- Home
- দৈনন্দিন জীবনে ইসলাম
- পরনিন্দা পরিত্যাজ্য
পরনিন্দা পরিত্যাজ্য
- By Article Poster
- Published 12/15/2007
- দৈনন্দিন জীবনে ইসলাম
- Unrated
গীবত বা পরনিন্দা সামাজিক শান্তি বিধ্বংসী একটি ঘৃণ্য অপরাধ। আলকুরআনে গীবতকে আপন মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার সাথে তুলনা করা হয়েছে। আর হাদিসে একে ব্যভিচারের চেয়েও মারাত্মক অপরাধ বলে ঘোষণা করা হয়েছে। অথচ আজকাল অপরের দোষচর্চা আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অপরের দোষচর্চা না করলে মনে হয় আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের কি যেন প্রয়োজনীয় কাজটি বাদ পড়ে গেছে। গীবত এত গোনাহের কাজ হওয়া সত্ত্বেও আমরা গীবত পরিত্যাগ করতে পারছি না, গীবত বর্জনের কোন প্রচেষ্টাও করছি না। এর জন্য আমাদের অজ্ঞানতা, আমাদের অসচেতনতা, অবহেলা ইত্যাদিই মূলত দায়ী। আলোচ্য প্রবন্ধে এ বিষয়ের ওপর আলোকপাত করার প্রচেষ্টা করা হয়েছে।
গীবত-এর পরিচয়
গীবত আরবি শব্দ। আভিধানিক অর্থ-অন্যের দোষ-ত্রুটি প্রকাশ করা, অসাক্ষাতে দুর্নাম করা, কুৎসা রটনা করা ইত্যাদি। গীবতের পরিচয় প্রসঙ্গে রাসুল (সঃ) বলেছেন, তোমার ভাইয়ের অনুপস্থিতিতে এমন কিছু উল্লেখ করা যা শুনলে সে অপছন্দ করবে তাই গীবত। রাসুল (সঃ) আরো বলেছেন, গীবত হচ্ছে, তুমি অপর ব্যক্তির এমন দোষ-ত্রুটি বর্ণনা করছ যা প্রকৃতপক্ষেই তার মধ্যে বিদ্যমান আছে। (তিরমিযী) ইমাম গাযালী বলেন, গীবত হচ্ছে তুমি তোমার ভাইয়ের দোষ-ত্রুটি এমনভাবে উল্লেখ করলে যে, তা যদি তার কানে পৌঁছে তবে সে তা অপছন্দ করবে। ইবনুল আসিরের মতেঃ কোন ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে তার দুর্নাম করা, যদিও তার মধ্যে সেই দোষ থেকে থাকে তাই গীবত। ইমাম নববীর মতেঃ কোন ব্যক্তিকে এমনভাবে উল্লেখ করা যা সে অপছন্দ করে তা প্রকাশ্যে হোক বা ইশারা ইঙ্গিতে হোক, তাই গীবত। আল্লামা বদরুদ্দিন আইনীর মতে, গীবত হচ্ছে- কোন ব্যক্তি অপর কোন ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে তার সম্পর্কে এমন কথা বলা যা শুনলে সে চিন্তাম্বিত হবে। তা সত্য হলেও। আর সে কথা মিথ্যা হলে তার নাম অপবাদ। আল্লামা রাগিব ইস্পাহানীর মতে, নিষ্প্রয়োজনে কোন ব্যক্তির দোষ প্রকাশ করা হচ্ছে গীবত। বস্তুত কোন ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে তার এমন দোষ-ত্রুটি বর্ণনা করা, যা শুনলে সে অসন্তুষ্ট হয়, এটাই গীবত বা পরনিন্দা। গীবত বাচনিক অথবা লেখনীর মাধ্যমে অথবা অঙ্গ-প্রতঙ্গের ইশারা ইঙ্গিতে কিংবা অন্য যে কোন উপায়েই বর্ণনা করা হোক এবং সে ব্যক্তি মুসলিম অথবা অমুসলিম হোক সর্বাবস্থায় গীবত ঘৃণ্য কাজ। যদি এমন দোষ-ত্রুটি বর্ণনা করা হয়, যা ঐ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মধ্যে পাওয়া যায় না, তবে তা মিথ্যা অপবাদ হিসেবে গণ্য হবে। যাকে কুরআনের পরিভাষায় বুহতান বা অপবাদ বলে।
