- Home
- জীবন ও কর্ম
- স্মরণীয় ব্যাক্তিত্ব
- হুব ফিল্লাহহুব ফিল্লাহহুব ফিল্লাহঃ খতিব উবায়দুল হকের স্মৃতিঃ সটান মিনারের কাঠামো
হুব ফিল্লাহহুব ফিল্লাহহুব ফিল্লাহঃ খতিব উবায়দুল হকের স্মৃতিঃ সটান মিনারের কাঠামো
- By Article Poster
- Published 02/21/2008
- স্মরণীয় ব্যাক্তিত্ব
- Unrated
অনেক বড় মানুষদের কাহিনী বইপত্রে কিছু পড়েছি। অবুঝ বয়সে অনেক বড় মাপের ক’জন মানুষকে দেখারও সুযোগ হয়েছে। সাধারণ বুঝবুদ্ধির দুয়ার খোলার পর যে ক’জন বড় মাপের মানুষকে দেখে শ্রদ্ধা ও পুলকের স্বাদ পেয়েছি তাদের অন্যতম ছিলেন তিনি। জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মাওলানা উবায়দুল হক। লেখা উচিত ‘সাবেক খতিব’। কিন্তু ‘সাবেক’ শব্দটি মুখে আসতে চায় না। বয়স হয়েছিল তাঁর। তারপরও চলমান, স্পষ্টবাক ও সদাসক্রিয় এই মানুষটিকে হঠাৎ করেই আমরা হারিয়ে ফেলবো, তাঁর নামের সঙ্গে ‘খতিব’ না লিখে ‘সাবেক খতিব’ লিখতে বাধ্য হবো এবং এতো তাড়াতাড়ি, মনটা মানতে চায় না।
নিঃসন্দেহে বেদনাবহ ছিল তাঁর মৃত্যু সংবাদ। স্পষ্টতই মোটাদাগের ও অপুরণীয় একটা শুন্যতার রেখা এঁকে দিয়ে ইহকাল ছেড়ে তিনি চলে গেলেন গত রমজানের শেষ দশকে। তার জায়গায় একবাক্যে এখনো কারো অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না।
দুই.
কৃতিত্বপুর্ণ ছাত্রজীবন ও সফল কর্মজীবনের বড় অংশ পাড়ি দিয়ে জাতীয় মসজিদের মেহরাবে যেদিন থেকে তিনি এসে দাঁড়ালেন তার পরের ইতিহাস ছিল আরো বর্ণাঢ্য, আরো দৃষ্টি আকর্ষক, আরো মুগ্ধকর ও প্রাণচাঞ্চল্যপুর্ণ। ওই মেহরাবকে পরিণত কর তুলেছিলেন তিনি বিবেক ও অভিভাবকত্বের এক ধারালো মসৃণ দৃঢ়তাপুর্ণ মসনদে। ধর্ম, দেশ, সমাজ, উম্মাহর প্রতিটি মনোযোগ- টানা ইস্যুতে তাঁর ক্ষোভ ও দরদের শব্দ তরঙ্গ চাবুকের মতো কিংবা মলমের মতো নির্ভীক ও নিঃশঙ্ক পদপ্রদর্শকের ভুমিকা রেখেছে। দুঃশাসকরা প্রমাদ গুনেছেন, দুরাচাররা মুখ ঢেকেছেন, তাবড় তাবড় কুটনীতিকরাও কখনো কখনো ভ্রুকুঞ্চিত করেছেন, এমনকি বিরুদ্ধবাদী মিডিয়াতেও তাকে ঘিরে মিথ্যার ফানুস ছোটানো হয়েছে। কিন্তু জলদগম্ভীর স্বরের সহসী তরঙ্গময় সেই খুৎবায় কোনো ছেদ পড়েনি। এদেশের দুই-তিন যুগের ইতিহাসে ‘জেনেশুনে বিষপান’ করার মতো ঠান্ডা মাথায় দৃঢ়তা ও ধারাবাহিকতার সঙ্গে এমন সাহসী অবস্হান গ্রহণকারী খতিবের, এমন জাতীয় অভিভাবকতুল্য আলেমেদীনের নজির সম্ভবত নেই।
প্রাজ্ঞ ও বর্ষীয়ান এই আলেমেদীনের এই বিশেষত্বটি একটি মাইলষ্টোন হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার দাবি রাখে।
তিন.
