- Home
- ঈদ উৎসব
- ঈদ-উল-আযহা
- কোরবানি যে শিক্ষা দেয়
কোরবানি যে শিক্ষা দেয়
- By Article Poster
- Published 12/14/2007
- ঈদ-উল-আযহা
- Unrated
ইসলামী জীবনবিধানে মুসলমানদের জন্য স্বীকৃত দুটি ধর্মীয় উৎসব আছে- এক মাস রমজানের সিয়াম পালনের পর শাওয়াল মাসের প্রথম তারিখে আসে ঈদুল ফিতর একটি এবং অপরটি জিলহজ মাসের দশ তারিখে পালিত হয় ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ। প্রতিবছর এই দুটি দিন মুসলমানদের জন্য নির্মল আনন্দের বার্তা বয়ে দিয়ে আসে। এই দুই দিন মুসলমান মাত্রেই আল্লাহর মেহমান এবং সে জন্য এই দুই দিবসে রোজা রাখা হারাম। তবে কোরবানির ঈদে তার সাথে আরো তিন দিন রোজা রাখা হারাম। এ থেকে কোরবানির ঈদের গুরুত্ব অনুমান করা যায়। এই দুই ঈদের দিন হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে গিয়ে পারস্পরিক সৌহার্দø ও প্রীতির বন্ধন সুদৃঢ় করার শিক্ষা দেয় মানুষকে এবং আত্মত্যাগ ও আত্মসুদ্ধির দিকনির্দেশনা দান করে থাকে মুসলমানদের বিশেষভাবে। আরবি ‘উযহিয়া’-এর বাংলা প্রতিশব্দ হলো কোরবানি। এই কোরবানির ঐতিহাসিক পটভুমি আছে এবং আমাদের অনেকের কাছে তা অজানা নয়। তবুও স্মৃতিপটে তা নিয়ে আসার জন্য সংক্ষেপে তুলে ধরছি সেই ঘটনা। মহানবীকে (সা.) উযহিয়া বা কোরবানি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, ‘এটি তোমাদের পিতা নবী ইবরাহিমের সুন্নত বা প্রবর্তিত প্রথা।’ মহান আল্লাহর নির্দেশে হজরত ইবরাহিম (আ.) তার প্রিয় পুত্র হজরত ইসমাইলকে কোরবানি করেছিলেন। এই প্রসঙ্গে আল কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘পিতা-পুত্র আল্লাহর এই নির্দেশ পালনের জন্য যখন পুর্ণ আত্মসমর্পণ করলেন এবং পিতা পুত্রের গলায় ছুরি চালালেন, তখন আল্লাহ আহ্বান করে বললেন, হে ইবরাহিম ‘তুমি তোমার স্বপ্নের কোরবানি সত্যে পরিণত করেছ’ (সুরাহ আসসাফফাতঃ ১০৩-১০৫)। আল্লাহ নবী ইবরাহিমের পুত্র কোরবানি কবুল করে নিয়ে তদস্হলে বেহেশতের এক মোটা-তাজা দুম্বা জবেহ করিয়ে দিলেন। আল্লাহর এই মহাপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে হজরত ইবরাহিম (আ.) ‘খলিলুল্লাহ’ বা আল্লাহর বন্ধুতে পরিণত হলেন। শয়তানের সব রকম কুটকৌশল ব্যর্থ হলো। সত্য উদ্ভাসিত হলো এবং মিথ্যা অপসৃৃয়মান হলো। এই কোরবানি কাল থেকে কালান্তরে চলে এসে মহানবীর (সা.) বাণীতে ঘোষিত হলো ‘যে ব্যক্তি কোরবানি করার আর্থিক সঙ্গতি থাকা সত্ত্বেও কোরবানি করে না, সে যেন আমাদের ঈদগাহে না আসে।’ এ যেন একটি কঠোর হুশিয়ারি। তাহলে কোরবানি নিছক পশু জবেহ করে গোশত খাওয়া ও বিলি-বণ্টন করা নয়। এর অন্তনির্হিত তাৎপর্য ও প্রবহমান শিক্ষা অবশ্যই আছে।