গীবতের বিভিন্ন ক্ষেত্রঃ
গীবত বা পরনিন্দা বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিদ্যমান। দৈনন্দিন জীবনে গীবতকে আমরা বিভিন্নভাবে লক্ষ্য করি। যেমনঃ
০১· মুসলমানের গীবতঃ এক মুসলমান অপর মুসলমানের গীবত করা সম্পূর্ণ হারাম। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেনঃ তোমরা একে অপরের গীবত করো না। তোমরা কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ কর? আসলে তোমরা তা ঘৃণা কর’। (আলকুরআন, ৪৯-১২)
০২· অমুসলিম নাগরিকের গীবতঃ ইসলামি রাষ্ট্রে বসবাসকারী অমুসলিম নাগরিকের গীবত করাও হারাম। কেননা অমুসলিম নাগরিক ইসলামি রাষ্ট্রে মান-মর্যাদা ও ইজ্জত-আবরু রক্ষার ক্ষেত্রে সমমর্যাদা সম্পন্ন। তাই এদের মান-সম্মানে আঘাত লাগে এরূপ গীবত করা হারাম।
০৩· যুদ্ধরত অমুসলিম শত্রুর গীবতঃ ইসলামি আইন শাস্ত্রের গ্রন্থাবলী থেকে জানা যায় যে, অমুসলিম শত্রুর গীবত করা জায়েয। তাফসিরে কাবিরে ইমাম ফখরুদ্দিন রাযী সূরা হুজুরাতের ১২নং আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেছেন যে, কাফিরদের গীবত করা জায়েয। সম্ভবত তিনি কাফির বলতে যুদ্ধরত শত্রু কাফিরদেরকেই বুঝিয়েছেন। এ ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক পরিজ্ঞাত।
০৪· জীবিত ব্যক্তির গীবতঃ জীবিত ব্যক্তির গীবত করাও হারাম। উপরিউক্ত তিন প্রকারের বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে।
০৫· মৃত ব্যক্তির গীবতঃ মৃত ব্যক্তির গীবত করাও হারাম। তদ্রূপ মৃত ব্যক্তিকে গালি দেয়া, মন্দ বলা, তার দুর্নাম-বদনাম করাও হারাম। যদিও সে জীবদ্দশায় পাপকর্মে লিপ্ত থাকে। এ প্রসঙ্গে রাসূল (সঃ) বলেছেন, তোমাদের কেউ মৃত্যুবরণ করলে তাকে ছেড়ে দাও এবং তার গীবত করো না। (আবু দাউদ) আর তিনি গালিগালাজ প্রসঙ্গে বলেছেনঃ তোমরা মৃতদেরকে গালি দিও না, কারণ তারা তাদের কৃতকর্মের প্রতিদান পাওয়ার স্থলে পৌঁছে গেছে। (তারগীব) রাসূল (সঃ) মৃত ব্যক্তিদের দোষ-ত্রুটি বলতে নিষেধ করার সাথে সাথে তাদের সদগুণাবলী আলোচনা করতে নির্দেশ দিয়েছেন এভাবে- ‘তোমরা তোমাদের মৃত ভাইয়ের সদগুণাবলী আলোচনা কর এবং দুর্নাম করা থেকে বিরত থাক’। (আবু দাউদ)
০৬· দৈহিক কাঠামোর গীবতঃ কাউকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য বেঁটে, কুৎসিত, নাক লম্বা, কানে শোনে না, চোখে দেখে না ইত্যাদি দৈহিক ত্রুটির উল্লেখ করে গীবত করা হারাম। একদা হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ হে আল্লাহর রাসুল! আপনি কি সাফিয়ার বেঁটে হওয়াটা পছন্দ করেন না? রাসুল (সঃ) বললেন, হে আয়শা! তুমি এমন একটি কথা বললে যা নদীর পানির সাথে