সর্বোত্তম ইবাদত হলো নামাজ। নামাজের পরেই শ্রেষ্ঠ ইবাদত হলো ‘খিদমতে খালক’ বা ‘সৃষ্টির সেবা।’ আল্লাহকে ইলাহ ও রব হিসেবে মেনে নেয়ার সর্বোৎকৃষ্ট অনুশীলন হলো নামাজ। যে নামাজ আদায় করে না সে মুখে যতই নিজেকে ঈমানদার বলে দাবি করুক না কেন তার ওই দাবি সারশূন্য। নামাজহীন ব্যক্তিরা বলে থাকে আমি নামাজ না পড়লেও আমার ঈমান ঠিক আছে, আমি অনেক নামাজির চেয়ে ভালো। কথাটি আদৌ ঠিক নয়। কারণ পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা নামাজ কায়েম করো, নামাজ তোমাদের যাবতীয় অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখবে (তোমরা উত্তম চরিত্রের অধিকারী হতে পারবে)।’ রাসূল সাঃ বলেন, নামাজই মুমিন আর কাফিরের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করে।’ আল্লাহ ও রাসূল সাঃ-এর তরফ থেকে ঈমানদার ও ভালো হওয়ার জন্য যে প্রেসক্রিপশন দেয়া হয়েছে তা অনুসরণ না করে মানুষ ভালো হবে কী করে? আপাতদৃষ্টিতে কাউকে ভালো মনে হলেও তার পেছনে অনুসন্ধান চালালে বহু ক্ষেত্রে তার মারাত্মক খারাপ দিকগুলো ধরা পড়ে যাবে। যে নামাজ পড়ে তার মধ্যে ত্রুটি থাকলেও একদিন নামাজ তাকে ত্রুটিমুক্ত করে ছাড়বে। আর যে নামাজ পড়ে না, তার ত্রুটি বৃদ্ধি হওয়া ছাড়া ত্রুটিমুক্ত হওয়া একটা অসম্ভব ব্যাপার। আল্লাহপাক নামাজকে তার সর্বোত্তম জিকির হিসেবে অবহিত করেছেন। বান্দার নামাজের সাথে তার অন্যান্য ভালো কাজ সংযুক্ত হবে। নামাজহীন ব্যক্তির কোনো ভালো কাজ খোদার দরবারে গৃহীত হয় না। (আল হাদিস)। হাদিসে আরো এসেছে, কাল কিয়ামতে যে ব্যক্তি নামাজের হিসেবে দিতে গিয়ে ঠেকবে না জান্নাতে যাওয়ার জন্য তার আর কোনো বাধা থাকবে না।’

নামাজের গুরুত্ব সর্বাধিক হওয়া সত্ত্বেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে খিদমতে খালক নামাজের থেকেও অধিক গুরুত্ব লাভ করে। যেমন নামাজরত ব্যক্তি জানতে পারল যে কাছেই একজন মানুষ বা একটি প্রাণী বিপদে পড়েছে, দেরি হলে তার অনেক ক্ষতি হয়ে যাবে। তাহলে নামাজ ছেড়ে দিয়ে ওই ব্যক্তি বা প্রাণীটিকে বিপদমুক্ত বা ক্ষতি থেকে বাঁচাবার চেষ্টা করতে হবে। পরে ফিরে এসে নামাজ শেষ করতে হবে। নইলে নামাজ গ্রহণযোগ্যতা হারিয়ে ফেলবে।

