সোমবার সন্ধ্যা। বায়তুল মোকাররমে মাগরিব আদায় করেছি। উত্তর গেটের সিঁড়ি বেয়ে নামতেই ধর্মীয় বলয়ের লেখক মুহাম্মদ যাইনুল আবিদীনের সঙ্গে দেখা। চোখে চোখ পড়তেই লজ্জা পেলাম। কাছাকাছি বাসা, অথচ অনেকদিন দেখা নেই। খুব মায়াময় ভঙ্গিতে সালাম-মুসাফা হল। ব্যক্তিগত আলাপের পর শান্ত মনে জিজ্ঞেস করলাম- হুজুর তারাবি কোথায় পড়েন? নির্ধারিত কোন মসজিদ আছে কি? আপন ভঙ্গিতে জবাব দিলেন- বাসায় থাকলে হাজীপাড়ার ঝিল মসজিদে তারাবি পড়ি। খুব ভালো লাগে, হাফেজ হুসাইনুল আর হাফেজ মকনুনের পড়া বেশ।
যাইনুল আবিদীনের কথায় আমার মনটাও ছুটে চলল ঝিল মসজিদের দিকে। তেলাওয়াতের টানে হাজির হলাম ঢাকার চৌধুরীপাড়ার ঝিল মসজিদে। ক্লান্ত শরীর, শান্ত মন, এদিকে হাফেজের দরাজ কণ্ঠ- সব মিলিয়ে অন্য রকম সুরেলা পরিবেশ। খুব ধীরে ধীরে আবেগময় কণ্ঠেই তেলাওয়াত করে যাচ্ছেন। হাফেজ দু’জন। মন ভরে গেল তাদের তেলাওয়াতে। তারাবি শেষে ঝিল মসজিদের দরজা পারে হতেই দেখা হল মিসরে পড়-য়া বাঙালি আলেম মাকতাবাতুস সালামের প্রোপাইটর মাওলানা আবদুল আজিজ আযহারীর সঙ্গে। মিসরের তারাবি ও বাংলাদেশের তারাবির গুণগত কোন পার্থক্য আছে কিনা জানতে চাই মাওলানার কাছে। বন্ধুসুলভ আচরণে তিনি জানালেন, তারাবির ফাঁকে ফাঁকে আমার স্মৃতিতে মিসরের আট বছরের ডায়রি ভেসে আসছিল। মনে মনে কাঁদছিলাম, কোথায় সেই কোরআনের সুর, তেলাওয়াতের স্বাদ- আর মিসরীয় কণ্ঠ। ওদের ওখানে প্রায় মসজিদেই আট রাকাত তারাবি হয়। কোন কোন মসজিদে হয় বিশ রাকাত। কোথাও কোরআন খতম হয়। কোথাও হয় না। কেউ কেউ কোরআন খুলে দেখে দেখে পড়ে, কেউ পড়ে মুখস্থ। রমজান এলে মিসরীয়রা সারাদিন তেলাওয়াত করে। আবেগী মুসলামনরা তিন দিনে, কেউবা দশ দিনে কোরআন খতম করেন। আমাদের দেশে ঈদ মৌসুমে যেমন মার্কেট, বাজার সাজানো হয়, সেখানে রমজানের শুরুর দিন থেকেই ঘরে ঘরে ফানুস বাতি লাগনো হয়। রোমাঞ্চকর পরিস্থিতি বিরাজ করে সবখানে।
দীর্ঘদিনের কৌতূহল- বায়তুল মোকাররমে তারাবির নামাজ আদায় করব। দ্বিতীয় রমজানে প্রবল আগ্রহে হাজির হলাম জাতীয় মসজিদে। এশার আজানের সুর ভেসে বেড়াচ্ছে আকাশে-বাতাসে। মধুর আজানে ধর্মপ্রাণ মুসলমান ছুটে চলছেন মসজিদ পানে। বর্তমান ভারপ্রাপ্ত খতিব হাফেজ মুফতি নূরুদ্দীনের সঙ্গে কথা বলছি। দীর্ঘ চব্বিশ বছর ধরে তিনি বায়তুল মোকাররমে খতমে তারাবিহ পড়ান। অবশ্য তার তেলাওয়াতে রুহানি নূর আছে। বায়তুল মোকাররমে তার প্রথম তারাবি পড়ানো বেশ মজার। সব শ্রেণীর মুসল্লি, আলেম, হাফেজ, ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ, হকার, পথিক- হরেকরকম মুসল্লি হয় বায়তুল মোকাররমে। জাতীয় মসজিদে তারাবি পড়া রোমাঞ্চকর। নতুন কিছু সৃষ্টি হয় হৃদয়ে, আনন্দে আপ্লুত হয় মন। সেই ছেলেবেলার প্রথম তারাবি পড়ানো, হাঁটু কাঁপা আর গলা ভেঙে যাওয়ার স্মৃতি স্মরণে এলে বড় লজ্জা পান মুফতি সাহেব। কানায় কানায় ভরে উঠছে জাতীয় মসজিদ। অজুখানায় লম্বা সিরিয়াল। সারি সারি মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। ঘড়ির কাঁটা শোয়া ৮টার কাছাকাছি, নামাজের সময় হয়ে যাচ্ছে। মুসল্লিদের অনেকেই হাফেজ সাহেবদের একনজর দেখা ও মোসাফা করে মোবারকময় হাতের ছোঁয়া পাওয়ার আগ্রহে গেটে অপেক্ষা করছেন। হাফেজ নূরুদ্দীন, হাফেজ মিজানুর রহমান, নতুন যোগ দেয়া হাফেজ মুস্তাফিজুর রহমান পালাক্রমে মিম্বরের দিকে এগুচ্ছেন। অনেকের সঙ্গে হাত বড়িয়ে মোসাফা করছেন। ফরজ শেষ করে সবেমাত্র তারাবি শুরু হয়েছে। হাজারও মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাসে গা জ্বলে যাওয়ার অবস্থা। প্রচণ্ড গরমে মুসল্লিদের বেশ কষ্ট হচ্ছিল। মুসল্লিদের নড়াচড়া আর অস্থিরতা দেখে দুঃখ পেয়েছি মনে। জাতীয় মসজিদ- প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকা আয়। সেখানে মুসল্লিদের নামাজ আদায় হয়, অথচ অপ্রতুল ফ্যান। বহু দূরে দূরে একটি ফ্যান, তাও ধীরে ধীরে ঘুরছে। ঢাকার অনেক মসজিদে আইপিএস, এসিসহ অনেক সুযোগ-সুবিধা আছে, কিন্তু জাতীয় মসজিদে গরমে গা জ্বলে যাচ্ছে মুসল্লিদের।
আরামের নামাজ তারবি পড়তে গেলাম জাতীয় মসজিদে। মনে মনে বেরাম নিয়ে ফিরলাম ঘরে। কে জানে হয়তো গোটা জাতিটার মনেই বেরাম ঢুকেছে। হে মাবুদ, রহমতের মাসের উসিলায় আমাদের আপনি রহমত দান করেন।
**************************
মুফতি হুমায়ুন আইয়ুব
যুগান্তর, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০০৮