মহান আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ট সৃষ্টি মানুষ। মানুষের জীবনকে সহজ, সফল ও সার্থক করায় সকল উপায়-উপাদানের আয়োজন তৈরী রেখেছেন মহান আল্লাহ। আল্লাহর এ বিপুল-বিশাল অনুগ্রহ রাজিকে বলা হয় ‘নিয়ামত’। আল্লাহর নিয়ামত ভোগ-ব্যবহারে তাঁরই বিধান মানা এবং তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকাকেই ইসলামের পরিভাষায় বলা হয়- ইবাদত।


ইবাদত আরবি শব্দ। অর্থ বশ্যতা স্বীকার করা, নিঃশর্ত আত্মনিবেদন, আনুগত্য, দাসত্ব, উপাসনা করা তথা সর্বাবস্থায় আল্লাহর আদেশ নিষেধ মান্য করা ইত্যাদি। ইবাদতের মধ্যেই রয়েছে মানব সৃষ্টির সার্থকতা। আর ইবাদতের মাধ্যমেই মানুষ ইহ-পারলৌকিক শান্তি অর্জন করতে পারে।


ইসলামের ইবাদতের মূল চেতনা হল সর্বাবস্থায় আল্লাহর আনুগত্য ও বাধ্যতা স্বীকার করা, স্মরণে রাখা। এ জন্যই ইসলামের সকল আদেশ নিষেধ মান্য করা এবং আবশ্যকীয় কর্তব্য হিসেবে নামায, রোজা, হজ্ব, যাকাত ইত্যাদির আয়োজন-নিবেদন সবই ইবাদত। আল্লাহকে সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নিবেদিত সকল ভাল কাজই ইবাদত। জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে আল্লাহর আইন মান্য করা আর ইসলামী মূল্যবোধ জীবনের সর্বত্র প্রতিষ্ঠা করাই হল ইবাদত। তাই যে রোজা অন্যায় পরিত্যাগ করায় না সে রোজা আল্লাহর কাছে মূল্যহীন। যে নামায অপকর্ম অশস্নীলতা থেকে বিরত রাখে না সে নামায নিঃপ্রয়োজন ও নিঃস্প্রভ। তাই ইবাদতের অর্থ বুঝব শয়তানী কর্ম প্রতিরোধের শক্তি সঞ্চয় এবং সর্বদা আল্লাহর আনুগত্যে আত্ম-নিবেদন। এজন্যই ইবাদতের তাৎপর্য প্রসঙ্গে ইমাম বাশ্‌শার (রহঃ) বলেন- ইবাদত অর্থ হল বিনম্রতায় প্রাপ্তসীমা। অন্যদিকে ইবাদতের পূর্ণাঙ্গ সংজ্ঞা প্রসঙ্গে ইমাম বায়যাভী (রহঃ) বলেন- ‘ইবাদত মহান আল্লাহ পাকের এমন এক চিহ্ন যার মাধ্যমে বান্দা দাসত্বের পূর্ণ পরিচয় পেশ করতে পারে।, যার কতিপয়,বাহ্যিক দিক হচ্ছে নামায, রোযা, হজ্ব, যাকাত ইত্যাদি। তিনি আরো বলেন ‘ইবাদত হচ্ছে সর্বাধিক নম্রতা ও বিনয়ের মাধ্যমে আল্লাহর উপাসনা করা।


বলার অপেক্ষা রাখে না যে মহান আল্লাহর আনুগত্যের সকল প্রকার আয়োজন ও নিবেদন হল ইবাদত। আল্লাহর বিধানের আধ্যাত্মিক প্রতিফলনে একদিকে মানবিক সার্থ রক্ষা হয়, অন্যদিকে ব্যক্তির সাথে আল্লাহর সম্পর্ক স্থাপনের কল্যাণকর পথ সৃষ্টি হয়। এ বাস্তবতায় ‘ইবাদত’ মূলক উদ্দেশ্যে নিবেদিত কর্তব্যগুলোকে দু’ভাগে ভাগ করা যায়। যথা (ক) হাক্কুল্লাহ (খ) হাক্কুলই বাদ।


‘হাক্কুল’ শব্দের অর্থ সত্য, অধিকার, সার্ত্থ ইত্যাদি। মহান আল্লাহর আনুগত্যসূচক সম্পর্ক প্রকাশের জন্য মানুষের বিনগ্র আত্ম নিবেদন হল হাক্কুল্লাহ। এর মাধ্যমে আল্লাহর সাথে মানুষের ব্যক্তিগত পর্যায়ে সরাসরি সম্পর্ক স্থাপিত হয়। এ সব কিছুর উদ্দেশ্যে আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং তা একমাত্র তাঁরই জন্য সুনির্দিষ্ট। যেমন- নামায, রোযা ইত্যাদি।


