দয়া, ক্ষমা ও মুক্তির পরশ নিয়ে আবারও আসছে রমজান। সবার প্রতীক্ষিত ইবাদতের উৎকৃষ্ট মৌসুম। মাত্র দু’দিন পরের এই বরকতময় দিনগুলোর জন্য চারদিকে সাজ সাজ শুরু হয়ে গেছে। অনেক আগেই পুণ্যময় এ প্র‘তির ছোঁয়া যেমন লেগেছে সাধারণ জনগণের ভেতর, তেমনি লেগেছে আমাদের আলেম সমাজের অঙ্গে। বিশেষ করে হাফেজদের এখন ব্যস্তমুহূর্ত। পুরো রমজানে খতমে তারাবিতে সবাইকে কোরআন শুনিয়ে মুগ্ধ করে দেয়া, এক আল্লাহর জন্য প্রেমময় করে তোলার দায়িত্ব তাদেরই কাঁধে। তাই মসজিদে মসজিদে এখন হাফেজরা অপেক্ষমাণ সেই তারাবির জন্য, অপেক্ষায় আছেন কোরআন পাগল মুসল্লিরাও। কোরআনপ্রেমিক সেই মুসল্লিদের তৃষ্ণা মেটানোর জন্য এ সময়ের হাফেজদের প্র‘তি কী? রমজান নিয়ে তাদের ভাবনা ও টুকিটাকি নানা বিষয় নিয়ে যুগান্তরের পক্ষ থেকে চারজন সেরা হাফেজের মুখোমুখি হয়েছি-
হাফেজ মোস্তফা কামাল, বয়স-২৯, হেফজ সমাপ্তি ১৯৯৫, তাজবিদুল কোরআন হাফিজিয়া মাদ্রাসা, শিক্ষক-হাফেজ শামসুল ইসলাম, বর্তমান পেশা-শিক্ষকতা, এবার তারাবিহ পড়াবেন গ্রিন রোড স্টাফ কোয়ার্টার জামে মসজিদ, ধানমণ্ডি, ঢাকায়।
যুগান্তরঃ শিক্ষকতা ও তারাবিহ দুটো এক সঙ্গে কিভাবে সামাল দিবেন, চাপ অনুভব করবেন না?
হাফেজ মোস্তফা কামালঃ আমি হেফজখানার শিক্ষক। সারাদিন কোরআন শুনি, এটা তারাবির জন্য কিছুটা সহায়ক। এছাড়াও রমজানে ছাত্রদের সবক বন্ধ থাকে। কেবল আমুখতা শুনি। তারাবির প্র‘তির জন্য সুযোগ পাওয়া যায়।
যুগান্তরঃ গুণীজনের অভিযোগ, হাফেজের সংখ্যা বেড়েছে। তবে ভালো হাফেজের সংখ্যা কমে গেছে। ভালো হাফেজ কিভাবে হওয়া যায়?
হাফেজ মোস্তফা কামালঃ আমিও তাদের সঙ্গে একমত। ভালো হাফেজ হওয়ার জন্য শুরু থেকেই প্র‘তি নিতে হবে।
যুগান্তরঃ দ্রুত ও ক্ষিপ্রগতিতে কোরআন পড়া এখন তারাবির প্রধান বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে উচ্চারণ শৈলী ও মাধুর্যতা নষ্ট হচ্ছে কি?
হাফেজ মোস্তফা কামালঃ দুটি কারণে এরকম হয়ে থাকে। এক· মুসল্লিদের চাপ, দুই· নিজ থেকেই দ্রুত পড়ার প্রবণতা জন্ম নেয়া। কারণ দুটি দূর করতে পারলে কোরআনের স্বকীয়তা, গুণাগুণ পূর্ণ অবয়বে ফুটে ওঠবে। সবার সহায়তা জরুরি।
হাফেজ সাব্বির আহমাদ জুবাইরঃ বয়স-১৭, হেফজ সমাপ্তি-২০০১, দারুল উলুম মেরাজনগর মাদ্রাসা, শিক্ষক-হাফেজ আবদুর রউফ। বর্তমান অবস্থান-ছাত্র, নবম শ্রেণী, বর্ণমালা উচ্চ বিদ্যালয়, দনিয়া, যাত্রাবাড়ী, এবার তারাবিহ পড়াবেন মেরাজনগর মাদ্রাসা মসজিদ শ্যামপুর, ঢাকা।
যুগান্তরঃ তারাবির প্র‘তি কিভাবে নিচ্ছেন?