মহানবী সাঃ শত্রুমিত্র ভেদাভেদ ভুলে অসহায় মানুষের প্রতি তো দয়া প্রদর্শন করেছেনই, কীটপতঙ্গ, পশুপাখি, জীবজন্তু এমনকি বৃক্ষের প্রতিও দয়া প্রদর্শনের বহু দৃষ্টান্ত তাঁর রয়েছে। নিম্নে দু-একটি ঘটনা উদাহরণস্বরূপ পেশ করা হলো।
(১) মহানবী সাঃ একদিন বিকেলবেলা এক বনের ধার দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি দেখলেন বনের ধারে একটি তাঁবু। তাঁবুর সামনে গাছের সাথে একটি হরিণী বাঁধা। তিনি লক্ষ করলেন হরিণীটির চোখ দুটো ছলছল। দুধের ভারে বাঁট দু’টি ফাট ফাট করছে। তিনি বুঝতে পারলেন নিশ্চয়ই হরিণীটির দুগ্ধপোষ্য বাচ্চা রয়েছে। হরিণীটি হয়তো সকালে ধরা পড়েছে। বাচ্চাকে দুধ খাওয়াতে পারেনি বিধায় বান দু’টি ফাট ফাট করছে। বাচ্চার মায়ায় হরিণীর চোখ পানিতে ছলছল করছে। তিনি শিকারিদের ডেকে বললেন, ‘এই একটির কারণে আরো কয়েকটি কচি বাচ্চা দুধবিহনে প্রাণ হারাবে। তোমরা হরিণীটিকে ছেড়ে দাও। সে গিয়ে তার ক্ষুধার্ত বাচ্চাদের দুধ পান করাক। শিকারিরা ছিল ইহুদি। বনের পশুদের প্রতি রসূল সাঃ এত দরদ, জানতে পেরে তারা হরিণীটিকে ছেড়ে দিল এবং রসূল সাঃ-এর হাতে কালেমা পড়ে মুসলমান হয়ে গেল।

(২) একদিন এক বালক পাখির বাসা থেকে দু’টি ছানা নিয়ে যাচ্ছিল। মা পাখিটা ছানার শোকে পাগলপ্রায় হয়ে ওই বালকটির মাথার উপর উড়াউড়ি করতে লাগল। এই দৃশ্য দেখে রাসূল সাঃ বালকটিকে বললেন, ‘ছানা দু’টি বাসায় রেখে এসো। দেখছ না মা পাখিটি কেমন পাগল হয়ে তোমার মাথার ওপর ওড়াউড়ি করছে, নিজের জীবনের মায়া পর্যন্ত নেই। রাসূল সাঃ-এর কথায় বালকটি ছানা দু’টিকে বাসায় রেখে এলো। ছানা দু’টিকে পেয়ে মা পাখিটি কি আদর সোহাগ করতে লাগল তা দেখে রাসূল সাঃ-এর আনন্দের আর সীমা রইল না।

(৩) একটি বালক লাঠি দিয়ে বাড়িয়ে বাড়িয়ে রাস্তার পাশের একটি চারাগাছের পাতা ছিঁড়ছিল। রাসূল সাঃ সেই পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি বালকটিকে জিজ্ঞেস করলেন, পাতাগুলো কি তোমার খুব প্রয়োজন? বালকটি বলল না। রাসূল সাঃ বললেন, ‘অকারণে গাছের পাতা ছিঁড়া ঠিক নয়। তোমাকে আঘাত দিলে তুমি যেমন ব্যথা পাও, গাছেরাও আঘাত লাগলে ব্যথা পায়। তোমার কেটে গেলে যেমন রক্ত বের হয় তেমনি দেখ গাছের ছিঁড়া পাতার বোঁটা থেকেও কষ ঝরছে। ছেলেটি পাতা ছিঁড়া বন্ধ করে দিলো।

