- Home
- সমাজ ও রাষ্ট্র
- হিজরি নববর্ষঃ মুসলিম ঐতিহ্য
হিজরি নববর্ষঃ মুসলিম ঐতিহ্য
- By Article Poster
- Published 01/10/2008
- সমাজ ও রাষ্ট্র
-
Rating:




অতিসম্প্রতি পেরিয়ে এলাম থার্টিফাষ্ট নাইট বা ইংরেজি নববর্ষের আগমনী ক্ষণটি। স্বাভাবিক কারণেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরাপত্তা বেষ্টনীতে রাজধানী ঢাকা শহর ছিল অনেকটাই অবরুদ্ধ। যে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা বা পরিস্হিতির প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা সরকারের জন্য একটি অতীব জরুরি পদক্ষেপ। অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে প্রয়োজন অতিরিক্ত কড়াকড়িও বাঞ্ছনীয় বরং প্রশংসনীয়ও বটে।
প্রতি ইংরেজি বা খ্রিষ্টীয় নববর্ষের সুচনালগ্নটিকে বরণ করে নিতে, তাকে স্বাগত জানাতে বিশেষত নাগরিক জীবনে হুড়োহুড়ি লেগে যায়। নানা উৎসব আনন্দে মেতে ওঠে নগরবাসী। পুরনো ঢাকার পটকা আর নতুন ঢাকার উন্মাদনা মধ্য রাতের নির্জনতাকে খানখান করে দেয়।
বাংলা নববর্ষের সুচনালগ্ন পয়লা বৈশাখ। বাঙালি সংস্কৃতির একটি অনন্য দিন। রমনার বটমুলে আসর জমিয়ে চলে গান, কবিতা আবৃত্তি, নাটক থিয়েটার। ইলিশ পান্তা, উল্কি আঁকা থেকে শুরু-আনন্দ বিনোদনের কোন উপকরণটি থাকে না নগরবাসীর এই মিলন মেলায়। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠন আয়োজন করে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের। দেশের প্রতিটি ঘরে বিরাজ করে উৎসবের আমেজ।
কেবল হিজরি নববর্ষই ব্যতিক্রম। একা আসে আবার একাই নীরবে চলে যায়। তাকে বরণ করতে কেউ ঢালা সাজায় না। উৎসব অনুষ্ঠানের বালাই থাকে না। ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্র কারো এ ব্যাপারে আগ্রহ বা মনোযোগ দেয়ার সময় নেই। সময়ের নিয়মে মহররম আসে আবার একই আবর্তে চলে যায়। অধিকাংশ মানুষ জানতেই পারে না কখন এলো, আবার কখন চলে গেল।
এমন তো হওয়ার কথা নয়। এটা সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান অধ্যুষিত বাংলাদেশ। মুসলমান রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বে এ নাম শীর্ষ কাতারে। আর আরবি বা হিজরি সাল মুসলমানদের আবেগ, অনুভুতি ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান সর্বোপরি ইবাদত বন্দেগির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।
ইসলামে কোনো দিবস বা রজনীকে বাহ্যিক আয়োজনে উদযাপন করার বিধান নেই যেমন সত্য, তেমনি ইসলামের বিধান বা ধর্মীয় বিষয়কে গুরুত্বহীন বিবেচনা করার কোনো সুযোগ নেই। মনে রাখা দরকার, আরবি তারিখ ও সালের হিসাব মনে রাখা ফরজে কেফায়াহ। গুটিকয়েক লোকের কারণে হয়ত আমরা গুনাহগার হচ্ছি না, কিন্তু এর প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করলে কোনোভাবেই বাঁচতে পারব না। মুসলমান হিসেবে ধর্মীয় পরিচয়কে ঊর্ধ্বে তুলে ধরা অবশ্যই সবার ঈমানি দায়িত্ব। প্রসঙ্গত, এখানে হিজরি সালের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস তুলে ধরছি।
