Islamic Article Archive - http://articles.ourislam.org
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ওলামায়ে কেরামের ভুমিকা
http://articles.ourislam.org/articles/73/1/aaaaaaaaaa-aaaaaaaaa-aaaaaaa-aaaaaaa-aaaaaa--/Page1.html
Article Poster
 
By Article Poster
Published on 02/21/2008
 
আমাদের এখানে যারা এখন বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিবিদ হিসেবে বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়ে বলেছেন, তারা নিশ্চয়ই স্বীকার করবেন যে, আমাদের রাজনীতির ইতিহাস সুপ্রাচীন। যদি ১৭৫৭ সাল থেকে এখানকার রাজনীতির ইতিহাসকে মুল্যায়ন করার চেষ্টা করেন, তাহলে ন্যায় বিচার হবে না। ১৯৪৭ ও ১৯৫২ তো নয়ই। আমাদের রাজনীতির ইতিহাস মুল্যায়ন করার জন্য একাদশ শতাব্দী বা তারও আগে এবং পর থেকে পর্যালোচনায় আনতে হবে। তাহলে বোধ করি যথাযথভাবে পরখ করা যাবে যে, এ দেশের আলেম-ওলামা ও পীর-মাশায়েখরা হঠাৎ করে রাজনীতিতে উড়ে এসে জুড়ে বসেননি। তারা নিজেদের জীবন, যৌবন ও তাজা প্রাণ উজাড় করে দিয়ে দেশমাতৃকার স্বাধীনতা অর্জনের জন্য সংগ্রাম করেছেন। ভারত উপমহাদেশে রাজনীতির ঢেউগুলোর প্রতিটির জন্য আলেমদের ভুমিকা বা নাম এমনভাবে জড়িত যে, তাদের বাদ দিয়ে ইতিহাস রচনা করতে কেউ যদি উদ্যোগী হন, তাহলে মিথ্যা ইতিহাস রচনা করবেন।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ওলামায়ে কেরামের ভুমিকা

সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক এস.এম.এ ফায়েজ একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বলেন, ‘বাংলাদেশের আলেমদের গুরুত্বপুর্ণ ভুমিকা রয়েছে।’ ওই অনুষ্ঠানে দেশের জাতীয় গুণীজন শিক্ষাবিদ ও শীর্ষস্হানীয় ওলামায়ে কেরাম উপস্হিত ছিলেন। তিনি এ বক্তব্য এমন এক সময় রাখলেন, যখন দেশে একটি মহল ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করার জন্য নানাভাবে বক্তৃতা ও বিবৃতি এবং তথাকথিত মিডিয়ায় নানা অনুষ্ঠান করে যাচ্ছে। সে জন্য তার এ বক্তৃতার খবর পত্রিকায় পড়ে আমি এ বিষয়ে লেখার লোভ সামলাতে পারলাম না। কারণ তার কথাটি এত যুক্তিযুক্ত ও ঐতিহাসিক কষ্টিপাথরে যাচাই করা সত্য যে, এ ধরনের একটি বক্তব্য দিয়ে জাতিকে একটি সত্যের পথে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন, যা অবশ্যই দেশ ও জাতির কল্যাণে নিবেদিত হতে বাধ্য।

আমাদের এখানে যারা এখন বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিবিদ হিসেবে বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়ে বলেছেন, তারা নিশ্চয়ই স্বীকার করবেন যে, আমাদের রাজনীতির ইতিহাস সুপ্রাচীন। যদি ১৭৫৭ সাল থেকে এখানকার রাজনীতির ইতিহাসকে মুল্যায়ন করার চেষ্টা করেন, তাহলে ন্যায় বিচার হবে না। ১৯৪৭ ও ১৯৫২ তো নয়ই। আমাদের রাজনীতির ইতিহাস মুল্যায়ন করার জন্য একাদশ শতাব্দী বা তারও আগে এবং পর থেকে পর্যালোচনায় আনতে হবে। তাহলে বোধ করি যথাযথভাবে পরখ করা যাবে যে, এ দেশের আলেম-ওলামা ও পীর-মাশায়েখরা হঠাৎ করে রাজনীতিতে উড়ে এসে জুড়ে বসেননি। তারা নিজেদের জীবন, যৌবন ও তাজা প্রাণ উজাড় করে দিয়ে দেশমাতৃকার স্বাধীনতা অর্জনের জন্য সংগ্রাম করেছেন। ভারত উপমহাদেশে রাজনীতির ঢেউগুলোর প্রতিটির জন্য আলেমদের ভুমিকা বা নাম এমনভাবে জড়িত যে, তাদের বাদ দিয়ে ইতিহাস রচনা করতে কেউ যদি উদ্যোগী হন, তাহলে মিথ্যা ইতিহাস রচনা করবেন। সঠিক বিবেচনা ও ন্যায়ানুগ ইতিহাস রচনা করতে পারবেন না। আমি এখানে তার কিঞ্চিত ধারণা দেয়ার চেষ্টা করছি মাত্র।