মিশিয়ে দিলে তার উপরও প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করবে। রাসুল (সঃ)-এর স্ত্রী উম্মে সালমা (রাঃ) বেঁটে ছিলেন। তার সহধর্মিনীগণ এজন্যে হাসি-ঠাট্টা করলে আল্লাহ তাআলা তৎক্ষণাৎ নাযিল করলেনঃ হে ঈমানদারগণ! কোন পুরুষ যেন অপর কোন পুরুষের বিদ্রূপ না করে। হতে পারে সে তুলনায় উত্তম। আর কোন মহিলাও যেন অপর কোন মহিলার বিদ্রূম্নপ না করে। হতে পারে সে বিদ্রূপকারী অপেক্ষা উত্তম। (আলকুরআন, ৪৯-১১)
০৭· পোশাক পরিচ্ছদের গীবতঃ পোশাক পরিচ্ছদের ক্ষেত্রেও গীবত হয়। যেমন এভাবে বলা হয় যে, অমুক ব্যক্তি বদমায়েশদের মত পোশাক পরে, অমুক মহিলা এমনভাবে ওড়না পরিধান করে যে, তার অভ্যন্তরীণ অংশ খোলা থাকে, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বের করে চলাফেরা করে ইত্যাদি। একদা হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন, অমুক স্ত্রী লোকটির আঁচল খুব লম্বা। একথা শুনে রাসুল (সঃ) বললেন, হে আয়েশা! তুমি তার গীবত করলে। তোমার থুথু ফেলা জরুরি। আয়েশা (রাঃ) বলেন, আমি থুথু ফেললে মুখ থেকে গোশতের একটি টুকরা বেরিয়ে আসে। (তারগীব)
০৮· বংশের গীবতঃ কেউ যদি কাউকে তুচ্ছ ও হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য বলে- অমুকের বংশ নীচ বা ইতর অথবা অমুক অজ্ঞাত বংশের তবে এটাও গীবত হবে। ইসলামে নিজেকে খুব উচ্চ বংশীয় এবং অন্যকে নিম্ন বংশীয় বলা জায়েয নয়। কেননা বংশীয় মর্যাদা শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি নয়। রাসুল (সাঃ) বলেছেনঃ দ্বীনদারী ও সৎকর্ম ব্যতীত কোন ব্যক্তির অপর ব্যক্তির উপরে শ্রেষ্ঠত্ব নেই। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেনঃ ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে সেই বেশি সম্মানিত যে বেশি আল্লাহ ভীরু’। (আলকুরআন, ৪৯-১৩)
০৯· অভ্যাস ও আচার-আচরণের গীবতঃ কেউ যদি কারো অভ্যাস ও আচার-আচরণের কথা উল্লেখ করে বলে- অমুক কাপুরুষ, ভীরু, অলস, পেটুক, নির্বোধ, স্ত্রীর কথায় ওঠে-বসে, পরিণামের কথা ভেবে কাজ করে না ইত্যাদি গীবতের অন্তর্ভুক্ত। একদা এক সাহাবি কোন এক ব্যক্তির উল্লেখপূর্বক বলেন, সে এক আজব লোক। কেউ তাকে খাদ্য দিলে সব সে খেয়ে ফেলে। কেউ বাহন দিলে তাতে সে চড়ে ঘুরে বেড়ায়, কিন্তু নিজে পরিশ্রম করে আয়-উপার্জন করে না। রাসুল (সঃ) বললেনঃ তুমি তোমার ভাইয়ের গীবত করলে। সাহাবি আরজ করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! কারো ত্রম্নটি তুলে ধরাও কি গীবত? রাসুল (সঃ) বললেন, প্রকৃতপক্ষে কারো ত্রম্নটি নির্দেশ করাই গীবতের জন্য যথেষ্ট। (তারগীব)
