নিজের পশুত্বকে কোরবানি করাই হল ঈদুল আজহার মৌলিক উদ্দেশ্য। উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে নিজের আমিত্ব ও পশুত্বকে কোরবানি করার বাস্তবতা আমরা তেমন একটা খুঁজে পাই না। আমরা কিভাবে প্রকৃত কোরবানিতে অংশ নিতে পারি তার ওপরই কয়েকটি প্রস্তাবনা পেশ করা হল।

পরিষ্কার নিয়তঃ নবীজীর হাদিস- ইন্নামাল আমানু বিননিয়্যাত। অর্থাৎ নিশ্চয়ই নিয়তের ওপর আমল নির্ভরশীল। নিয়ত যদি পরিষ্কার না হয় তখন আমল তথা কর্মের পরিচ্ছন্নতা অসম্ভব। আমরা সমাজে তাকালে দেখি মানুষ আল্লাহর সন্তুষ্টির বদলে মানুষের সন্তুষ্টির ওপরই বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকে। মানুষকে দেখানোর জন্যই ঋণ করে হলেও বড় জন্তু কোরবানি দেয়ার প্রবণতা সমাজে অহরহ। অবশ্যই আল্লাহর ভালোবাসা অর্জনের জন্য আমাদের নিয়তকে পরিষ্কার করতে হবে। একটি স্বচ্ছ অভিপ্রায় এনে দিতে পারে আল্লাহর প্রেম।

গোশত বণ্টনঃ ইসলাম সামাজিক বন্ধনকে সুদৃঢ় ও মজবুত করার জন্য কোরবানির গোশত বণ্টনের একটি সুন্দর প্রক্রিয়া চালু করেছে। জন্তু জবাই করে সব গোশত নিজে খেয়ে ফেললে এতে দোষের কোন কিছু নেই। তবে গরিব আত্মীয়স্বজন, হতদরিদ্র মানুষেরা খাবে কি? তাই ইসলাম পরামর্শ দিচ্ছে কোরবানির গোশত তিন ভাগ করতে হবে। এক ভাগ পরিবার পরিজনের জন্য রাখতে হবে। আর এক ভাগ আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া প্রতিবেশীদের মধ্যে বণ্টন করতে হবে। তৃতীয় ভাগ সাধারণ অসহায় মানুষের মধ্যে বণ্টন করতে হবে। ইসলাম কখনোই একাকী আনন্দের কথা বলে না। সবসময় সবাই মিলে একসঙ্গে আনন্দ উৎসবের প্রতি উৎসাহ প্রদান করে থাকে।

কোরবানির চামড়াঃ আমাদের সবুজ শ্যামল বাংলাদেশে অসহায় ও দরিদ্র মানুষের অধিকার নিয়েও যত দুর্নীতি। বন্যার রিলিফ নিয়ে যেমন দুর্নীতি করা হয় তেমনি কোবানির পশুর চামড়া নিয়েও আমরা দুর্নীতি করে থাকি। কোথাও বাধ্য হয়ে আবার কোথাও নিজের স্বেচ্ছাচারিতার কারণে এ সমস্যা দেখা দেয়। কোরবানির পশুর চামড়া জোর করে এনে মাস্তানরা হাতিয়ে নেয় বিপুল পরিমাণ অর্থ। শহরগুলোতে গভীরভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, সে পয়সা দিয়েই রাতে বসে পাড়ায় পাড়ায় মদের আড্ডা। পবিত্র ঈদের দিনের এ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বন্ধের জন্য সরকারি উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি। আর না হলে আমাদের সমাজের হতদরিদ্র মানুষগুলো কোটি কোটি টাকার এ অনুদান থেকে বঞ্চিত হতেই থাকবে।

জন্তু জবাইঃ সাধারণত গাঁয়ের কোমলমনা মানুষদের দেখি তারা কোরবানিতে একটি প্রচলিত ভুল করে থাকেন। কোরবানির পশু কাটার জন্য লোক রেখে তাদের কোরবানির গোশত দিয়ে বিদায় দেন। অবশ্যই আমাদের মনে রাখতে হবে কোরবানির গোশত দিয়ে বিনিময় হয় না। গোশত কাটার নির্ধারিত লোককে পৃথক পারিশ্রমিক দিতে হবে। অন্যথায় কোরবানি সঠিকভাবে আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্য না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

সত্যিকার অর্থে আমাদের কোরবানি আল্লাহর দরবারে গৃহীত হওয়ার জন্য কোরবানির নিয়মকানুন খুব যত্নের সঙ্গে আদায় করতে হবে। তাহলে কোরবানির মাধ্যমে আমরা অর্জন করতে পারব আল্লাহর ভালোবাসা। ত্যাগ করতে পারব পশুর স্বভাব। সুসজ্জিত হতে পারব সুমানুষে।

***************************
লেখকঃ  মাসউদুল কাদির
দৈনিক যুগান্তর, ১৪ ডিসেম্বর ২০০৭