বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখেছেন, খাদ্য বেশি খেলে জীবনের দৈর্ঘ্য হ্রাস পায়। শুধু খাওয়ার মধ্যে থাকলে দেহযন্ত্রটি বিশ্রাম পায় না। ফলে নানা রকম জটিল
রোগে ত্রুটি দেখা দেয়। দেহযন্ত্রটি সচল রাখার জন্য অবশ্যই সার্ভিসিং করা এবং রেস্ট দেয়ার প্রয়োজন হয়
মহাবিজ্ঞানী আল্লাহ তাঁর মহাপ্রজেক্টের অধীনে পৃথিবী সৃষ্টি করে উদ্ভিদ ও প্রাণিজগৎ সৃষ্টির পর বিভিন্ন পর্যায়ে প্রযুক্তি প্রয়োগ করে মানুষের উন্মেষ ঘটিয়েছেন। যাতে করে মানুষ পৃথিবীতে তার রিপ্রেজেন্টেটিভের গুরুদায়িত্ব পালন করতে পারে। স্যার জফরুল্লাহ খান কোরআনের ইংরেজি অনুবাদের ভূমিকায় লিখেছেন, আদমকে সৃষ্টির আগেও পৃথিবীতে মানুষ ছিল। সেসব মানুষকে অ্যানথ্রোপয়েড অ্যাপস বলা হয়। তারা কোরআন বর্ণিত আদম ছিল না। কোরআনে যে আদমের কথা বর্ণিত হয়েছে সে আদম হচ্ছে প্রজ্ঞাবান প্রথম মানুষ। প্রাণী বিজ্ঞানীরা কোরআনে বর্ণিত আদমকে হোমো ইরেক্টাস কিংবা হোমো সেপিয়েন্স বলেন। যে জিনের কারণে মানুষ আশরাফুল মাখলুকাতে পরিণত হয়েছে সেই ঐধৎরভ জিনটি আবিষ্কার হয়েছে। কোরআনে আছে, অ কাদ খালাক্কাকুম আত্বওয়ারান (৭১:১৪)। আল্লাহ মানুষকে প্রকল্পের উন্নতির ধাপে ধাপে সৃষ্টি করেছেন। সব মানুষের জিন একই হলেও নিউক্লিওটাইডের বিন্যাসের ভিন্নতার কারণেই মানুষের মধ্যে চলনে-বলনে, স্বভাব-চরিত্রে, রুচিবোধে ও জ্ঞানে পার্থক্যের সৃষ্টি হয়।
মহাবিজ্ঞানী আল্লাহ বিজ্ঞানময় ইসলামকে পছন্দ করেছেন। ঈসা (আ•)-এর জন্মের বহু আগে থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর মানুষ রোজা পালন করত। সিয়াম সাধনা হচ্ছে মানুষের সব রকম মনোদৈহিক কুৎসিত কামনা-বাসনা থেকে মুক্ত রাখার কোরআনিক বিজ্ঞানের এক বিশেষ পদ্ধতির নাম। সিয়াম সাধনার মাধ্যমে পরিচ্ছন্ন, পূত-পবিত্র, সুন্দর, রোগমুক্ত উন্নত মানব জীবন, চরিত্র ও আত্মা প্রশান্তি লাভ করে আধ্যাত্মিক উৎকর্ষ সাধিত হয়।
আল্লাহর রাসূল যখন ৬২২ সালে মক্কা থেকে মদিনায় পর্যটন করেছিলেন তখন ইহুদিরা রোজা ব্রত পালনরত ছিল। মুসা (আ•) বনী ইসরাইলদের সঙ্গে নিয়ে খরস্রোতা নীলনদ অতিক্রম করে মিসরের সম্রাট ফেরাউন রামোসেস দ্য গ্রেট ২-এর ধ্বংসের হাত থেকে তাঁর জাতিকে রক্ষা করেছিলেন। তাই আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা হিসেবে তারা রোজা পালন করে। রাসূলুল্লাহ (সা•)-এর সাহাবীগণ মুসা (আ•)-এর অনুসারীদের মতো আল্লাহর বেশি সন্তুষ্টির জন্য রোজা করতে থাকলে সাত মাস পর আল্লাহ মুসলমানদের জন্য এক মাস রোজার সিয়াম সাধনা বাধ্যতামূলক করে অহি নাজিল করেন। লোহা-লক্কড় দিয়ে তৈরি যন্ত্র দীর্ঘদিন একটানা চলার পর যন্ত্রটিতে ত্রুটি-বিচ্যুতি দেখা দেয়। ত্রুটি-বিচ্যুতিপূর্ণ যন্ত্রটি দিয়ে পারফরম্যান্স ভালো পাওয়া যায় না। যন্ত্রটিকে বিশ্রাম দিয়ে সার্ভিসিং করাতে হয়। জীবনে বেঁচে থাকার জন্য খাদ্যের প্রয়োজন। খাদ্য মেটাবলিজমের পর তার সার নির্যাস দেহের জ্বালানি শক্তির সৃষ্টি করে।
বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখেছেন, খাদ্য বেশি খেলে জীবনের দৈর্ঘ্য হ্রাস পায়। শুধু খাওয়ার মধ্যে থাকলে দেহযন্ত্রটি বিশ্রাম পায় না। ফলে নানা রকম জটিল রোগে ত্রুটি দেখা দেয়। দেহযন্ত্রটি সচল রাখার জন্য অবশ্যই সার্ভিসিং করা এবং রেস্ট দেয়ার প্রয়োজন হয়। দেহ বিভিন্ন ধরনের পাঁচ সহস্রাধিক জৈব-অজৈব রাসায়নিক পদার্থ থেকে সৃষ্টি। ‘আমার এই দেহঘড়ি যতন করি কোন মিস্ত্রি বানাইয়াছে।’ একটানা দীর্ঘদিন চলার পর দেহযন্ত্রটির কোষের পরতে পরতে চর্বি জমতে থাকে, যেমনি তেলে গাদ পড়ে কিংবা লৌহে মরিচা পড়ে। যদি এমন হয় তবে রক্তনালীগুলোর ভেতরে চর্বি নামের শেওলা কিংবা গাদের কারণে রক্তনালী চিকন হয়ে যায়, ফলে রক্তের স্বাভাবিক প্রবাহে বাধার সৃষ্টি হয়। ইঞ্জিনের তেলের পাইপলাইনে এবং কার্বলেটারে ময়লা জমলে ইঞ্জিন স্টার্ট নেয় না এবং সেকশন লাইনে সার্কুলেশন হয় না।
তেমনি মানুষের দেহে রক্তের বিভিন্ন পদার্থের সূক্ষ্ম মিশ্রণের তারতম্য ঘটে এবং রক্তের ঘনত্ব বৃদ্ধি পায়। যা গাদযুক্ত তেলের মতো। রক্তে চর্বিকণা ভেসে বেড়াতে থাকে। পূর্ণবয়স্ক পুরুষের দেহে রক্তের পরিমাণ থাকে ৫•৫ লিটার। নারীর দেহে থাকে ৪•৫ লিটার। একফোঁটা রক্তে এক মিলিয়ন লৌহকণিকা থাকে, যাকে হিমোগ্লোবিন বলে। রক্তকণিকাগুলো ১২০ দিন জীবিত থাকার পর নষ্ট হয়ে যায়। রক্তের শ্বেতকণিকার অনুপাত থাকে ৫০০:১। দেহযন্ত্রে চর্বি জমতে থাকলে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে। হৃদযন্ত্রটি মানুষের সমগ্র জীবনে দুশ’ কোটি বার ডায়াস্টলিং ও সিস্টোলিং করে প্রায় পঞ্চাশ কোটি লিটার রক্ত দেহে পাম্প করে। স্বাভাবিক অবস্থায় হৃদযন্ত্রটি প্রতি মিনিটে ৭২ বার স্পন্দিত হয়। জিব্রাইল (আ•) আল্লাহ কর্তৃক নিযুক্ত হৃদযন্ত্র বিশেষজ্ঞ হিসেবে নিজে রাসূলুল্লাহ (সা•)-এর হৃদযন্ত্রটি তিনবার সার্ভিসিং করেছিলেন, যাতে করে হৃদযন্ত্রটি থেকে ভালো পারফরম্যান্স পাওয়া যায়। আলাম নাশরাহ লাকা সাদরাকা (৯৪:১)। আল্লাহ কি তাঁর (রাসূলুল্লাহ সা•) বক্ষ (হৃদযন্ত্র) উন্মুক্ত করেননি? অতিলকাল আমছালু নাদ্দারিবুহালিন্নাছি অমা ইয়া ক্কিলুহা ইল্লাল আলিমুন (২৯:৪৩)। মানুষের জন্য আল্লাহ এসবের উপমা দেন, প্রজ্ঞাবান ছাড়া অন্যরা বিষয়টি বুঝতে চেষ্টা করে না।
**************************
যুগান্তর, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০০৮