এক অদ্বিতীয় সর্বশক্তিমান মহান আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসের কর্মগত প্রতিফলন নামায, রোজা। এগুলোর মধ্য দিয়ে প্রকাশ্যে আল্লাহর আনুগত্য এবং আল্লাহর বিধান সমুন্নত রাখার জন্য আত্ম সংযমের অনুশীলন হয়। আমাদের বেঁচে থাকা মরে যাওয়া সবই আল্লাহর ইস্তাধীন। তিনিই আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন আবার তাঁরই কাছে আমাদের ফিরে যেতে হবে। তাই হাক্কুল্লাহ বা আল্লাহর অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য নিবেদিত ইবাদতের মর্ম নিহিত রয়েছে নিম্নোক্ত অভিব্যক্তিতে ‘বলুন (হে রাসুল) নিশ্চয়ই আমার নামায, আমার কুরবানী, আমার বেঁচে থাকা আমার মৃত্যু সবই জগত প্রভু মহান আল্লাহর জন্য নিবেদিত। (আনআমঃ ১৬৩)


মূলতঃ হাক্কুল্লাহ বা আল্লাহর অধিকার সমুন্নত রাখার ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত দিকগুলো বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। যথা-

(ক) আল্লাহর সমূদয় বিধান যথাযথভাবে পালন করা।

(খ) আল্লাহর কর্তৃত্বের প্রতি সর্বাত্মক ও নিঃশর্ত আনুগত্য প্রকাশ।

(গ) আল্লাহর সার্বভৌম ক্ষমতাকে স্বীকার করা।

(ঘ) আল্লাহর প্রতি সর্বদা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা।

(ঙ) আল্লাহর প্রতি সর্বাবস্থায় সন্তুষ্ট থাকা।


ইবাদতের মর্মবাণী অনুধাবনের জন্য ‘হাক্কুল ইবাদ’ প্রসঙ্গে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহর বিধান অনুযায়ী একজন মানুষের প্রতি অন্যমানুষের দায়িত্ব কর্তব্য পালনকে বলা হয় ‘হাক্কুল ইবাদ’। যেমন- পিতা মাতার প্রতি সন্তানের এবং সন্তানের প্রতি প্রতিমাতার কর্তব্য। আত্মীয় স্বজনদের প্রতি দায়িত্ব পালন, প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষা, অসহায়ের সহায় হওয়া, শ্রমিক, মালিক, ছাত্র-শিক্ষক অধিকার রক্ষা ইত্যাদি। এছাড়াও ছোট-বড় পরস্পরের প্রতি কর্তব্য নাগরিক অধিকার-সার্থ, অমুসলিম নারিককের স্বাধীনতা রক্ষা, আইন মানা ইত্যাদি সবকিছু হাক্কুল ইবাদের পর্যায়ভুক্ত।


মানবাধিকার, সাম্য, নিরাপত্তা, শান্তি রক্ষায় ‘হাক্কুল ইবাদ’ এর তাৎপর্য অপরিসীম। কেননা সমাজের একাংশের ভোগবাদীরা অন্যদের ভোগান্তি সৃষ্টি করে। এজন্যই বান্দার হক নষ্টকারীকে আল্লাহ ক্ষমা করেন না, করবেন না।


হাক্কুল ইবাদ রক্ষা করা ক্ষেত্রভেদে ফরজ। হাক্কুল ইবাদ নস্টকারীর জন্য যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির বিধান রয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন- ‘ধ্বংস ও বিনাস ঐসব প্রতারকের জন্য যারা লোকদের কাছে গ্রহণের সময় পুরোপুরি এবং দেয়ার সময় দেয় কমিয়ে। (মুতাফফিফিনঃ ০১)


আমরা জানি মানবাধিকারের সকল দিক ভারসাম্যপূর্ণ এবং এতেই রয়েছে মহাকল্যাণ; বেহেশতি শান্তি। কবির ভাষায়-


দুঃখ কষ্ট যেথা নাই
পরস্পর ভাই ভাই
থাকি সেথা সবে মিলে
একটি পরান
বেহেশত তারি নাম
সুখের নিদান।

