কোরবানি শব্দটি কোরআনে নেই। কোরআনে ব্যবহৃত শব্দটি হল জবেহ। জবেহ অর্থ উৎসর্গ করা, পবিত্র করা, শুদ্ধি করা। মানবদেহ সব পাপের উৎসভূমি। এর ভেতর ও বাইরে রয়েছে পাপ সংঘটিত হওয়ার সব উপাদান। এসব উপাদানে দেহের মধ্যে আপাত মধুর মোহ সৃষ্টি করে। মোহ হচ্ছে শিরক। আর সব পাপের জননী শিরক। গায়রুল্লাহের সঙ্গে মানব দেহের নয়, মনের অংশীবাদকে (সম্পৃক্ততা) বলে শিরক। শিরক মানুষের আপন মন কর্তৃক রচিত এক ব্যাপক ও সূক্ষ্ম অপরাধ। এজন্য এটা গুরুতর অপরাধ। ‘নিশ্চয় আল্লাহ তাহার সঙ্গে শিরককারীকে ক্ষমা করেন না এবং ক্ষমা করেন উহার বিপরীত ইচ্ছা যে করে বিরামভাবে এবং যে কেউ আল্লাহর সঙ্গে শিরক করে সে বিভ্রান্ত হয় বিভ্রান্তির একটা দূরবর্তী অবস্থায়।’ (সূরা নিসা, আয়াতঃ ১১৬)

কোরআনে শিরক মনকে মোশরেক বলা হয়েছে। মোশরেকের মন শিরক ত্যাগ করলে সেখানে তাওহিদ প্রতিষ্ঠা পায়।

মোশরেকের মন শিরকশূন্য করার সর্বোত্তম পদ্ধতি হল ‘কোরবানি’। এ পদ্ধতি দ্বারা মানব মনে গ্রোথিত শিরকের সব বিষয়বস্তুর মূলোৎপাটন করে দেহকে শুদ্ধ করা হয়। শুদ্ধ মন বা নাফস আল্লাহর আদর্শ। আদর্শের মধ্যে আল্লাহর আদেশ-নির্দেশ পূর্ণভাবে কার্যকরী হয়ে থাকে। কোরআনে বলা হয়েছে- মোমিনের কলবগুলো আল্লাহর আদর্শ। সুতরাং মোমিন হওয়ার কার্যকরী ও পরীক্ষিত উপায় হল কোরবানি। অর্থাৎ এটি মোমিনের একটি সাধনা পদ্ধতি। এ প্রসঙ্গে আরও একটি বিষয়ের ওপর আলোকপাত করা যথার্থ মনে করছি। তা হল কোরআনে তিনটি চরিত্র বারবার উপস্থাপিত হয়েছে। মুসলিম, আমানু ও মোমিন। কোন একজন নবী কর্তৃক প্রচারিত রীতিনীতিকে স্বীকার করে তার কাছে আল্লাহর উদ্দেশ্যে আত্মসমপর্ণ করলে তাকে বলা হয় মুসলিম অর্থাৎ আত্মসমর্পণকারী। এরপর মোমিন হওয়ার জন্য ইমানের কাজ করতে থাকলে তাকে বলা হয় আমানু। আমানু মানে ইমানচর্চাকারী। কোরআনের সব আদেশ-নির্দেশ আমানুকে দেয়া হয়েছে। আমানুর ইমান চর্চা সম্পূর্ণ হলে তিনি হন মোমিন। মোমিন নবীর প্রকৃত প্রতিনিধি। কোরআনে মোমিনকে উদ্দেশ্য করে একটি নির্দেশও দেয়া হয়নি। কেননা তিনি নির্দেশের ঊর্ধ্বে থেকে আপন সত্তার দায়িত্ব পালন করে থাকেন।
পবিত্র কোরআনে মানবদেহকে রূপকার্থে পশু বলা হয়েছে। কোরআনের ষষ্ঠ সূরার শিরোনাম- ‘আন আম’। এর অর্থ গৃহপালিত পশু। মানবিক গুণাবলী ব্যতীত মানবদেহ আর বন্য পশুতে কোন প্রভেদ নেই। মানুষই একমাত্র জীব যে তার বন্যজীবন পরিত্যাগ করে সর্ব প্রথম গৃহবাসী হয়েছে। একথা সমাজ বিজ্ঞানী দ্বারাও স্বীকৃত।

পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে-
‘নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে মন্দ (সেসব) পশু যারা কাফের, যেহেতু তারা ইমানের কাজ করে না।’ (সূরা-আনফাল, আয়াত-৫৫)

এই আয়াতে পশু শব্দের ওপর দীর্ঘ বর্ণনা রয়েছে; যা মানুষের অবিরাম পশুত্বের ইঙ্গিত করে। এ অবিরাম পশুত্ব যিনি ত্যাগ (কোরবানি) করতে পেরেছেন তিনি ইনসান। ইনসান মানে বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন জীব। মানুষ এবং পশু তাদের অবিরাম পশুত্ব দ্বারা একই পর্যায়ভুক্ত হয়ে রয়েছে। দুয়ের মধ্যে পার্থক্য এই যে, মানুষ ইমানের সঙ্গে সালাত কর্ম করে, জাকাত ও হজ সম্পাদন করে, কোরবানি সম্পন্নকরত মোমিন হতে পারে- অন্যরা তা পারে না। ফলে তাদের পশুত্বের কোন মুক্তি নেই। কোরআনে অন্যত্র বলা হয়েছে-
‘এবং নিশ্চয়ই আমরা জিন এবং ইনসান হতে অধিক বৃদ্ধি সাধন করি জাহান্নামের জন্য। তাহাদের জন্য রহিয়াছে হৃদয়; কিন্তু উহা দ্বারা হৃদয়ঙ্গম করে না এবং তাহাদেরও জন্য রহিয়াছে চক্ষু; কিন্তু উহা দ্বারা দেখে না এবং তাহাদের জন্য রহিয়াছে কর্ণ; কিন্তু উহা দ্বারা শোনে না। এই শ্রেণীর লোকেরা পশুর মতো, বরং তারা ভ্রান্ত। এরাই তারা যারা গাফেল।’ (সূরা-আরাফ, আয়াত-১৭৯)

এই আয়াতে লোক শব্দটির ওপর দীর্ঘ বর্ণনা রয়েছে। অর্থাৎ সুস্পষ্টভাবে ধর্ম বিষয়ে উদাসীন ব্যক্তিবর্গকে পশু বলা হয়েছে। ‘আল আন আম’- অর্থ বিশেষ প্রকার গৃহপালিত পশু। মানুষ ব্যতীত অন্য কোন প্রকার জীব বা পশু আল্লাহর উদ্দেশ্যে কোরবানি হওয়ার যোগ্যতা রাখে না।

নফস বা মানবাত্মাকে শুদ্ধ করে দেহকে আল্লাহর উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করতে পারে। আল্লাহ তার কাছে উপসর্গকৃত পশুর রক্ত-মাংস গ্রহণ করেন না। এখানে রক্ত হচ্ছে দেহের শক্তির প্রতীক আর মাংস হচ্ছে দেহের গাঠনিক সৌন্দর্য। তার কাছে গ্রহণযোগ্য উপাদান হচ্ছে- তাকওয়া। অর্থাৎ মনের শুদ্ধিভাব।

‘মানব-পশুত্ব বর্জনের একটি ব্যবস্থা বা সাধনা পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে (তা হলঃ কোরবানি) এবং পাশবিকতা বর্জন শেষে দেহে যা কিছু প্রতিষ্ঠিত হয় (মানবীয় গুণাবলী) তা আল্লাহর অসীম রেজেক। সৃষ্টিময় আল্লাহর গুণাবলী নিজ আয়ত্তে আনাই হল আল্লাহর রেজেক’। সৃষ্টিকুলের মধ্যে মানবদেহ হচ্ছে আল্লাহর আশ্রয়। স্রষ্টার এই আশ্রয়কেন্দ্রে তার নামের গুণাবলী ছাড়া আর কোন কিছু অবস্থান নিতে পারে না। এবং তা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্যও নয়। তিনি কোরআনে বলেন- ‘নিশ্চয় অসীম পশুত্ব আল্লাহ্‌র কাছে মন্দ যারা বুদ্ধি খাটায় না, বধির, মূক (হয়ে থাকে)’ (সূরা-আনফাল, আয়াত-২২)