মানুষের মধ্যে পশুত্ব ও বিবেক দুটি প্রধান বৈশিষ্ট্য আছে। পশুর খাদ্য গ্রহণ থেকে হিংস্রতাসহ জৈবিক তাড়না পর্যন্ত সব রকম বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। কিন্তু তার বিবেক নেই, আর এ জন্য তার কোনো জবাবদিহিতাও নেই। মানুষের পশুস্বভাবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিবেক। এই বিবেকের কারণে মানুষ পশুর থেকে পৃথক। মানুষ যখন পশুস্বভাবকে নিয়ন্ত্রণ করে বিবেক পরিচালিত হয়ে জীবনযাপন করে, তখন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জীব হিসেবে বিবেচিত হয় সে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ এই ঘোষণা দিয়েছেন, ‘ওয়া লাকাদ কাররামনা বনি আদম’- আল্লাহ সন্তানকে আল্লাহ সব চেয়ে মর্যাদাবান করেছেন। কিন্তু বিবেক পরিচালিত না হয়ে এবং আল্লাহর নির্দেশ মোতাবেক জীবনকে সাজিয়ে না তুললে সে চতুষ্পদ জন্তুর চেয়ে নিকৃষ্ট কোনো কিছুতে পরিণত হয়। এই বিষয়ে আল কোরআনের ঘোষণা অতি সুস্পষ্ট। আল্লাহ ইরশাদ করেছেন, ‘জিন ও মানুষের অধিকাংশকে আল্লাহ জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছেন। এসব ব্যক্তি তারাই, যারা অন্তর থাকা সত্ত্বেও অন্তর দিয়ে কিছু অনুধাবনের চেষ্টা করে না, চোখ থাকা সত্ত্বেও ভালো-মন্দ দেখে চলে না এবং শ্রবণ ইন্দ্রিয় থাকা সত্ত্বেও ভালো উপদেশ শোনে না। এরাই চতুষ্পদ জীবনের মতো, না না তাও নয়, তার চেয়ে নিকৃষ্ট এবং এরাই গাফলত ও মোহের মধ্যে নিমজ্জিত। (সুরা আল আরাফঃ ১৭৯)। মানুষের পশুত্ব তখনই নিয়ন্ত্রণে আসে, যখন আল্লাহর দেয়া তার মধ্যকার বিবেক এবং নবী-রাসুলের মাধ্যমে প্রদত্ত বিধি-বিধান অনুযায়ী জীবন পরিচালিত করে। এর বাইরে গেলেই সে শয়তান ও তাগুতি শক্তি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়ে পৃথিবীর নিকৃষ্ট জীবে পরিণত হয় এবং পরকালের অনন্ত জীবনে জাহান্নামের কীটরুপে কালপ্রবাহে পড়ে থাকবে।
আল কোরআন ও মহানবীর (সা.) হাদিসের অনুসরণের মধ্যে মানবগোষ্ঠীর ইহলৌকিক কল্যাণ ও পারলৌকিক পরিত্রাণের দিক-নির্দেশনা আছে। আল কোরআন ও আল হাদিসের মর্মবাণী থেকে অনুধাবন করা যায়, ষড়রিপু ও পশুত্ব নিয়ন্ত্রণের মধ্যে মানবজাতির নাজাত নিহিত আছে। হিংস্রতা, হিংসা, বিদ্বেষ, জিঘাংসা, পরশ্রীকাতরতা ও পরচর্চা মানুষের মধ্যে লুকিয়ে থাকা যেমন খারাপ ও নিকৃষ্ট স্বভাব, তেমনি ভালো কাজের মধ্যে রিয়া যা বাহ্যিকভাবে লোক-দেখানোর জন্য হয়ে থাকে তা ভালো কাজের পুণ্যপ্রাপ্তি বরবাদ করে দেয়। আমাদের প্রতিটি কাজের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে আত্মসমর্পণ করে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন করা। হজরত ইবরাহিম (আ.) প্রবর্তিত এবং মহানবীর (সা.) কঠোরভাবে নির্দেশিত ও পালিত পশু কোরবানি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের এক নিষ্কলুস মাধ্যম এবং নিয়ামক। এই পশু কোরবানির সঙ্গে সঙ্গে একজন প্রকৃত মুসলমানের সব রকম হিংস্রতা ও পশুস্বভাব জবেহ হয়ে যায় এবং মানবজাতির কল্যাণকামী হয়ে সে আল্লাহর নৈকট্য লাভের পথপ্রাপ্ত হয়। কোরবানির পশু হতে হবে সুস্হ ও সবল। কানা, খোঁড়া ও স্পষ্ট দোষযুক্ত কোনো পশু কোরবানির জন্য উপযুক্ত নয়। এরুপ নির্দেশের কারণ অন্তর থেকে