রমজান এলেই দেশের চিত্র পাল্টে যায়। সংযমের মাসে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম হয়ে যায় সবচেয়ে অসংযমী। যেন মহাশূন্যে ওঠার তুমুল প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে। মার্কেটে মার্কেটে চোখধাঁধানো আলোকসজ্জা। মাহে রমজানের প্রতি রাতে হাফেজের দল কোরআন শুনিয়ে জয় করে নেন মুসল্লিদের মন। এক সময়ের সেরা দুই হাফেজের সঙ্গে তারাবি নিয়ে খোলামেলা আলাপচারিতা উপস্থাপিত হল-

হাফেজ ওয়াহিদুজ্জামান, সদস্য হুফফাজুল কোরআন ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ, সাবেক সেরা হাফেজ লালবাগ মাদ্রাসা

যুগান্তরঃ বর্তমানে তারাবি কেমন পড়ছেন এবং সত্তর দশকে তারাবি কেমন পড়িয়েছেন?

হাফেজ ওয়াহিদুজ্জামানঃ বর্তমানে হাফেজ এবং ভালো হাফেজের সংখ্যা বেড়েছে। এখন আগের চেয়ে অনেক সহিশুদ্ধ করে কোরআন পড়া হয়। তারাবির ব্যবস্থাও উন্নত হয়েছে। তবে হাফেজদের ভেতর যে কমার্শিয়াল চিন্তাভাবনা চলছে তা কোরআনবিরোধী।

যুগান্তরঃ কমার্শিয়াল চিন্তাভাবনা মানে?
হাফেজ ওয়াহিদুজ্জামানঃ তারাবি পড়িয়ে মুঠোভরে টাকা নেয়াকে বুঝিয়েছি।

যুগান্তরঃ হাফেজরা তো আর চেয়ে নেন না। কমিটির লোকরাই জোর করে গুঁজে দেন। হাফেজদের তো কোন দোষ দেখছি না।

হাফেজ ওয়াহিদুজ্জামানঃ হ্যাঁ ঠিকই। তবে ইদানীং দেখছি পুরনো মসজিদ ছেড়ে বেশি টাকার লোভে বড় বড় মসজিদের দিকে পা বাড়াচ্ছেন কোন কোন হাফেজ।
যুগান্তরঃ এ ব্যাপারে আপনার মতামত কি?

হাফেজ ওয়াহিদুজ্জামানঃ ’৬৭-তে একবার তারাবির হাদিয়া নিয়েছিলাম। বাবা নিষেধ করেছেন। পরে আর কখনও নিই না।

যুগান্তরঃ এখন অনেক মসজিদে হাফেজদের সময় বেঁধে দেয়া হচ্ছে, ১৫ মিনিটে নামাজ শেষ করতে হবে। আপনাদের কি এভাবে সময় বেঁধে দেয়া হতো?

হাফেজ ওয়াহিদুজ্জামানঃ আগে যারা দ্রুতগতিতে পড়তেন, কিছু অতিউৎসাহী লোক তাদের ‘বাঘা হাফেজ’, ‘উল্কা হাফেজ’ বলে বিশেষায়িত করত। তাড়াহুড়া পছন্দ করে এমন লোকের সংখ্যা প্রতি যুগেই ছিল, এখনও আছে। মোট ৫-৬ বছর ছাড়া প্রতি বছরই তারাবি পড়িয়েছি, কখনও ক্ষিপ্রতার প্রয়োজন পড়েনি।
হাফেজ মাওলানা মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ, সাবেক সেরা হাফেজ লালবাগ মাদ্রাসা,
পেশ ইমাম ও খতিব, আরামবাগ জামে মসজিদ, মতিঝিল

যুগান্তরঃ ষাট-সত্তর দশকে কেমন তারাবি দেখেছেন, এখন কেমন দেখছেন?
হাফেজ সাইফুল্লাহঃ আগে শহরে মানুষ কম ছিল, মসজিদও ছিল কম। এখন মানুষ বেড়েছে, মসজিদও কিছুটা বেড়েছে। আগে তারাবিতে মসজিদ ভরে যেত, এখনও ভরে যায়। প্রায় সবখানেই তারাবির ইমেজ বজায় রয়েছে, খুব একটা পার্থক্য দেখছি না।

