দাওয়াহ ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায় মুসলমানদের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি কর্তব্য। এটি আরবি শব্দ ‘দাআ’ থেকে এসেছে। এর আভিধানিক অর্থ হলো আহ্বান করা, ডাকা বা সাহায্য কামনা করা। আর পারিভাষিক অর্থে, সৃষ্টিকর্তা কর্তৃক মনোনীত পরিপূর্ণ জীবনবিধান ইসলামের দিকে মানুষকে আহ্বান করাই হলো দাওয়াহ। পবিত্র আল কুরআন মুসলমানদের সংবিধান আর রাসূল সাঃ হলেন পথপ্রদর্শক। কুরআন-হাদিসের বাইরে আর কোথাও মানুষের প্রকৃত সুখের সন্ধান পাওয়া সম্ভব নয়। মুক্তির একমাত্র পথ ইসলাম। আল্লাহ ছাড়া সমগ্র সৃষ্টি নিরুপায়। তিনি এক ও অদ্বিতীয় প্রতিপালক। তিনি সর্ব শক্তিমান। তিনি জীবন ও মৃত্যুর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণকারী। আমাদের সবাইকে অনিবার্যভাবে সৃষ্টিকর্তার কাছে ফিরে যেতে হবে। এ শাশ্বত জীবনবিধানের মধ্যেই ইহকালীন শান্তি ও পরকালের মুক্তি নিহিত। এ মহাসত্যের দিকে মানুষকে ডাকার নামই হলো দাওয়াহ। আরেকটু ব্যাপকভাবে বলতে গেলে, ‘যে আহ্বানে ব্যক্তি বা ব্যক্তিসমষ্টি কতৃêক গৃহীত বিজ্ঞান ও শিল্পসম্মত উপায়ে নির্দিষ্ট বিষয়ে মানবগোষ্ঠীকে আকৃষ্ট করা, মেনে নেয়া ও তাদের বাস্তব জীবনে চর্চার ব্যবস্থা করে দেয়ার পদ্ধতিগত সব প্রচেষ্টা ও কার্যাদি অন্তর্ভুক্ত থাকে, তা-ই দাওয়াহ’। দাওয়াহ মুমিনের জন্য প্রথম ও প্রধান করণীয় একটি কাজ। ইসলামের সার্বজনীন কল্যাণের বার্তা সম্প্রসারণের জন্য দাওয়াহ অবিকল্প পথ। ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ, আধুনিক ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবনবিধান। একমাত্র এ বিধানই মানব গোষ্ঠীকে শান্তির পথ দেখাতে সক্ষম। মানুষের তৈরি অন্যান্য বিধান মানুষকে মরীচিকার মতো শুধু বিভ্রান্তই করে। প্রকৃত সুখের সন্ধান পেতে ভুল পথে মানুষ অগ্রসর হয়ে নিঃশেষ হয় এবং প্রান্তিকে পৌঁছে উপলব্ধি করে যে, সে মারাত্মক ভুল করে বসেছে। তখন আর ফিরে আসার উপায় থাকে না। এসব বিভ্রান্ত জনগোষ্ঠীকে বিশুদ্ধ শান্তির সন্ধান দেয়ার জন্যই রাসূল সাঃ-এর সর্বপ্রথম মিশন ছিল দাওয়াতি কার্যক্রম। এরই ধারাবাহিকতায় যুগে যুগে অসংখ্য নবী-রাসূল পাঠিয়ে আল্লাহতায়ালা মানব জাতিকে হেদায়েতের ব্যবস্থা করেছেন। তারা সবাই আল্লাহর পক্ষ থেকে আদিষ্ট হয়ে আল্লাহর দিকেই মানব সমাজকে আহ্বান করেছেন। পবিত্র কুরআনের সূরা আলে ইমরানের ১০৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহতালা বলেন­ ‘আর তোমাদের মধ্যে এমন একটা দল থাকা উচিত, যারা (মানুষকে) আহ্বান করবে সৎ কাজের প্রতি। নির্দেশ দিবে ভালো কাজের এবং নিষেধ করবে অন্যায় কাজ থেকে। আর তারাই মূলত সফলকাম।’
