মহান স্রষ্টা আল্লাহতা’আলার সমগ্র সৃষ্টিই তার প্রিয়। তবে মানুষ সৃষ্টির সেরা হিসেবে পরিচিত। কেননা, মানুষকেই তিনি পরীক্ষার মাধ্যমে শ্রেষ্ঠত্বের পদমর্যাদায় স্থান দান করে থাকেন, অন্য কোন সৃষ্টজীবকে নয়। মানুষের মধ্যেও পদমর্যাদায় সর্বশ্রেষ্ঠ স্থানে অধিষ্ঠিত নবী-রাসূলগণ, অতঃপর সাহাবায়ে কেরাম এবং পরে আল্লাহতা’আলার ওলীগণ ও মুমিনমুত্তাকী মুসলিম, যারা নাফমুল মুতমায়িন্না বা প্রশন্ত আত্মার অধিকারী।
মহান প্রভু! আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের নিকট নবী-রাসূলগণই সবচেয়ে বেশি কটিন পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছেন এবং মুমিন মুত্তাকীনরাও এই কঠিন পরীক্ষায় পরীক্ষিত হয়েছেন।
এ সম্পর্কে মহান আল্লাহতা’আলা মহাগ্রন্থ আল কুরআনে ইরশাদ করেছেন “কোন বিপদ কখনো আসে না আল্লাহর অনুমতি ছাড়া। যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে, তিনি তার অন্তরকে সুপথে পরিচালিত করেন। আল্লাহ সর্ববিষয়ে সম্যক অবগত।” (সূরা তাগাবুল-১১)
আল্লাহ আরো বলেন “তিনিই- মৃত্যু ও জীবন উদ্ভাবন করেছেন, যেন তোমাদেরকে পরীক্ষা করে দেখতে পারেন যে, তোমাদের মধ্যে আমলের দিক দিয়ে সর্বোত্তম ব্যক্তি কে? (সূরা মূলক-২)
মানব সৃষ্টির ইতিহাসে দেখা যায় যে, প্রত্যেক নবী রাসূলই নানা ঘটনার মাধ্যমে আল্লাহ তা’আলার নিকট পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছেন এবং তা হতে উত্তীর্ণ হয়ে, তার নৈকট্য লাভে ধন্য হয়েছেন।
তবে মহাবিশ্বে আকাশের নিচে এবং যমীনের উপরে আল্লাহতা’আলার আরশ কাঁপানো, ফেরেশতাদের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি এবং প্রাণীদের চোখে অশ্রু আনয়নকারী, যে দৃশ্য পৃথিবীর বুকে দুশ্যমান হয়েছিলো, তা হলো যে, পিতার হাতে পুত্রকে জবাই করে, আল্লাহর নামে উৎসর্গ করা। আর উহা ছিলো এক নবীর পরিবারের আত্মোৎসর্গের এক মহা পরীক্ষা। যে পরীক্ষায় পিতা-পুত্র এবং মাতা উত্তীর্ণ হয়ে, অকৃত্রিম আল্লাহর প্রেমের পরিচয় দিয়ে পৃথিবীকে স্তম্ভিত করে দিয়েছিলেন।
ফলে পিতা হলেন, ‘ইব্রাহীম খলিলুল্লাহ’ মহান আল্লাহর পরীক্ষিত বন্ধু, পুত্র হলেন, ‘ইসমাঈল যবিহউল্লাহ’ মহান আল্লাহর মহাসম্মানিত নবী এবং কা’বা ঘরের সেবক এবং মাতা হলেন, অতিশয় পবিত্র পানীয়, পানির উৎস যমযম কূপের সন্ধানদাত্রী বিবি হাজেরা (আঃ)। তাদের আত্মত্যাগের ফলে প্রতিষ্ঠিত হলো হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এর সুন্নত, মানব সন্তানকে জবেহ করে, আল্লাহর নামে উৎসর্গ করার পরিবর্তে সম্পদের মোহ ত্যাগ করে, গৃহপালিত চতুষ্পদ জন্তু আল্লাহর নামে উৎসর্গ করে জবেহ করার বিধান কুরবানী প্রথা। এর দ্বারা বান্দার আল্লাহ তা’আলার প্রতি প্রেমপ্রীতি, ভালোবাসা ও সম্পদের প্রতি লোভ-লালসার আতিশয্যের কামনা-বাসনা ত্যাগের পরীক্ষা করা হয়। এর বিনিময়ে আল্লাহ তা’আলার নিকট থেকে পেয়ে থাকে মুমিন বান্দারা পুণ্যের অধিক্যতা ও জান্নাতের নিশ্চয়তা। কেননা, মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এ সম্পর্কে বলেন, “এগুলোর (কুরবানীর জন্তুর) গোশ্ত ও রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছে না, বরং পৌঁছে তার কাছে তোমাদের মনের তাকওয়া (আল্লাহ ভীতি ও ভয় বিহ্ববলতা)। এমনিভাবে তিনি এগুলোকে তোমাদের বশ করে দিয়েছেন, যাতে তোমরা আল্লাহর মহত্ত্ব ঘোষণা কর এ কারণে যে, তিনি তোমাদের পথ প্রদর্শক করেছেন। সুতরাং (হে মুহাম্মদ) আপনি সৎ কর্মশীলদের সুসংবাদ শুনিয়ে দিন। (সূরা হজ্ব-৩৭)
আল্লাহর প্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে যারা কুরবানী করবে, তাদের পুণ্যের আধিক্য সম্পর্কে- হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন, হযরতে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি এই আশায় কুরবানী করে যে, আল্লাহ তাকে বেহেশত প্রদান করবেন তা হলে কুরবানীর জন্তুর প্রথম রক্তের ফোঁটা মাটিতে পড়তেই আল্লাহ তার সমস্ত পাপ মার্জনা করে দেন। হাশরের দিন সেই জন্তু তার সওয়ারী হবে। জন্তুর দেহে যত পশম হবে আল্লাহ তাকে সেই পরিমাণ পুণ্য দান করে থাকেন।
এই মহা পুণ্যের অর্জনের এবং মহান আল্লাহর সহিত তার প্রিয় বান্দাদের আত্মোৎসর্গের মহিমার ঘটনার সূত্রপাত যেভাবে আল্লাহ তা’আলা পৃথিবীতে সংঘটিত করলেন, এরই সুন্দর বর্ণনা তিনি কুরআন পাকে এভাবে বিবৃত করলেন, মহান আল্লাহ তা’আলা বলেন, “ইব্রাহীম তার (হযরত নূহ আঃ-এর উত্তরসূরী) উত্তরসূরী। স্মরণ করুন (হে মুহাম্মদ সাঃ) তিনি (ইব্রাহীম) তার প্রভুর নিকট বিশুদ্ধ চিত্তে ক্বালবে সালীমে) উপস্থিত হয়েছিলেন। তার পিতা ও তার সম্প্রদায়কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তোমরা কিসের ইবাদত (পূজা) করছ? তোমরা কি আল্লাহর পরিবর্তে মিথ্যা উপাস্যকে চাও (কামনা করছো)? বিশ্বজগতের পালনকর্তা সম্পর্কে তোমাদের ধারণা কি? অতঃপর ইব্রাহীম একবার তারকারাজির দিকে লক্ষ্য করলেন এবং বললেন, ‘আমি অসুস্থ।’ অতঃপর ওরা (তার সম্প্রদায়ের লোকেরা) তাকে (ইব্রাহীমকে) পশ্চাতে রেখে চলে গেলো। পরে তিনি (ইব্রাহীম) সন্তর্পর্ণে ওদের (দেবতালয়ে ঢুকলেন) এবং দেবতাদের বললেন, ‘তোমরা খাদ্য খাও না কেন?’ তোমাদের কি হয়েছে যে, তোমরা কথা বল না কেন? পরে তিনি (ইব্রাহীম) মূর্তিদের ওপর সবলে আঘাত হানলেন। (তখন ইব্রাহীমের সম্প্রদায়ের) লোকেরা তার দিকে ছুটে এলো। তিনি বললেন, ‘তোমরা তো স্বনির্মিত প্রস্তরের পূজা করছো? অথচ আল্লাহ তোমাদের এবং তোমরা যা তৈরি করছ, তা সবই সৃষ্টি করেছেন। ওরা বলল, অগ্নিকুণ্ড বানাও, অতঃপর একে (ইব্রাহীমকে) জ্বলন্ত অগ্নিতে নিক্ষেপ করো।’ ওরা (মূর্তি পূজ করা) তার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করেছিলো, কিন্তু আমি ওদের (চক্রান্তকে) নস্যাৎ করে দিলাম (ইব্রাহীমের অগ্নিকুণ্ডকে আরামদায়ক করে দিলাম)। তখন ইব্রাহীম বললেন, ‘আমি আমার প্রতিপালকের দিকে চললাম, তিনি আমাকে পথ দেখাবেন; হে আমার প্রতিপালক! আমাকে সৎ পুত্র দাও।’ অতঃপর আমি তাকে (ইব্রাহীমকে) এক স্থির বুদ্ধিসম্পন্ন (সহনশীল) পুত্রের সুসংবাদ দান করলাম। অতঃপর (ইসমাঈল) পিতার সঙ্গে কাজ করার মত (কিশোর) বয়সে উপনীত হলে একদিন তার পিতাকে (ইসমাঈলকে) বললেন, হে আমার প্রিয় বৎস, স্বপ্নে আমি তোমাকে। (আল্লাহর হুকুমে) যবাই করছি, এখন তোমার অভিমত কি? সে (ইসমাঈল) বলল, হে আমার পিতা! আপনি যা আদিষ্ট হয়েছেন, তাই করুন। আল্লাহ চাহেতু আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের মধ্যে পাবেন। যখন তারা উভয়ে (পিতা-পুত্র) অনুগত করলো এবং তিনি (ইব্রাহীম আঃ) তার পুত্রকে কাত করে শোয়ালেন, তখন আমি তাকে ডেকে বললাম, হে ইব্রাহীম, তুমি তো (তোমার স্বপ্নাদেশ সত্যই পালন করলে, নিশ্চয়ই আমি এভাবে সৎকর্মশীলদের পুরস্কৃত করে থাকি। নিশ্চয়ই এ ছিলো এক স্পষ্ট পরীক্ষা। আমি তদস্থলে কুরবানীর জন্য এক হ্নষ্টপুষ্ট জন্তু দান করলাম (উহাকে তুমি কুরবানী কর)। (তোমার এই আন্তরিক উৎসর্গকে) আমি (আল্লাহ) পরবর্তী উম্মতদের জন্য স্মৃতি রক্ষার্থে অনুষ্ঠানে পরিণত করে রেখেছি। ইব্রাহীমের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। এভাবেই আমি সৎকর্মশীলদের পুরস্কৃত করে থাকি। তিনি ছিলেন (ইব্রাহীম) আমার বিশ্বাসী বান্দাদের মধ্যে একজন।” (সূরা সাফ্ফাত-৮৪-১১১)
হে মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন! তোমার মাহবুব আখেরী নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উম্মতের মধ্যে, তোমার পরীক্ষিত বন্ধু, হযরত ইব্রাহীম খলিলুল্লাহ’ (আঃ)-এর ন্যায় তোমার প্রেমে আপ্লুত হয়ে সম্পদ উৎসর্গের আগ্রহ ও ইচ্ছা দান কর। আমীন ।।
***************************
লেখকঃ মোহাম্মদ লুৎফর রহমান ইবনে ইউসুফ
দৈনিক ইত্তেফাক, ১৪ ডিসেম্বর ২০০৭