত্তাব রাঃ-এর কাছে প্রশ্ন করার ইচ্ছা ব্যক্ত করল। আবদুল্লাহ রাঃ তখন তাদের মদীনায় উমর রাঃ-এর কাছে নিয়ে গেলেন এবং সফরের উদ্দেশ্য ব্যক্ত করলেন। উমর রাঃ তখন ওই লোকদের সাথে একটি বৈঠকের ব্যবস্থা করতে বললেন। বৈঠকে তার নিকটতম লোকটিকে উমর রাঃ বললেন, ‘সত্যি করে বলো, তুমি কি গোটা কুরআন পড়েছ? লোকটি ইতিবাচক জবাব দিলো। তারপর তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি নিজে কি এর শিক্ষা কড়াকড়িভাবে মেনে চলো যেন তোমার হৃদয় ও কাজকর্ম পরিশুদ্ধ হয়?’ লোকটি তখন নেতিবাচক জবাব দিলো। উমর রাঃ তখন বললেন, ‘তুমি কি (নিষিদ্ধ বিষয় ও বস্তুর) দিকে স্থিরদৃষ্টিতে তাকানোর ব্যাপারে, মুখে উচ্চারণ ও বাস্তব জীবনের আচরণে এর শিক্ষাগুলো কড়াকড়িভাবে মেনে চলেছ?’ লোকটি প্রতিটির জবাবে নেতিবাচক জবাব দিলো। উমর রাঃ তখন গ্রুপের প্রত্যেক লোককে এই প্রশ্ন করলে প্রত্যেকে নেতিবাচক জবাব দিল। এরপর উমর রাঃ বললেন, ‘তাহলে তোমরা কী করে খলিফার কাছে দাবি করতে পারো যে, তোমরা যেভাবে আল্লাহর কিতাবকে বুঝেছ তাই মানুষকে মানতে বাধ্য করি যা তোমরা নিজেরাই করতে ব্যর্থ হয়েছ বলে স্বীকার করলে? আমাদের প্রভু জানেন যে, আমরা প্রত্যেকে কিছু না কিছু খারাপ কাজ করে ফেলি।’ অতঃপর তিনি কুরআনের এই আয়াতটি পাঠ করলেন, ‘তোমরা যদি জঘন্যতম কাজগুলো থেকে বিরত থাকো তাহলে আমি তোমাদের সব খারাপ কাজকে বিদূরিত করব এবং মহান মর্যাদার তোরণে তোমাদের প্রবেশ করাবো।’ (৪:৩১)
লোকগুলোর দিকে তাকিয়ে উমর রাঃ বললেন, ‘মদিনার বাসিন্দারা কি জানে তোমরা কী জন্য এখানে এসেছ?’ তারা নেতিবাচক জবাব দিলে তিনি বললেন, ‘তারা যদি জানত তাহলে তোমাদের আমি (শাস্তি দিয়ে) দৃষ্টান্ত বানাতাম।’ (ইবনে কাছীর)
কুরআনুল করীমের গভীর জ্ঞান ও অন্তদৃêষ্টি দিয়ে উমর রাঃ তাৎক্ষণিকভাবে সরেজমিন বিষয়টির নিষ্পত্তি করে দিলেন এবং এভাবে অহঙ্কার ও গোঁড়ামির গোড়া কেটে দিলেন। এ ব্যাপারে তিনি যদি এতটুকু দুর্বলতা দেখাতেন তাহলে সদূরপ্রসারী মারাত্মক ফিতনা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার আশঙ্কা ছিল।
**************************
ড. ইউসুফ আল কারজাভি
অনুবাদঃ মুহাম্মদ সানাউল্লাহ আখুঞ্জি
দৈনিক নয়া দিগন্ত, ২২ আগষ্ট ২০০৮