উৎসারিত আল্লাহর প্রেম যেন একজন কোরবানিদাতার মুখ্য উদ্দেশ্য হয়। দায়সারা কিছু করে কোরবানি না করার সমালোচনা থেকে মুক্ত হওয়া কারো যেন উদ্দেশ্য না হয়। আবার কোরবানি করে ফ্রিজে জমা রেখে গোশত খাওয়া যেন আমাদের মনকে পেয়ে না বসে। কোরবানির সঙ্গে সঙ্গে আমাদের ষড়রিপু যেন কোরবানি হয় এই কামনা আমাদের প্রত্যেকের হওয়া উচিত। আমাদের দেশে অনেকে ভাগে কোরবানি দেন। এই ভাগের মধ্যে যদি কোনো অংশীদারের গোশত খাওয়া মুখ্য উদ্দেশ্য হয়, তাহলে সবার কোরবানি বরবাদ হয়ে যাবে। কোরবানির মহান শিক্ষা হচ্ছে তাকওয়া অর্জন করা ও অন্তরের পবিত্রতা লাভ এবং সঙ্গে সঙ্গে সব ধরনের হিংসা, দ্বেষ ও মালিন্য থেকে মুক্ত থাকা। আল্লাহ স্পষ্ট ভাষায় আল কোরআনে বলেছেন, ‘আল্লাহর নিকট কোরবানির পশুর রক্ত ও মাংস পৌঁছে না; বরং তোমাদের তাকওয়া তাঁর নিকট পৌঁছে’ (সুরা আল হাজঃ ৩৭)।
কোরবানির মুল শিক্ষা তাকওয়া অর্জন ও তাযকিয়ায়ে নফস বা আত্মার পরিশুদ্ধি। বাইরে থেকে কোরবানিদাতার এই উদ্দেশ্য পরখ করা যায় না। এটি প্রত্যেকের নিজস্ব অন্তরের ব্যাপার। তবে আমাদের দেশে দু’শ্রেণীর কোরবানিদাতা লক্ষ্য করা যায়। এক শ্রেণীর লোক প্রচুর বিত্তের মালিক হওয়া সত্ত্বেও মনের তাগিদে নয়; বরং লোকলজ্জার কারণে দুর্বল ও ত্রুটিপুর্ণ পশু কোরবানি দিয়ে দায়মুক্ত হতে চায় এবং এদের সঙ্গে যুক্ত হয় গোশত খাওয়া পার্টি। আর এক শ্রেণীর লোক আছে, যারা বিত্তবৈভের প্রতিযোগিতার নামে এবং কত বেশি দাম দিয়ে কোরবানির পশু কেনা যায় তার মহড়া দিয়ে নাম জাহির করার প্রচেষ্টা চালায়। এই দুই শ্রেণীর কোরবানিদাতা কোরবানির প্রকৃত শিক্ষার আস্বাদন পায় না। লাখ লাখ টাকা দিয়ে পশু কেনার প্রতিযোগিতা চললে সাধারণ আয়ের লোক বঞ্চিত হয় সামর্থ্যের মধ্যে থাকা অর্থ একটি পছন্দসই কোরবানির পশু ক্রয় থেকে। এতে করে কোরবানির মুল লক্ষ্য তাকওয়া অর্জন তো হয় না; বরং রিয়া ও লোক-দেখানো আমলের আওতায় পড়ে পুণ্য নষ্ট করে ফেলার পথ হয় প্রশস্ত। এটি আমাদের সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হতে চলেছে। এতে করে কোরবানির মুল শিক্ষা সমাজের অভাবগ্রস্তদের সাহায্য-সহায়তাদান এবং সহমর্মিতার প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে পারস্পরিক সৌহার্দø প্রতিষ্ঠা করে সমাজ জীবনকে শান্তিময় করে তোলা বাধাগ্রস্ত হয় এবং আত্মত্যাগের মনোভাব দানা বেঁধে ওঠে না। তাই বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে মানবতার বৈরী প্রভাবকে অবদমিত করতে প্রয়োজন পড়েছে নবী ইবরাহিমি সুন্নতকে উজ্জীবিত করে মহানবীর (সা.) প্রদর্শিত ও বাস্তবায়িত কোরবানির আদর্শ ও শিক্ষাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করা। এরই মধ্যে মুসলিম জাতির কল্যাণ নিহিত হচ্ছে।
***************************
লেখকঃ ড. একেএম ইয়াকুব আলী
প্রফেসর ইমেরিটাস
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
দৈনিক আমারদেশ, ১৪ ডিসেম্বর ২০০৭