- Home
- ঈদ উৎসব
- ঈদ-উল-আযহা
- কোরবানির শিক্ষা
কোরবানির শিক্ষা
- By Article Poster
- Published 12/15/2007
- ঈদ-উল-আযহা
- Unrated
আরবি ‘কুরব’ ধাতু থেকে এসেছে কোরবান শব্দটি। ‘কুরব’ অর্থ নৈকট্য। ‘কুরবুন’ বা কোরবানি অর্থ আত্মত্যাগ, উৎসর্গ বা বিসর্জন ইত্যাদি। শরিয়তের পরিভাষায় আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে মহান আল্লাহর নামে কোন কিছু উৎসর্গ করার নাম কোরবানি। প্রচলিত অর্থে কোরবানি হল পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে জিলহজ মাসের ১০ থেকে ১২ তারিখের মধ্যে মহান রাব্বুল আলামিনের সন্তুষ্টি লাভের জন্য নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট ব্যক্তির নির্দিষ্ট জানোয়ার জবেহ করা। আল্লাহতায়ালা ঘোষণা করেন, ‘আমি প্রত্যেক জাতির ওপর কোরবানির নিয়ম করেছি, যাতে তারা চতুষ্পদ জন্তু জবেহ করে এবং আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে’ (সূরা হাজ্জঃ আয়াত-৩৪)। ‘তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় করো এবং কোরবানি করো’ (সূরা কাওসার আয়াত-২)।
কোরবানির বিষয়টি মানব ইতিহাসের মতো অতি প্রাচীন। হযরত আদম (আ·)-এর পুত্রদ্বয় হাবিল-কাবিলের মাধ্যমে সর্বপ্রথম কোরবানির সূচনা হয়। তারপর হযরত নূহ (আ·), হযরত ইয়াকুব (আ·), হযরত মুসা (আ·) এর সময়ও কোরবানির প্রচলন ছিল। প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার বছর আগে মুসলিম জাতির জনক হযরত ইব্রাহিম (আ·) আল্লাহর প্রেমে প্রিয় পুত্রকে কোরবানি করার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে এক অবিস্মরণীয় সোনালি ইতিহাস সৃষ্টি করে গেছেন।
হযরত ইব্রাহিম (আ·) স্বপ্নে তার সবচেয়ে প্রিয় বস্তু কোরবানি দেয়ার জন্য আদিষ্ট হন। এ জন্য তিনি তিনদিনে দৈনিক ১০০ করে মোট ৩০০ উট কোরবানি করলেন; কিন্তু তা আল্লাহর দরবারে কবুল হল না। বারবারই স্বপ্নে আদেশ করা হল ‘তোমার প্রিয় বস্তু কোরবানি কর’। হযরত ইব্রাহিম (আ·) বুঝতে পারলেন, বৃদ্ধ বয়সে প্রাপ্ত একমাত্র প্রাণাধিক প্রিয় সন্তান বহু কষ্টে লালিত নয়নের মণি হযরত ইসমাইল (আ·) সেই প্রিয় বস্তু। আত্মত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত হয়ে হযরত ইব্রাহিম (আ·) এবং মা হাজেরা কোরবানির জন্য কলিজার টুকরা পুত্রকে সাজিয়ে নিলেন। কিশোর ইসমাইল (আ·) নিজের জানকে আল্লাহর রাহে বিলিয়ে দিয়ে আত্মত্যাগের বিস্ময়কর ইতিহাস স্থাপন করলেন। পবিত্র কোরআনে ওই বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। হযরত ইব্রাহিম (আ·) বললেন, বৎস! আমি স্বপ্নে দেখি যে, আমি তোমাকে জবেহ করছি, এখন তোমার অভিমত কি বল? তিনি বললেন, আব্বাজান! আপনি যে বিষয়ে আল্লাহর তরফ থেকে আদিষ্ট হয়েছেন, তা পূর্ণ করুন। ইনশাআল্লাহ আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন। যখন তারা উভয়ে আত্মসমর্পণ করলেন এবং পিতা কাত করে পুত্রকে শোয়ালেন তখন আমি তাকে ডাকলাম, ‘হে ইব্রাহিম! নিশ্চয়ই আপনি স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করে দেখিয়েছেন। আমি বিশিষ্ট বান্দাদের এরূপ পুরস্কার প্রদান করে থাকি। প্রকৃতপক্ষে এটা ছিল বড় পরীক্ষা। আর ইসমাইল (আ·) এর পরিবর্তে একটি শ্রেষ্ঠ জবেহর পশু দান করলাম।’ (সূরা সাফফাত, আয়াত ১০২ থেকে ১০৭)। ধারাল ছুরি হযরত ইসমাইল (আ·) এর একটি পশমও কাটতে পারেনি। তার পরিবর্তে আল্লাহর হুকুমে বেহেশত থেকে দুম্বা এসে হাজির হয়। হযরত ইব্রাহিম (আ·) প্রাণপ্রিয় পুত্রকে কোরবানি দেয়ার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে আল্লাহর প্রেমের গভীরতা কত তা প্রমাণ করেছেন। এটাই পৃথিবীর বুকে সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ কোরবানি। হযরত ইব্রাহিম (আ·) প্রমাণ করে দেখিয়েছেন খোদার প্রেমের সামনে নিজের অতি প্রিয় সন্তানও নগণ্য, নিজের প্রাণ, সম্পদ এবং সব প্রিয় বস্তুই তুচ্ছ। আল্লাহর আদেশ-নিষেধ পালন করতে গিয়ে সর্বস্ব ত্যাগ করা অপরিহার্য। কোরবানির এ মডেলকে চিরস্মরণীয় করার জন্যই আল্লাহপাক উম্মতে মোহাম্মদি (সা·) এর জন্য কোরবানি করাকে ওয়াজিব করে দিয়েছেন। আর এ বিধান চলবে কিয়ামত পর্যন্ত। তাই বালেগ জ্ঞানবান নিজ বাড়িতে অবস্থানকারী ব্যক্তির স্বাভাবিক সাংসারিক প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র ছাড়া ঈদুল আজহার দিন নিসাব পরিমাণ মাল থাকলে তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব।
কোরবানির মুখ্য উদ্দেশ্য তাকওয়া অর্জন করা। তাকওয়ার মাধ্যমেই মনের সন্তুষ্টি আসে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘বলো, আমার সালাত, আমার হজ ও কোরবানি, আমার জীবন ও আমার মরণ সবই বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর উদ্দেশ্যে।’ (সূরা আনআম, আয়াত ১৬২)। কোরবানি আমাদের শিক্ষা দেয় আল্লাহ প্রেমে পূর্ণ তাকওয়া (আল্লাহভীতি ও মনের একাগ্রতা) নিয়ে কোরবানি করতে হবে। লোক দেখানোর জন্য নয়। জিলহজ মাসের ১০ তারিখ মুসলিম বিশ্বের সর্বত্র এ কোরবানির উৎসব বা ইদুল আজহা শুধু প্রতীকী অনুষ্ঠান মাত্র নয়। এর প্রকৃত রূপ হল মনের গভীরে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা ও তাকওয়া নিয়ে প্রিয়বস্তু তার নামে উৎসর্গ করা। ঞড় ঝধপৎরভরপবঃড় সধশব ড়ভভৎরহমংঃড় অষষধয· আল্লাহর কাছে কোরবানির পশুর গোশত ও রক্ত কিছুই পৌঁছায় না। কোরবানির মাধ্যমে আল্লাহকে রাজি, খুশি করা, তার সন্তুষ্টি অর্জনই হল মুখ্য উদ্দেশ্য। আল্লাহ বলেন, ‘আমার কাছে এগুলোর গোশত ও রক্ত পৌঁছে না। পৌঁছে শুধু তোমাদের মনের তাকওয়া’ (সূরা হাজ্জ, আয়াত-৩৭)।
কোরবানির গোশত তিন ভাগ করে এক ভাগ নিজের, একভাগ আত্মীয়-স্বজনদের ও একভাগ গরিবদের মধ্যে বণ্টন করে দেয়া মুস্তাহাব। কোরবানির চামড়া বা তার নগদ অর্থ গরিব-দুঃখীদের দান করে দিতে হবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে আক্রান্তরা, দীন-দুঃখীরাও যাতে ঈদের আনন্দ করতে পারে সে লক্ষ্যে কেবল ভোগ নয়, ত্যাগ-তিতিক্ষার মনোভাব নিয়ে তাদের মধ্যে কোরবানির গোশত বিলিয়ে দিতে হবে এবং তাদের দান-খয়রাত করতে হবে। আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন হালাল উপার্জন, ইখলাছ এবং একনিষ্ঠতাই হল কোরবানি কবুল হওয়ার অপরিহার্য শর্ত।
কোরবানির দৃশ্য হোক খোদাপ্রেমীদের প্রেম নিবেদনের দৃশ্য। বিত্তবান ও সামর্থøবান মুসলিম নরনারীদের প্রতি একান্ত অনুরোধ, আমরা লাখ লাখ টাকার পশু ক্রয় করে যাতে লোক দেখানো কোরবানি মহড়ায় অংশগ্রহণ না করি। আমাদের আশপাশে যারা নিঃস্ব, অভাবগ্রস্ত, কোরবানি দেয়ার সামর্থø নেই, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই যেন সেসব অসহায় মানুষের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেই। মূলত এটাই হল ইব্রাহিমি শিক্ষা।
প্রকৃতপক্ষে মনুষ্যরূপী আমাদের ভেতরের পশু তথা নির্মমতা, নিষ্ঠুরতা ও বীভৎসতাকে অর্থাৎ অন্তরের মধ্যে বসবাসকারী পশুকেই কোরবানি করা এবং হিংসা-বিদ্বেষ, লোভ-লালসা, অহংকার, প্রভাব-প্রতিপত্তি বর্জন করে মানবতাবোধে উজ্জীবিত হওয়ার শিক্ষাই হল কোরবানির মহান শিক্ষা। আল্লাহর প্রেম শুধু কোরবানির দিনে সীমাবদ্ধ না রেখে সে প্রেম-ভালোবাসা তার সৃষ্টির জন্য আজীবন অব্যাহত রাখতে হবে এবং সর্বক্ষণ মনে জাগ্রত রাখতে হবে কোরবানির শিক্ষাকে। তাহলে আমাদের পৃথিবী হবে সুন্দর, শান্তিময় ও নিরাপদ।
***************************
লেখকঃ মোশারেফ হোসেন পাটওয়ারী
দৈনিক যুগান্তর, ১৪ ডিসেম্বর ২০০৭