ঈদুল আজহা। পবিত্র হজের পরবর্তী দিন। সারা মুসলিম বিশ্ব আনন্দমুখর। একাধিক কারণে ঈদ বৈশিষ্ট্যময়। এ ঈদে মুসলিম জাহান পালন করে হযরত ইব্রাহিম (আ·)-এর সুন্নাত। এ সময়ই মক্কা মোয়াজ্জমায় অনুষ্ঠিত হয় মুসলিম বিশ্ব কনফারেন্স পবিত্র হজ। এ ঈদে দুনিয়ার মানুষ নিবিড়ভাবে অনুভব করে বিশ্ব মুসলিম ভ্রাতৃত্ব।

ঈদুল আজহার অর্থ কোরবানির ত্যাগের আনন্দ-উৎসব। এই দিনে বিশ্বের মুসলমানরা আনন্দ করে, উৎসব করে। এ উৎসব কিসের? কেন এ আনন্দ?

এ আনন্দ কোরবানির আনন্দ। ত্যাগের আনন্দ, উৎসর্গ করার আনন্দ। শুধু ভোগের নয়, ত্যাগের মধ্যেও আনন্দ আছে। মা-বাবা নিজেদের বঞ্চিত রেখে, সন্তানকে খাইয়ে সাজিয়ে আনন্দ পায়। আপনজনকে উপহার দিতে ভালো লাগে। ত্যাগী মানুষেরা অপরকে দিয়েও অনাবিল আনন্দ লাভ করে। ত্যাগেও আনন্দ অনুভব করে। এ আনন্দের কোন তুলনা নেই।

কি বস্তু আল্লাহর পথে কোরবানি করলে আল্লাহ সবচেয়ে বেশি খুশি হন? সব জিনিসই তো আল্লাহর দেয়া। মানুষ যে জিনিস বেশি ভালোবাসে, তা আল্লাহর রাস্তায় কোরবানি করতে পারলে আল্লাহ সবচেয়ে খুশি হন। কিন্তু তাতে উপকৃত হয় আল্লাহর বান্দারা। কোরবানির উদ্দেশ্য তাই। তাতে ব্যক্তির, সমাজের, বিশ্বমানবের ফায়দা হয়। আল্লাহ সব প্রয়োজনের ঊর্ধ্বে। তার সব আদেশ-নিষেধের লক্ষ্য হচ্ছে তার সৃষ্টির কল্যাণ।
হযরত ইব্রাহিম (আ·)-এর জীবনে সবচেয়ে প্রিয় ছিলেন পুত্র ইসমাইল (আ·)। তার নিজের জীবনের চেয়েও প্রিয়। সন্তান ভিন্ন মানুষ বেশি ভালোবাসে নিজেকে, নিজের জীবনকে।

আল্লাহ কারও রক্ত চান না। জালিমের বিরুদ্ধে জিহাদ ভিন্ন নিজের রক্ত ঝরিয়ে কোরবানি আল্লাহ চান না। নিজ সন্তানের রক্ত তো নয়ই। কোন মানুষ তার পরম শত্রুর রক্ত ঝরাক, তাও আল্লাহ পছন্দ করেন না।
আল্লাহ চান মানুষ কোরবানি করুক তার অহংবোধকে- তার খুদিকে। যার মনে অণু-পরমাণু অহংকার আছে, সে বেহেশতে যেতে পারবে না। যে মানুষ অপর মানুষকে ঘৃণা করে, ছোট মনে করে বা নিজের থেকে বেশি পাপী মনে করে, সে পথভ্রষ্ট।

নিজের খুদিকে এমনভাবে বিসর্জন দিতে হবে, যাতে মনে হয়, আল্লাহর কাছে সেই সবচেয়ে তুচ্ছ। আল্লাহ যদি আজ ঘোষণা করেন, তিনি সব মানুষকে বেহেশতে নেবেন শুধু একজন ছাড়া, তখন ভাবতে হবে আমি সেই হতভাগ্য।

অহংবোধ ছাড়া মানুষের প্রিয় হল তার সময়, তার আরাম-আয়েশ এবং অর্থ। এগুলোর কতটুকু আমরা আল্লাহর পথে কোরবানি দিতে পারি? নিজের প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও, অন্যের চরম বিপদের দিনে যদি নিজের কাছে সম্পদ পুঞ্জীভূত রেখে দীর্ঘ সিজদায় আমরা পড়ে থাকি, আমাদের কোরবানি কতটুকু গৃহীত হবে, তাতে যথেষ্ট সন্দেহ আছে।

একদিকে কোরবানি করি- অন্যদিকে দেশে খাদ্য সমস্যা থাকা সত্ত্বেও জমি অনাবাদি রেখে দেই, দখলে চলে যাওয়ার ভয়ে কাউকে চাষ করতে দেই না। স্বার্থের কত পূজাই না আমরা করি।

গল্প-গুজব, পরচর্চা, অপ্রয়োজনীয় বিশ্রাম, আরাম-আয়েশে আমাদের কত সময় অপচয় হয়? কোরবানির উদ্দেশ্য তো হল আমাদের মধ্যে ত্যাগের প্রেরণা সৃষ্টি করা। নিজের সময় মানুষের কল্যাণে, আল্লাহর বান্দার খিদমতে ব্যয় করা।

মানুষের প্রতি আল্লাহর প্রথম নির্দেশ- পাঠ করো। আল্লাহর নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন, কলম দ্বারা শিক্ষা দিয়েছেন। সপ্তাহে দুটি ঘণ্টা কি আমরা সমাজের সাক্ষরতা অর্জনে কোরবানি করতে পারি না?