এই বাক্যে পশু শব্দের ওপর দীর্ঘ বর্ণনা বিদ্যমান। কোরআনে যে পশু শব্দ দ্বারা মানবদেহ ইঙ্গিত করা হয়েছে তার ওপর দীর্ঘ বর্ণনা রয়েছে। কিন্তু গরু-ছাগল, মেষ, ভেড়া ইত্যাদি বোঝাতে পশু শব্দটির ওপর দীর্ঘ বর্ণনা নেই।
পবিত্র কোরআনে দুই জায়গায় কোরবানির কথা বলা আছে। এক· হযরত মুসা (আ·) প্রসঙ্গে (সূরা বাকারা-আয়াতঃ ৬৭-৭১), দুই· হযরত ইব্রাহিম (আ·) প্রসঙ্গে (সূরা সাফ্‌ফাত-আয়াতঃ ১০০-১০৮)।

আমাদেরকে হযরত ইব্রাহিম (আ·)-এর ধর্মাদর্শ অনুসরণ করতে বলা হয়েছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে- প্রায় চার হাজার বছর আগের একটি ঐতিহাসিক ঘটনায় আধুনিক সাহিত্যের অনবদ্য উপাদান রৎড়হু-র সন্নিবেশ থাকা। সাহিত্য ও চলচ্চিত্র শিল্পে রৎড়হু-র ভূমিকা অপরিসীম। এই দুই শিল্প মাধ্যমে যত বেশি রৎড়হু উপাদান থাকবে তত তা উচ্চমার্গের শিল্প হিসেবে বিবেচিত হবে। হযরত ইব্রাহিম ও হযরত ইসমাইল (আ·)-এর কোরবানির ঘটনাটি শিল্পিত রৎড়হু-র অনন্য উদাহরণ হিসেবে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ হিসেবে বিবেচিত হতে বাধ্য। এখানে আমরা দেখি পিতা তার প্রিয় সন্তানকে আল্লাহর উদ্দেশ্যে কোরবানি করতে উদ্যত হন। পিতা কতৃêক পুত্রকে জবেহ প্রক্রিয়ায় পরবর্তীতে কি ঘটতে যাচ্ছে তা তাদের অজানা। পুত্র আল্লাহর ইচ্ছাকে বাস্তবায়ন করতে উন্মুখ। পিতাও রাজি, কিন্তু তবুও যে সন্তান মোহ। সন্তানবাৎসল্য তো পিতৃত্বের দখলে। তা বালক ইসমইল (আ·) কি করে উপলব্ধি করবেন। কিন্তু এ কথাও ভুলে গেলে চলবে না যে, কোরবানি হচ্ছে ইব্রাহিম (আ·)-এর। ফলে ব্যক্তি ইব্রাহিম (আ·) এর মায়া-মমতা, সন্তান বাৎসল্য, এককথায় তার দেহের যে কোন জৈবিক উপাদানের মূল্য এখানে নেই। ধারালো অস্ত্র চালানো হল পুত্রের গলায়। জবেহ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হল। পুত্রের পরিবর্তে একটি পশু জবেহ হল (যদিও এই পশুর কথা কোরআনে উল্লেখ নেই)। এখানে হযরত ইসমাইল (আ·)-এর পরিবর্তে পশু জবেহ হওয়াটাই হল রৎড়হু।

সন্তান যেমন দেহ থেকে উৎপন্ন হয়, তেমনি আমাদের সব মোহও দেহজাত। দেহকে বস্তুগত বা অবস্তুগত কোন কিছুতে মোহাচ্ছন্ন রাখাটা শিরক। মোহশূন্য হওয়ার প্রক্রিয়াই কোরবানি। সাধক আমানু দেহের মোহকে সন্তানের মতোই লালন-পালন করেন। কিন্তু মোমিন হতে চাইলে দেহের মোহকে জবেহ করে দেহকে মোহশূন্য করতে হবে।


**************************
লেখকঃ  মোহাম্মদ জাকির হোসেন
দৈনিক যুগান্তর, ২০ ডিসেম্বর ২০০৭