১২০৩ খ্রিষ্টাব্দে মুসলিম বিজেতা ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজি বঙ্গ বিজয়ের মাধ্যমে এ দেশে প্রথম যে কাজটি করেন, সেটি ছিল মসজিদ নির্মাণের পাশাপাশি বহু মাদ্রাসা নির্মাণকরণ। তার শাসনামলে বাগদাদ ও কর্ডোভার অনুকরণে দিল্লি, মাদ্রাজ, সোনারগাঁ এবং ঢাকাসহ অপরাপর এলাকায় উচ্চ শিক্ষার জন্য মাদ্রাসা তৈরি হয়। অর্থাৎ তার রাজনৈতিক দর্শনের মুলেই ছিল ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার মাধ্যমে যোগ্য নাগরিক তৈরি করে রাজ্য পরিচালনা করা। ফলে তার রাজনৈতিক কর্মকান্ডে ও রাজ্য পরিচালনায় ইসলামী শিক্ষা অঙ্গাঙ্গিভাবে সম্পৃক্ত হয়ে যায়।

আমরা যদি এ অঞ্চলের প্রাচীন ইতিহাস খোঁজ করি, তাহলে দেখি সিন্ধু রাজা দাহিরকে পরাজিত করে মুহাম্মদ বিন কাশিম সিন্ধু বিজয় করার পর ইসলামী শিক্ষাকে তিনি মুসলিম ভারতের প্রধান ও মুখ্য শিক্ষায় পরিণত করেন। গজনীর সুলতান মাহমুদ (১০০০-১০২৬) যে শিক্ষা ব্যবস্হা রূপায়িত করেছিলেন, তাতে মাদ্রাসা শিক্ষার মাদ্যমে শিল্পী, সাহিত্যিক, দার্শনিক, বিজ্ঞানী, ঐতিহাসিক ও ভুতত্ত্ববিদ তৈরি হওয়ার সুযোগ ছিল। মহাকবি ফেরদৌসীর কালজয়ী সৃষ্টি কাব্যগ্রন্হ ‘শাহনামা’ তার সময়ের অমর কীর্তি। জানা যায়, সুলতান মহাকবিকে এই কাব্য রচনার জন্য ষাট হাজার স্বর্ণ মুদ্রা আগেই অনুদান হিসেবে প্রদান করেছিলেন। দার্শনিক আল বিরুনীকে তিনি তার রাজ্যে পুনর্বাসিত করেন। তিনিই প্রথম গজনীতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। সুলতানি আমলের সুলতানদের অধিকাংশই ইসলামী শিক্ষাকে আরো উন্নত ও যুৎসই করার জন্য অবদান রাখেন। সুলতান মুহাম্মদ ঘোরি ও ইলতুতমিশ তাদের অন্যতম ছিলেন। মোগল আমলেও ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্হা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ধন্য হয়। মোগল আমলের প্রথম বাদশা জহির উদ্দীন বাবর (১৫২৬-৩০) একজন সুপন্ডিত ও ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তি ছিলেন। গ্রন্হ রচনা ও বিষয় বিন্যাসে তার অবদান ছিল বিশাল। এত বড় মাপের শাসক হয়েও তিনি শিক্ষা বিস্তারে যে অবদান রেখেছেন তার পুরোটাই ছিল ইসলামী শিক্ষাকেন্দ্রিক। বাদশা হুমায়ুন (১৫৫৫-১৫৫৬ খ্রিঃ) যিনি অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে বিশেষভাবে গণিত ও জ্যোতির্বিদ্যায় পারদর্শী ছিলেন। ইসলামী শিক্ষাকে কেন্দ্র করে তিনি বহু নতুন নতুন বিষয়কে শিক্ষা ক্ষেত্রে সংযোজন করেন। এরপর শের শাহ মোগল আমলের মাত্র পাঁচ বছরের (১৫৪০-১৫৪৫ খ্রিঃ) শাসক ছিলেন। তার শেরশাহী মাদ্রাসা জগতজোড়া খ্যাতি লাভ করে। সম্রাট আকবর, যিনি মোগল আমলের আলোড়ন সৃষ্টিকারী শাসক (১৫৫৬-১৬০৫)। দীর্ঘ সময় শাসনকার্য পরিচালনায় তার কার্যক্রম নিয়ে বিতর্ক থাকলেও এ কথা সবাই স্বীকার করেন, তিনি বহু প্রতিভার অধিকারী ও শিক্ষা ক্ষেত্রে একজন প্রকৃত পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তিনিও ইসলামী শিক্ষার উন্নয়নে ব্যাপক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।