জীবের প্রতি দয়া সম্পর্কে উপদেশ দিয়ে তিনি সাহাবিদের রাঃ আগের যুগের একটি ঘটনা শুনান। এক মহিলা খুবই নামাজ রোজা করত। তার পরহেজগারির সুনাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। একদিন এক বিড়াল তার রান্না ঘরে হাঁড়ি থেকে গোশত খেয়ে ফেলে। মহিলাটি সেই অপরাধে বিড়ালটিকে কয়েক দিন ধরে একটি খুঁটির সাথে বেঁধে রাখে এবং কিছুই খেতে দেয় না। ফলে বিড়ালটি মারা যায়। সে কারণে ওই মহিলার নামাজ-রোজা ও পরহেজগারি কোনো কাজে লাগেনি। সে জাহান্নামি হয়ে যায়। পক্ষান্তরে একজন মহাপাপী মেয়ে লোক একটি পিপাসার্ত কুকুরকে পানি পান করানোর ফলে আল্লাহ তার প্রতি খুশি হন, তার গুনাহখাতা মাফ করেন এবং তাকে হিদায়াত দিয়ে দেন। ওই মহিলা জান্নাতি হয়ে যায়। আল হাদিস।

রাসূল সাঃ বলেন, ‘তোমরা গৃহপালিত পশুর প্রতি খুব যত্নশীল হবে। তাদের ঠিকমতো খেতে দেবে। তারা যাতে কষ্ট না পায় এমন থাকার ব্যবস্থা করবে। তারা যা বহন করতে পারে তার অতিরিক্ত কিছু তাদের ওপর চাপিয়ে দিয়ো না। (আল হাদিস)।

রাসূল সাঃ বলেন, প্রয়োজনের অতিরিক্ত প্রাণী জবেহ করো না। আর ধারাল অস্ত্র দিয়ে এমনভাবে জবেহ করবে যে সহজে তাদের প্রাণবায়ু বের হয়ে যায়। তাদের কষ্ট কম হয়।

রাসূল সাঃ বলেন, তোমরা গর্তের মধ্যে পেশাব করো না। কারণ গর্তে পিঁপড়া ও অন্যান্য কীটপতঙ্গ থাকে। তারা মারা যেতে পারে (কষ্ট পেতে পারে)।

প্রত্যেক ধর্মেই জীবের প্রতি দয়া প্রদর্শনের নির্দেশ আছে। বৌদ্ধ ধর্মে তো, জীবহত্যা মহাপাপ। সর্বজীবে দয়া প্রদর্শনই ধর্মের মূলমন্ত্র হিসেবে ঘোষণা করেছে। এটা অবশ্য স্বাভাবিক নয়। কারণ একজীব আরেক জীবকে খেয়েই জীবন ধারণ করে।

হাদিসে বলা হয়েছে দুনিয়ার বুকে যদি কোনো পশু অন্য পশুকে আঘাত করে আর আঘাতপ্রাপ্ত পশুটি প্রতিশোধ গ্রহণের সুযোগ না পায় তাহলে দুটো পশুকেই হাশরের ময়দানে উপস্থিত করানো হবে এবং মজলুম পশুটিকে প্রতিশোধ নেয়ার সুযোগ করে দেয়া হবে। পশুদের মতো নির্দয় মানুষগুলোকেও ময়দানে দাঁড় করিয়ে দিয়ে যখন পশুদের ছেড়ে দেয়া হবে প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য তখন কী ভয়াবহ অবস্থা সৃষ্টি হবে তা সহজেই অনুমেয়।

হাদিসে কুদসিতে বলা হয়েছে, আল্লাহ বলেন, ‘তুমি যদি কারো ওপর দয়া করো তোমার ওপরও দয়া করা হবে।’

অসুস্থ পশুপাখির সেবা করা, অভুক্ত পশু-পাখিকে খাওয়ানো অধিক পুণ্যের কাজ। তাই বলে বাড়ির পাশের অসুস্থ প্রতিবেশীকে সেবা না করে, অভুক্ত প্রতিবেশীর ক্ষুধা দূর না করে বাড়ির পোষা কুকুরটিকে সপ্তাহে দুই তিনবার ডাক্তার দেখানো, প্রতিদিন তিনি কেজি করে গোশত খাওয়ানো মোটেই পুণ্যের কাজ নয়।

**************************
মীর্যা সিকান্দার
দৈনিক নয়া দিগন্ত, ২২ আগষ্ট ২০০৮