যুগান্তরঃ তাহলে পার্থক্য কোন দিক থেকে রয়েছে?
হাফেজ সাইফুল্লাহঃ আগে রমজান মানেই ছিল হাফেজদের মাস। হাফেজদের নিয়ে ব্যস্ত থাকত সবাই। পারলে তাদের মাথায় তুলে রাখত। এখন সেদিন নেই। এখন তাদের প্রতি শ্রদ্ধা-ভক্তি, আদর-আপ্যায়ন লোপ পেয়েছে এবং তা দিন দিন অবনতির দিকেই যাচ্ছে।

যুগান্তরঃ এর কারণ কি বলে আপনি মনে করেন?
হাফেজ সাইফুল্লাহঃ এটা গভীর চিন্তার বিষয়। আমার কাছে অনেকগুলো জবাব রয়েছে।

এক• আগে যেমন মানুষের ভেতর কোরআন-হাদিসের জ্ঞান, ইসলামের প্রতি শ্রদ্ধা-ভক্তি ছিল তা এখন কমে গেছে।

দুই• মানুষের জীবনধারা কঠিন হয়ে গেছে। আগে যেভাবে মানুষ সহজে জীবনধারণ করতে পারত এখন তা পারছে না। সবার আর্থিক সংকট বেড়ে গেছে। যে কারণে কারও কারও ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অনেকেই আলেম-উলামা, হাফেজদের সঠিকভাবে মূল্যায়ন, আপ্যায়ন করতে পারছেন না।

তিন• আগে উঁচুতলার মানুষের সন্তান ঘুম থেকে উঠেই মক্তবে যেত, এখন তারা যায় কিন্ডারগার্টেনে। যে কারণে ধর্মীয় জ্ঞানের নূøনতম ছোঁয়াও তাদের গায়ে লাগে না। তাহলে কিভাবে তাদের ভেতর কোরআন প্রেম জন্মাবে?

চার• আলেম সমাজের অনৈক্য আরেকটি বড় কারণ।

পাঁচ• মসজিদ কমিটিতে আলেম-হাফেজদের স্থান নেই। মসজিদ পরিচালনা করে ইংরেজি শিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত ধর্মহীনরা। তারা আলেম-হাফেজদের মর্যাদার কি বুঝবে?

ছয়• জেএমবি’র অমানবিক নিষ্ঠুর ভূমিকাও কম দায়ী নয়। যদিও এ সন্ত্রসীদের বিরুদ্ধে আলেম সমাজ বেশ জোরালো ভূমিকা রেখেছে।

যুগান্তরঃ এর কি কোন প্রতিকার নেই? আলেম-হাফেজদের এর থেকে উঠে আসার পথ কি?
হাফেজ সাইফুল্লাহঃ পথ অবশ্যই আছে। এজন্য সবার আগে আলেম সমাজের ঐক্য জরুরি। মিডিয়ার মাধ্যমে ধর্মীয় কথাবার্তা প্রচুর পরিমাণে প্রচার করা। কোরআন যে চরিত্রের কথা বলে, মানবতার কথা বলে, সহানুভূতির কথা বলে তা সবাইকে জানিয়ে দেয়া। ধর্মের প্রতি সবাইকে উৎসাহী করে তোলা।

যুগান্তরঃ তারাবির হাদিয়া নিয়ে আপনার বক্তব্য কি?
হাফেজ সাইফুল্লাহঃ তারাবির হাদিয়াকে আমি একটি সাধারণ সৌজন্যবোধ মনে করি। এটা কোরআনের বিনিময় নয়। পুরো দুনিয়া দিয়ে দিলেও কোরআনের একটি হরফের দাম হবে না। সম্পূর্ণ কোরআন তো অনেক পরের কথা। আর কোন হাফেজ তো কখনো কারও কাছ থেকে চেয়ে বা কন্ট্রাক্ট করে এক পয়সা নেন না। মুসল্লিরাই ভালোবেসে হাফেজদের সম্মানিত করেন। এতে দোষের কিছু দেখি না।

**************************
হাফেজ তাজুল ফাত্তাহ
যুগান্তর, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০০৮