পিতা ইব্রাহিম (আ·) পুত্রের সারাটি জীবন কোরবানি করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আমরা কি সপ্তাহে দুটি ঘণ্টা বিনা পরিশ্রমে কি রোগী দেখতে বা আমাদের অর্জিত বিদ্যা দিয়ে সমাজের উপকার করতে প্রস্তুত আছি? যদি তাতে আমরা প্রস্তুত না থাকি, তাহলে হযরত ইব্রাহিম (আ·)-এর জীবন নাটকের ব্যর্থ অভিনয় করে লাভ কতটুকু।

আমাদের অনেকের জন্যই পশু কোরবানি নিছক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ভিন্ন কিছু নয়। এটা যেন একটা রেওয়াজ, এটা রুসুম মাত্র, যা না করলে সামাজিক মর্যাদা হানি হয়।

ঈদুল আজহার দিনে পশু কোরবানির তাৎপর্য কি? হযরত ইব্রাহিম (আ·) জানতেন তিনি তার প্রিয় পুত্রের গলায় ছুরি চালাচ্ছেন। কিন্তু আল্লাহর কুদরতে সেখানে স্থাপিত হল একটি দুম্বা। এ দুম্বা কোরবানি হল আল্লাহর রাস্তায়, নিজের জান কোরবানির প্রতীক।

কোরবানির প্রতীক পশু হল কেন? সমপরিমাণ টাকা দরিদ্রের মাঝে বিতরণ করলে কি কোরবানি হয় না? না, তা হয় না।

আল্লাহ মানুষকে দুটি বিপরীতধর্মী বৈশিষ্ট্য দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। সেগুলো হল রাব্বানিয়াত বা নফসানিয়াত এবং পশুত্ব। মানুষের মধ্যে ‘র‌্যাশন্যালিটি’ এবং ‘এনিম্যালিটি’ দুটিই আছে। ঘুষের টাকা দিয়ে কৈ মাছ, খাসির গোশত, আঙুর, আইসক্রিম খেতে ইচ্ছা হয়। দুর্নীতিলব্ধ অর্থে বনানী-গুলশানে আবাসিক এলাকায় বাড়ি বানাতে শখ হয়।

ভেতরের পশুটি আরও কত কি চায়। পশু জবাই করার মাধ্যমে কোরবানির ঈদ হল মানব স্বভাবের এই পশুত্বকে, স্বার্থসর্বস্বতাকে, নফসানিয়াতকে হত্যা করার ঈদ।

পশু যে কাজ করে না, মানুষ তাও করে থাকে। মানব স্বভাবের এই পশুত্বকে, নফসে আম্মারাকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য পশু কোরবানির যে উদ্দেশ্য তা আমাদের অনেকের সাধিত হয় না।

আল্লাহ তো স্পষ্টই বলে দিয়েছেন, কোরবানির পশুর গোশত এবং এর রক্ত তার কাছে পৌঁছে না, পৌঁছে শুধু মানুষের তাকওয়া, তার নিয়ত।

কোরবানি তখনই মনে করতে হবে সার্থক যখন কোরবানির অনুষ্ঠান স্বভাবকে সংযত করে। হৃদয়ের সত্যের জন্য, ন্যায়ের জন্য, জানমাল ত্যাগের স্পৃহা জাগ্রত করে আর জীবনকে করে তোলে মহত্বর ও সুন্দরতর।

ঈদুল আজহা হযরত ইব্রাহিম (আ·), বিবি হাজেরা ও হযরত ইসমাইলের পরম ত্যাগের স্মৃতি উৎসব। হযরত ইব্রাহিমকে (আ·) আল কোরআনে মুসলিম জাতির পিতা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ পরিবারটি বিশ্ব মুসলিমের জন্য ত্যাগের মহত্তম আদর্শ।

এ পরিবারে পিতা-পুত্র, স্বামী-স্ত্রীতে ভিন্ন মত, ভিন্ন চিন্তাধারা বা ভাবের দ্বন্দ্ব নেই। ব্যাপারটি সামান্য বিষয় নয়। একমাত্র সন্তানকে জবাই করে দেয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নেও। স্ত্রী স্বামীর এবং পুত্র পিতার বিরুদ্ধাচরণ করেন না।

মুসলিম সমাজের অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, পিতা-পুত্র, স্বামী-স্ত্রী, মা-মেয়ে ভিন্ন ভিন্ন আদর্শ মেনে চলছে। তারা কোন একক মজবুত আদর্শের রজ্জু ধরে চলে না। পরিণামে তাদের পারিবারিক জীবনে নেমে আসে অশান্তি, দুঃখ, গ্লানি। পবিত্র হজ এবং ঈদুল আজহার দিনে কামনা করি মুসলিম পরিবারে প্রতিটি সদস্যের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হোক মৌলিক চিন্তাধারা ও দৃষ্টিভঙ্গির মিল এবং সমম্বয়, নেমে আসুক সুখ ও শান্তির কল্যাণধারা।

**************************
লেখকঃ  এজেডএম শামসুল আলম
দৈনিক যুগান্তর, ২০ ডিসেম্বর ২০০৭