হাফেজ সাব্বিরঃ রমজানে নিজেকে শুদ্ধ আর পবিত্র পবিত্র মনে হয়। গুনার দিকে মন ঝুঁকে না, পড়াশোনা আর কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে দিনগুলো কিভাবে কেটে যায় বুঝতেই পারি না।
যুগান্তরঃ আপনার কাছে কি আছে যে এক দেড় ঘণ্টা শত শত মুসল্লি আপনার পেছনে হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন?
হাফেজ সাব্বিরঃ না, সব আকর্ষণ কোরআনের। মানুষ কোরআন ভালোবাসে। এই কোরআন শুনতে আমার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকেন।
যুগান্তরঃ কখনও লুকমা খেলে কেমন লাগে এবং এর ক্ষত থেকে কিভাবে সেরে ওঠেন?
হাফেজ সাব্বিরঃ লুকমা খেলে ভীষণ অস্বস্তি লাগে। কেন জানি আর এক মনে পড়তে পারি না। একবার লুকমা খেলে এর ক্ষত, যন্ত্রণা কাটিয়ে ওঠা যায় না কখনও।
হাফেজ মোহাম্মদ সোহেল ওসমান, বয়স-২৪, হেফজ সমাপ্তি-১৯৯৮, দারুল উলুম মাদানিনগর, শিক্ষক-হাফেজ এনায়েতুল্লাহ বর্তমান অবস্থান-ছাত্র, মাদানিনগর মাদ্রাসা, এবার তারাবিহ পড়াবেন দনিয়া মসজিদে।
যুগান্তরঃ রমজানের শুরু এবং শেষ দিকে মসজিদে প্রচুর মুসল্লি আসেন। মাঝখানে কমে যায়। এর কারণ কি মনে হয়?
হাফেজ সোহেলঃ সাধারণ মানুষের দীন সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং গুরুত্বহীনতাই এর প্রধান কারণ বলে মনে হয়। আলেমরা যদি আরও বেশি সমাজমুখী হন, তারাবির গুরুত্ব ও উপকারিতা সুন্দরভাবে তুলে ধরতে পারেন- তাহলে মনে হয় কেবল রমজানই নয় পুরো বছরই মুসল্লিতে মসজিদ গমগম করবে।
যুগান্তরঃ যে হাফেজরা তারাবিহ পাচ্ছেন না তাদের জন্য আপনার পরামর্শ কি?
হাফেজ সোহেলঃ প্রতিবছরই হাফেজ বাড়ছে বাড়ছে না মসজিদ। এ নিয়ে সরকারকে ভাবতে হবে।
হাফেজ মোহাম্মদ দাউদ আলী, বয়স-২৩, হেফজ সমাপ্তি-২০০০, জামিয়া রহমানিয়া আবারিয়া, শিক্ষক-হাফেজ আবদুল হাই, বর্তমান অবস্থান-ছাত্র, আরজাবাদ, এবার তারাবিহ পড়াবেন পান্থপথ জামে মসজিদে।
যুগান্তরঃ রমজানের কিছুদিন যেতেই হাফেজরা জ্বর, ঠাণ্ডায় ভুগতে থাকেন, অনেকে তারাবি পড়াতে পারেন না। আপনার প্র‘তি কি?
হাফেজ দাউদঃ নিজেকে কিছুটা নিয়ন্ত্রিত রাখতে পারলে এসব বিপদ থেকে অনেকটাই বাঁচা যায়। এখন কিছু মানসিক প্র‘তি রয়েছে। রমজানে সতর্ক থাকব ঠাণ্ডা জাতীয় রোগ থেকে।
**************************
হাফেজ তাজল ফাত্তাহ
যুগান্তর, ২৯ আগষ্ট ২০০৮