ইসলাম একটি সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে মানুষকে সামাজিক মানুষে রূপান্তর করতে প্রয়াসী। এজন্যই ইসলামের প্রতিটি সৎ ও শুভ তৎপরতা ইবাদতের আবেদনে উজ্জীবিত। আল্লাহর সন্তুষ্টি ও সাহায্য ছাড়া মু’মিন বান্দার প্রতিটি মুহূর্ত অচল। এজন্যই মু’মিন হ্নদয়ের স্বতঃস্ফূর্ত উচ্চারণ- ‘হে প্রভু! আমরা তোমারই আনুগত্য করি এবং তোমারই সাহায্য প্রত্যাশা করি। (ফাতিহাঃ ০৪)


এ সহজ উচ্চারণে বুঝা যায় আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা এবং তাঁর সাহায্য প্রাপ্তির জন্য ইবাদতের গুরুত্ব অপরিসীম। মহান আল্লাহ মানুষকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন তাঁরই ইবাদত এবং খিলাফতের জন্য। সৃষ্টির সংরক্ষণ এবং সবকিছুকে নিজের প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য মহান আল্লাহ বিশাল বিশ্বের সব আয়োজন করেছেন, যেন মানুষ তাঁর আনুগত্য করে। এজন্যই মানব সৃষ্টির উদ্দেশ্য প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন- ‘আমি জ্বীন ও মানুষকে শুধুমাত্র আমারই ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছি (যারিয়াতঃ ৫৬)


মহান আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এবং মানুষের স্বভাবের মধ্যেই আল্লাহর আনুগত্যের চেতনা দিয়েছেন। আল্লাহর বিধান মোতাবেক সকল কর্মপ্রয়াস, জীবন-জীবিকার প্রচেষ্টা সবই ইবাদত। নামায, রোজা ইত্যাদি আনুষ্ঠানিক ইবাদতের মধ্য দিয়ে তাই একদিকে ধর্মভীরুতা; অন্যদিকে কর্মমুখী তৎপরতা সৃষ্টি হয়। ধর্ম ও কর্মের পুণ্যময় পথেই চূড়ান্ত সাফল্য। আল কুরআনের ভাষায়- যখন সালাত আদায় সম্পন্ন হয় তখন ভূপৃষ্ঠে ছড়িয়ে পড়, আর আল্লাহর করুণাধারার সন্ধানে তৎপর হও এবং আল্লাহকে অতিমাত্রায় স্মরণে রাখ, যেন তোমরা সফল কাম হতে পার। (জুমআঃ ১০)


অন্যদিকে আল্লাহর অবাধ্যতা চরম অকৃতজ্ঞতা এবং ইবাদতে অস্বীকৃতি কুফরী। আল্লাহ বলেন- আল্লাহ ও রাসুলের আনুগত্য কর। আর যদি মুখ ফিরিয়ে নাও তবে জেনে রাখ আল্লাহ কাফিরদের ভালবাসেন না। (আল-ইমরানঃ ৩২)


একজন সৈনিক তার দৈনন্দিন কঠোর শ্রম ও শারীরিক অনুশীলনের মাধ্যমে যেমন শত্রম্নর মোকাবেলায় প্র‘ত থাকে তেমনি একজন মু’মিন বান্দা তাঁর প্রাত্যহিক ইবাদতের মাধ্যমে চিরশত্রম্ন শয়তানের বিরুদ্ধে লড়াই করবে শক্তি অর্জন করে। তাই ইবাদত শুধু আনুষ্ঠানিকতার নিষ্প্রাণ তৎপরতার নাম নয় বরং ইবাদত হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি ও ইহ-পারলৌকিক সাফল্যের জন্য সার্বক্ষণিক সংকল্প ও সাধনা।


বস্ততঃ ইসলামী জীবনবোধের পরিপূর্ণ অনুশীলন হল ইবাদত। আল্লাহর আদেশ মোতাবেক সাম্য-সম্প্রীতির সকল আয়োজন যখন সুসম্পন্ন হয় তখনই জীবনে আসে চরম সাফল্য আর পরম প্রাপ্তির নিশ্চয়তা। এজন্যই সব মানুষ আর সকল মুসলমানের প্রতি মহান আল্লাহর সুস্পষ্ট আহবান-তোমরা ইসলামে পরিপূর্ণরূপে প্রবেশ কর। (বাকারাঃ ২০৮)


**************************
অধ্যাপক মোঃ আলী এরশাদ হোসেন আজাদ
দৈনিক ইত্তেফাক, ০৪ জানুয়ারী ২০০৮