এ আয়াতের আলোকে আমরা অবহিত হতে পারি যে, ইসলামের যেকোনো বার্তা তা যতই সামান্য হোক না কেন, অন্যের কাছে পৌঁছে দেয়া সবার ওপর ফরজ। এতে আরব-অনারব, প্রাচ্য-পাশ্চাত্য কোনো ব্যবধান নেই। কেয়ামত পর্যন্ত সব মানব গোষ্ঠীর জন্য এ দাওয়াত প্রযোজ্য। দিক ভুলে বিশ্ব মানবগোষ্ঠী যখন ইসলাম সম্পর্কে ভুল বুঝাবুঝি নিয়েই নিজেদের মধ্যে সঙ্ঘাত ও দূরত্ব তৈরি করছে, তখন দাওয়াতি কার্যক্রমের প্রয়োজনীয়তা আরো অধিক উপলব্ধি করা যায়। দাওয়াতি দায়িত্ব পরিপালনে ব্যর্থ হলে মুসলমানদের জন্য কঠিন দুঃসময় উপস্থিত হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

ইসলামি দাওয়াহ বলতে কেউ কেউ শুধু ওয়াজ নসিহত কিংবা মসজিদ মহল্লায় গিয়ে নামাজ-রোজার কথা বলা অথবা শুধু অমুসলিমদের ইসলাম কবুল করার আহ্বান জানানোকে বুঝেন। যদিও এসব কাজ ইসলামি দাওয়াহরই অংশবিশেষ, কিন্তু শুধু এগুলোই দাওয়াতের পূর্ণাঙ্গ স্বরূপ বহন করে না। দাওয়াহ বলতে বুঝায় ব্যাপক কর্মসূচি ও কর্মপ্রচেষ্টার সমষ্টি, যা মানুষকে আল্লাহর দীন মেনে নিতে অনুপ্রাণিত করে, ব্যক্তি ও সমাজজীবনের সর্বস্তরে আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হয়। ইসলামি দাওয়াহ ওয়াজ-নসিহত, শিক্ষা-প্রশিক্ষণ, সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা, লেখালেখি, সমাজ কর্মসহ সব বৈজ্ঞানিক প্রচারমাধ্যম, পদ্ধতি ও প্রক্রিয়াকে অন্তর্ভুক্ত করে। ইসলামি শরিয়াহর প্রথম কৌশলগত কর্মসূচিই হলো মানুষের কাছে আল্লাহর দীনের দাওয়াত পৌঁছে দেয়া। চোখের সামনে কোনো অন্যায় হতে দেখলে কিংবা কাউকে বিভ্রান্তির মধ্যে ডুবে থাকতে দেখলে মুসলমানের চুপ থাকার সুযোগ নেই। সাধ্যমতো অন্যায় প্রতিরোধ করা এবং বিপথগামীকে আল কুরআনের সঠিক পথ দেখানো কর্তব্য। অন্যায়-অপরাধ থেকে নিজে বাঁচার পাশাপাশি অন্যদেরও বাঁচানোর প্রচেষ্টা দাওয়াহ কার্যক্রমের অংশ। একজন মুমিনের অন্তরে সার্বক্ষণিকভাবে দাঈ মানসিকতা সক্রিয় থাকে। বিশেষ গৃহীত কর্মসূচি ছাড়াও সুযোগ পেলেই তিনি আল্লাহর দীনের ব্যাপারে মানুষকে অবহিত করে। একজন মুমিন এ ভয়ও অন্তরে পোষণ করে যে, দীনের এমন কোনো বিষয় যদি কারো কাছে পৌঁছে দেয়া না হয়, অথচ তিনি সেটা জানতেন তাহলে কিয়ামতের দিন আল্লাহর দরবারে এ বিষয়ে জবাবদিহি করতে হবে এবং কঠিন আজাব ভোগ করা থেকে কোনো রকমেই রেহাই পাওয়া যাবে না। দাওয়াহ কাজে যারা পরিব্যাপ্ত সেসব দাঈ বিষয়ে পবিত্র আল কুরআনে প্রশংসামূলক বর্ণনা এসেছে এভাবে­ সূরা হা-মীম সিজদা’র ৩৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে­ ‘তার চেয়ে আর কার কথা অধিক উত্তম হতে পারে, যে (মানুষকে) আল্লাহর দিকে আহ্বান করে, সৎ কর্ম করে এবং ঘোষণা দেয় যে, নিশ্চয়ই আমি মুসলমানদের অন্তর্ভুক্ত।’ মানুষকে কথা বলার শক্তি-সামর্থø আল্লাহতায়ালাই দিয়েছেন। আমরা প্রতিনিয়ত সামাজিক আচার-আচরণে অনেক কথাই বলে থাকি, নানান ভাষায়, নানান শৈলীতে, নানান ভঙ্গিমায়। আবার এসব কথার বিষয়বস্তুতেও রয়েছে চমৎকার বৈচিত্র্য। কথামালাকে সাহিত্য মানে বিচার করে একে শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি দিই, পুরস্কৃতও করি। জীবনমুখী গল্প-উপন্যাস লেখার জন্য মানসম্পন্ন পদকে ভূষিত করে বা হয়ে আমরা তৃপ্তি পাই। তবে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের স্বীকৃতির চেয়ে বড় কিছু হতে পারে না। তিনি নিজেই ঘোষণা দিচ্ছেন, যে ব্যক্তি বিভ্রান্ত মানব জাতিকে তাঁরই দিকে আহ্বান করে, তার কথাই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কথা। মুসলমানদের জন্য এটি একটি বড় সনদপত্র। আপন প্রভুর সন্তুষ্টিমূলক স্বীকৃতি পেলে মুমিনের হৃদয়-মন জুড়িয়ে যায়। এর চেয়ে আত্মতুষ্টির আর কী হতে পারে?

মুমিনের জন্য অহঙ্কার পরিহার করা খুবই জরুরি। কেননা, সেটি সব বিচারে একটি গর্হিত কাজ। বলা হয়ে থাকে অহঙ্কার পতনের মূল। দাওয়াতি মিশনের দায়িত্ব কাঁধে নিলে এটি দূর করা সহজ হয়। অহঙ্কার বিষয়ে আল্লাহ বলছেন­ ‘অহঙ্কারবশত তুমি মানুষকে অবজ্ঞা করো না এবং জমিনে গর্বসহকারে পদচারণা করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো দাম্ভিক অহঙ্কারীকে পছন্দ করেন না। চালচলনে মধ্যবর্তিতা অবলম্বন করো এবং কণ্ঠস্বর নিচু করো। নিঃসন্দেহে গাধার আওয়াজই সর্বাপেক্ষা অপ্রীতিকর।’­সূরা লোকমান, আয়াতঃ ১৮-১৯। একজন দাঈর দাওয়াতি চিন্তার সাথে গর্ব অহঙ্কার মিশে থাকতে পারে না। সুতরাং নিঃসন্দেহে বলা যায়, আল্লাহর পথে মানুষকে ডাকা মুসলমানের জন্য নিরহঙ্কারী পুণ্যময় জীবনযাপনের একটি উল্লেখযোগ্য কর্মকৌশল। এ মিশনের দায়িত্বভার বহন করা সব মুসলমানের ঈমানি দায়িত্ব। দাওয়াতি কাজের পরিধি সম্প্রসারিত করতে না পারলে বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের পরিণতি আরো দুঃখজনক পর্যায়ে পৌঁছতে বাধ্য। ইসলাম সম্পর্কে ভুল বুঝাবুঝি এবং পরিকল্পিতভাবে একে সন্ত্রাসী চিহ্নিত করার যে অপপ্রয়াস দুনিয়াজুড়ে অব্যাহত রয়েছে তা প্রতিরোধে এক্ষুণি আমাদের দাওয়াতি কাজের বিশেষ মিশন নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া উচিত।
 
**************************
সালেহ মতীন
দৈনিক নয়া দিগন্ত, ২২ আগষ্ট ২০০৮