হিজরি সালের প্রথম প্রচলন শুরু ইসলামের দ্বিতীয় খলীফা ফারুকে আজম হজরত ওমর (রা.)-এর খেলাফতের সময়। এর আগ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয়সহ যাবতীয় চিঠি ও কাগজপত্রে সুনির্দিষ্ট কোনো তারিখ ব্যবহার হয়নি। এ সময় ইসলামী সাম্রাজ্যের ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটতে থাকলে এর প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি হতে লাগল তীব্রভাবে। এ সময় বিভিন্ন দিক থেকে এ ব্যাপারে মতামতও আসতে লাগল। কুফার গভর্নর হজরত আবু মুসা আশআরী (রা.) একবার হজরত ওমর (রা.)-এর কাছে লিখে পাঠালেন, আমিরুল মুমিনীন! আপনার পক্ষ থেকে গুরুত্বপুর্ণ রাষ্ট্রীয় অনেক চিঠিপত্র আমাদের কাছে আসে। তাতে অনেক জরুরি বিষয় থাকে। কিন্তু সেই চিঠিগুলোয় কোনো সাল তারিখের উল্লেখ থাকে না। তাতে অনেক সময় সমস্যা সৃষ্টি হয়। আমরা বুঝতে পারি না যে, পত্রটি কখন লেখা, কখন পাঠানো হলো, আমাদের কাছে পৌঁছতে কতদিন লাগল? পত্রে বর্ণিত রাষ্ট্রীয় ফরমানটি কোনদিন থেকে কার্যকর হবে? কাজেই পত্রে কোনো তারিখ উল্লেখ থাকলে ভালো হয়।
পত্রটি পেয়ে হজরত ওমর (রা.) বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করলেন। এর প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করলেন। কালবিলম্ব না করে তিনি হজরত উসমান (রা.) এবং হজরত আলী (রা.) সহ শীর্ষস্হানীয় সাহাবায়ে কেরামকে নিয়ে পরামর্শ সভায় বসলেন। এর গুরুত্ব তুলে ধরে সবার মতামত জানতে চাইলেন। সবাই খোলা মনে অভিমত ব্যক্ত করলেন। কেউ বললেন, রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্ম তারিখ থেকে সুচনা ধরে সাল-তারিখ নির্ধারণ করা হোক। কেউ বললেন, রাসুলের ইন্তেকাল থেকে শুরু ধরা হোক। কেউ বললেন, নবুওয়াত প্রাপ্তির সময় থেকে। সবাই নিজের যুক্তি তুলে ধরলেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, তৎকালীন আরবে সাল-তারিখ নির্ধারণের একটি প্রচলিত পদ্ধতি ছিল, সর্বশেষ সংগঠিত ঐতিহাসিক বা উল্লেখযোগ্য কোনো ঘটনা থেকে তারা দিন-রাতের হিসাব করত। ইসলাম আগমনের আগে তাদের হিসাবের সুচনা ছিল আসহাবে ফিলের ঘটনা। এর আগে ছিল সর্বপ্লাবি বন্যা। সেই দৃষ্টিতেই সাহাবায়ে কেরাম বড় বড় ঘটনাকে সুচনা ধরে অভিমত ব্যক্ত করলেন।
সবার কথা অত্যন্ত মনোযোগের সঙ্গে শুনে হজরত ওমর (রা.) একটি সংক্ষিপ্ত ভাষণ দিলেন। ভাষণে তিনি রাসুলের জন্ম থেকে ধরলে খ্রিষ্টানদের সাদৃশ্য হয়ে যায়, ইন্তেকাল থেকে ধরলে বিচ্ছেদের শোককে স্হায়ীভাবে ধারণ হয়ে যায়, আবার নবুওয়াত প্রাপ্তি থেকে ধরলে বিষয়টি শুধু আধ্যাত্মিক হয়ে যায় ইত্যাদি যুক্তি দিয়ে হিজরত থেকে সুচনা ধরার নতুন প্রস্তাব পেশ করলেন। তার এই যুক্তিপুর্ণ ভাষণ সবার মনঃপুত হলো। সবাই একবাক্যে তাকে সমর্থন করলেন। সিদ্ধান্ত হয়ে গেল। সুচনা হলো নতুন আরবি তারিখ হিজরি সাল।
যদিও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা থেকে মদিনা হিজরত করেছেন রবিউল আউয়াল মাসে, কিন্তু যেহেতু রাসুল (সা.)-এর প্রস্তুতি এবং অন্যান্য সাহাবায়ে কেরামের হিজরত শুরু হয়েছিল মহররম থেকে তাই হিজরি সালের প্রথম মাস ধরা হলো মহররম থেকে।
সেই হিজরি নববর্ষ সমাগত। আমরা এই নববর্ষকে খোশ আমদেদ জানাই এবং এ বর্ষের প্রতিটি মাস, প্রতিটি দিনকে সুন্দর আচরণ, সুন্দর আমল দিয়ে সমৃদ্ধ করতে প্রত্যয় গ্রহণ করি।
**************************
লেখকঃ আহলুল্লাহ ওয়াছেল
দৈনিক আমারদেশ, ০৪ জানুয়ারী ২০০৮