১০· ইবাদতের গীবতঃ কেউ যদি কারো ইবাদতের সমালোচনা করে বলে অমুক ভাল করে নামাজ পড়ে না অথবা বলে সে তাহাজ্জুদ বা নফল নামাজ পড়ে না কিংবা সে রমজান মাসের সকল ফরয রোযা রাখে না ইত্যাদিও গীবতের অন্তর্ভুক্ত। তাহাজ্জুদ নামাজের ওয়াক্তের সময় কিছু লোক ঘুমিয়ে থাকলে শেখ সাদী তাদের সমালোচনা করে বললেন, এই লোকগুলো তাহাজ্জুদ নামাজ পড়লে কতই না ভাল হত। শেখ সাদীর পিতা একথা শুনে বললেন, কতই না ভালো হত যদি তুমি তাহাজ্জুদ না পড়ে এদের মত ঘুমিয়ে থাকতে। তাহলে এদের গীবত করার পাপ তোমার ঘাড়ে চাপত না।
১১· গুনাহের গীবতঃ গুনাহের গীবত হলো যেমন বলা- অমুক ব্যক্তি ব্যভিচারী, অমুক পিতা-মাতাকে কষ্ট দেয়, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী, অমুক মদ্যপায়ী, অমুক চোর, অমুকের অন্তর বিদ্বেষপূর্ণ ইত্যাদি। শেখ সাদী একবার তার শিক্ষককে বললেন, অমুক ব্যক্তি আামর প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে। শিক্ষক বলেন, হে সাদী! তোমার মতে বিদ্বেষ পোষণ হারাম, আর গীবত কি হালাল? তুমি আমার কাছে অমুক ব্যক্তির গীবত করেছ তার বিদ্বেষের উল্লেখ করে।
১২· মুখের গীবতঃ রাসুল (সঃ) কিছু লোককে লক্ষ্য করে বললেনঃ ‘তোমরা খিলাল করে নিজেদের দাঁতের ফাঁক থেকে গোশত বের করে ফেলে দাও। তারা বললো, হে আল্লাহ্র রাসুল! আজ আমরা তো গোশত খাইনি। রাসুল (সঃ) বললেন, আমি তোমাদের দাঁতের ফাঁকে গোশতের লাল টুকরা দেখতে পাচ্ছি। নিশ্চয়ই তোমরা আজ কারো গীবত করেছো। জানা যায়, প্রকৃতপক্ষেই তারা ঐ দিন এক ব্যক্তির গীবত করেছিল। (রুহুল মাআনী)
১৩· ইশারা-ইঙ্গিতে গীবতঃ ইশারা-ইঙ্গিতে গীবত করা জায়েয নয়। যেমন কেউ যদি কারো নাম উল্লেখ না করে এমন ইশারা-ইঙ্গিত ব্যবহার করে দোষ বর্ণনা করে; যা দ্বারা মানুষ বুঝে নিতে পারে যে, অমুক ব্যক্তির গীবত করা হচ্ছে। যেমন- কেউ এভাবে বললোঃ এক ব্যক্তি তার স্ত্রীর কথামত চলে এবং নিজের পিতা-মাতার কথা শুনে না। এতে শ্রবণকারী বুঝতে পারলো যে, সে অমুক ব্যক্তির গীবত করছে। এ ধরনের গীবত বৈধ নয়।
১৪· অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের গীবতঃ কেউ যদি নিজের হাত, পা, চোখ ইত্যাদি দ্বারা ইশারা করে কোন ব্যক্তির দোষ বর্ণনা করে তাও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের গীবত হবে। যেমন কোন ব্যক্তির কোন বৈঠক থেকে চলে যাওয়ার পর তার প্রতি উপস্থিত লোকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা। মহানবী (স·) বলেছেনঃ কোন মুসলিম ব্যক্তির জন্য তার ভাইয়ের চোখের দ্বারা এমনভাবে ইঙ্গিত করা জায়েয না যাতে সে মর্মাহত হয়। (রহুল মাআনী)
১৫· মনে মনে গীবত করাঃ কারো প্রতি বিদ্বেষবশত মনে মনে কু-ধারণা পোষণ করা হারাম। অবশ্য অনিচ্ছাবশত কারো প্রতি কোন খারাপ ধারণা জাগ্রত হলে তা ক্ষমার যোগ্য। আল্লাহ বলেনঃ ওহে! তোমরা যারা ঈমান এনেছ। তোমরা অধিকাংশ অনুমান থেকে বিরত থাক। কেননা অনুমান কোন ক্ষেত্রে পাপস্বরূপ। (আলকুরআন, ৪৯-১২)