ঐতিহাসিকদের তথ্যমতে, এই সব মনীষী ইসলামী এবং সাধারণ শিক্ষার পৃষ্ঠপোষক যে অবদান রেখেছিলেন তার ফলে পুরো ভারত উপমহাদেশে কয়েক লাখ মাদ্রাসা বিদ্যমান ছিল। একমাত্র আজকের বাংলাদেশ ভুখন্ডেই ৮০ হাজার মাদ্রাসা বিদ্যমান ছিল বলে জানা যায়। সপ্তদশ ও অষ্টাদশ খ্রিষ্টাব্দের দিকে ইংরেজরা মাদ্রাসা শিক্ষাকে বিলীন করে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু হাজার বছর ধরে যা এ এলাকার মানুষের মন-মগজ এমনকি পরিবেশের সঙ্গে মিশে গেছে তা শেষ করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। দেওবন্দ আন্দোলন, আজাদী আন্দোলন ও স্বাধিকার আন্দোলনের কোনোটাতেই মাদ্রাসা শিক্ষিতরা পিছপা ছিলেন না। ইংরেজরা বহু মাদ্রাসা ও মসজিদের ওয়াকফ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি আকারে নিলামে উঠিয়ে নামমাত্র মুল্যে হিন্দুদের দিয়েছিল। এমনিভাবে বহু ধরনের দলন-নিপীড়ন চালিয়েও মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্হাকে নিঃশেষ করতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত বাস্তবতাকে উপলব্ধি করেই তারা কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে মুসলমানদের আন্দোলন প্রশমনের চেষ্টা করে।

বাংলাদেশের আজকের মানচিত্র যারা তৎকালীন পুর্ব পাকিস্তান হিসেবে আদায় করার আন্দোলনে শামিল ছিলেন, তাদের মধ্যে মাদ্রাসা শিক্ষিত আলেমদের বড় অংশ নেতৃত্বে ছিলেন। আজকের আওয়ামী লীগ এক সময়কার মুসলিম লীগ, পরে আওয়ামী মুসলিম হিসেবে আন্দোলনের সেই ঐতিহাসিক দিনগুলোতেই আলেম-ওলামাদের অবদান কম ছিল না। ঐতিহাসিক শিমলা কনফারেসে (১৯৪৬) যারা অংশগ্রহণ করেন, তাদের মধ্যে এ কে ফজলুল হক, শহীদ সোহরাওয়ার্দী, খাজা নাজিমুদ্দীন, মাওলানা আতাহার আলী, মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী, মাওলানা আকরাম খাঁ প্রমুখ যোগদান করেন। এদের সঙ্গে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহসহ অন্যান্য নেতা যোগদান করে দ্বিজাতিত্বের যে ফর্মুলা পেশ করেন তার ভিত্তিতেই পাক-ভারত স্বাধীনতা লাভ করে। বৃটিশবিরোধী আন্দোলন ও পরবর্তী সময়ে পাক-ভারত আন্দোলনে এ দেশের আলেম, ইসলামী চিন্তাবিদ ও বুদ্ধিজীবীদের বিশাল অবদান ছিল। এই ঐতিহাসিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করা যায় না। আমাদের মনে রাখতে হবে আমরা ইতিহাসের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারি না। ভারত থেকে পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার পর পুর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের দুই অংশে দু’জন আলেম রাজনৈতিক সমাজের মুকুট হিসেবে পাকিস্তানের পতাকা উত্তোলন করেছিলেন। তারা ছিলেন মাওলানা জাফর আহমদ উসমানী ও মাওলানা শিব্বির আহমদ উসমানী। সুতরাং এ দেশের আলেমদের ভুমিকা রাজনীতিতে শতভাগ নির্ধারিত। আর আলেম-ওলামাদের রাজনীতি ইসলামী চিন্তা-চেতনা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে-এটিই স্বাভাবিক। সুতরাং যারা ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবি তুলছেন, তাদের এটি বুঝতে হবে আলেম-ওলামাদের রাজনীতি যেহেতু এখানে অবশ্যম্ভাবী, সেহেতু ধর্মভিত্তিক তথা ইসলামী রাজনীতিও এখানে অবশ্যম্ভাবী। সুতরাং তাদের এ দাবি হাস্যকর ও অনভিপ্রেত।


**************************
ড. আ. ই. ম নেছার উদ্দিন       
লেখকঃ গবেষক, সম্পাদক, মাসিক চিন্তাভাবনা
দৈনিক আমারদেশ, ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০০৮