১৬· লেখনীর মাধ্যমে গীবতঃ লেখনী তথা সাংবাদিকতার মাধ্যমে গীবত করা হয়। যেমন, কেউ যদি কাউকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য সংবাদপত্রে রিপোর্ট করে, কিংবা বইপুস্তকে অপরের দোষ-ত্রম্নটি তুলে ধরে, তাও গীবত হবে। কেননা, এর দ্বারা অপরকে ছোট করাই উদ্দেশ্য। আর ইসলাম এসব সমর্থন করে না।
১৭· প্রশাসনিক ক্ষেত্রে গীবতচর্চাঃ আমরা যারা বিভিন্ন প্রশাসনের অধীনে কাজ করি একটু লক্ষ্য করলেই দেখতে পাব প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী কমবেশি গীবত বা পরের দোষচর্চার সাথে জড়িত। কেউ ইচ্ছা করে অজ্ঞতাবশত গীবত করছি আবার কেউ অনিচ্ছায় অজ্ঞাতসারেই গীবত করছি। আমরা পরস্পর দোষ-ত্রম্নটি সহ্যই করতে পারি না। কর্মস্থল থেকে বেরিয়ে বাসায় যতক্ষণ থাকি তার প্রায় অধিকাংশ সময়ই আমরা কারো না কারো গীবত করে থাকি। আর গীবতের ব্যাপারটি এমন যে, মনে হয় এটা বলা পাপ নয়, অথবা এটা তার দায়িত্ব-কর্তব্যের একটি অপরিহার্য অংশ। সমাজে এমনও রেওয়াজ লক্ষ্য করা যায়, যে ততবেশি সহকর্মী অথবা অধস্তনদের সমালোচনা বা গীবত করতে পারেন সে তত বেশি দক্ষ দায়িত্বশীল। অথবা গীবত করতে গিয়ে আমরা নিজের কর্তব্যে অবহেলা করি, ভুলে যাই আমাদের দায়িত্ববোধের কথা। গীবত না করলে পরকালে কেউ জিজ্ঞাসিত হবে না। অথচ কেউ যদি তার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন না করে তবে অবশ্যই সে ব্যক্তি পরকালে জিজ্ঞাসিত হবেন। রাসুল (স·) বলেছেনঃ তোমরা প্রত্যেকেই প্রত্যেকের দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার কর্তব্য সম্পর্কে পরকালে জিজ্ঞাসা করা হবে। (বুখারী)।
ইসলাম শান্তির ধর্ম। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, ভালবাসা, সহানুভূতি, উদারতা ইত্যাদি শান্তিপূর্ণ জীবন যাপনের পূর্বশর্ত। আর গীবত বা পরচর্চা সংক্রামক ব্যাধির ন্যায় শান্তি-শৃংখলা বিঘ্নিত করে। তাই ঈমান আমল, দুনিয়া আখিরাত বিধ্বংসী, হিংসা-বিদ্বেষ ও অশান্তি সৃষ্টিকারী জঘন্যতম অপরাধ গীবত ও পরনিন্দা থেকে বেঁচে থাকা আমাদের কর্তব্য। গীবতের মধ্যে কোন প্রতিরোধকারী না থাকায় নীচ থেকে নীচতর ব্যক্তি কোন উচ্চতর ব্যক্তির গীবত অনায়াসে করতে পারে। প্রতিরোধ না থাকার কারণে এর ধারা সাধারণত দীর্ঘ হয়ে থাকে এবং এতে মানুষ লিপ্তও হয় বেশি। গীবত করার সময় যদি প্রতিরোধ না করা যায় অন্তত শ্রবণ করা থেকে বিরত থাকা জরুরি। কেননা ইচ্ছাকৃতভাবে গীবত শোনাও নিজে গীবত করার মতই অপরাধ। অতএব, আমরা নিন্দনীয় স্বভাব গীবতচর্চা থেকে দূরে থাকব। সম্ভব না হলে অন্তত কারো গীবতে কর্ণপাত করবো না- এটাই প্রত্যাশা।
***************************
লেখকঃ ড· মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম খান আলমারূফ
দৈনিক ইত্তেফাক, ১৪ ডিসেম্বর ২০০৭