এই মহান ব্যক্তিত্বকে প্রথম দেখার সুযোগ আমার কবে কখন হয়েছিল, এখন মনে পড়ছে না। গত শতকের আশির দশকের শেষদিকেই তাকে প্রথম দেখেছি। বায়তুল মোকাররমে কিংবা ফরিদাবাদ মাদরাসায় কিংবা খতমে নবুওয়তের কোনো সভায়। কিছুটা হেলেদুলে হাঁটতে থাকা বিশাল দেহের এই বিশাল মানুষটির গায়ে প্রায় সময়ই থাকতো একটি শেরোয়ানি। এবং অনিবার্যভাবে মাঝ বরাবর ভাঁজভাঙা কিশতি টুপি তাঁর মাথায়। কখনো কখনো কাঁধের দুপাশে ঝুলানো একটি রুমাল। তাঁকে দেখলেই তাঁর অস্তিত্ব ও আয়োজন এবং আরো কিছু আল্লাহপ্রদত্ত গম্ভীর্যময় ব্যক্তিত্ব ছটার কারণে দর্শকমাত্রের মাঝেই সমীহবোধ জেগে উঠতো।
আমি তখন এক মুখচোরা কিশোর। দুর থেকে দেখা পর্যন্তই। সমীহের সঙ্গে ভীতিরও একটা ধাক্কা দুরে দুরেই ঠেলে রাখতো। এভাবেই দেখতে থাকা। বিভিন্ন মজলিসে-মাহফিলে। এরপর সম্ভবত ১৯৯৩-৯৪ সালের দিকে ‘সাপ্তাহিক মুসলিম জাহান’-এর পক্ষ থেকে একটি সাক্ষৎকার নেয়ার জন্য সরাসরি তাঁর বাসায় যাই। তখন আমি এক যুবক। তাঁর সামনে বসি। জড়সড় আমাকে অভয়-আশ্বাস ও স্মিত হাসির সঙ্গে চা-নাশতার আপ্যায়নে তিনিই সহজ করে তোলেন। যতদুর মনে পড়ে, তখন জাতীয় সংসদে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করা-না করা নিয়ে একটি বিতর্ক শুরু হয়েছিল। তখনকার বিরাধী দলের চাপে সরকারি দলের বাঘা বাঘা কোনো কোনো নেতাও ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করার পক্ষে কিছু মতামত তুলে ধরেছিলেন। সে সময় এক জুমাপুর্ব ভাষণে সম্মানিত এই খতিব ‘মুসলমানের সব কাজই ধর্মভিত্তিক হওয়া বাঞ্ছনীয়’-এ ধরনের একটি মীমাংসাকামী, সিদ্ধান্তমুলক বক্তব্য উপহার দিয়েছিলেন। এ বক্তব্যের পর ধর্ম নিয়ে এলার্জি পোষণকারী রাজনীতিক মহল ও মিডিয়াগুলো তাঁকে ঘিরে কিছু টিকা-টিপ্পনিও কেটেছিল। তাঁর সাক্ষাৎকার নিতে যাওয়ার ক্ষেত্রে আমারও ইস্যু ছিল সেটিই। তবে ধরন ছিল পজিটিভ। কিন্তু রাজনৈতিক ইস্যুটিকে মুখ্য করে কোনো প্রশ্ন করলেই তিনি প্রথমে নীরব হয়ে যেতেন। এরপর বলতেন, ‘রাজনীতি নিয়ে আমার কোনো কথা নেই।’ তারপর যখন ‘মুসলমানদের জীবনে ধর্মের সম্পৃক্ততা ও প্রভাব’ নিয়ে কিছুটা ব্যাপক আঙ্গিক ও পরিসরে প্রশ্ন করেছি তখন তিনি সেই খুৎবার ভাষণের মতোই উত্তর দিয়ে গেছেন, যেখানে রাজনীতিকে ধর্মমুক্ত করার দাবিটি যে অসমীচীন ও অসামঞ্জস্যশীল সে কথাটিও চলে এসেছিল। সাক্ষাৎকার নেয়া শেষে বিদায় নিয়ে চলে আসি।
এরপর থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত হজরত খতিব সাহেবের সঙ্গে নিয়মিত কোনো যোগাযোগ ছিল না। উপলক্ষও ছিল না। বায়তুল মোকাররমে কোনো কোনো জুমাও তাঁর পেছনে পড়েছি। খতমে নবুওয়তের সমাবেশ থেকে নিয়ে আলেম-উলামাদের ঘরোয়া, আধা-ঘরোয়া কোনো কোনো মজলিসে তাঁকে দেখেছি। এগিয়ে গিয়ে সালাম-মুসাফাহা করেছি, অন্য দশজনের সঙ্গে। চেনা-অচেনা একটি গাম্ভীর্যপুর্ণ স্মিত হাসির আভাস তাঁর আদলে লক্ষ্য করেছি। পরিচয় দিয়ে দিয়ে ঘনিষ্ঠ হতে চাওয়ার সাহস ছিল না। ২০০২ সালে হজরত হাফেজ্জী হুজুর (রহ.)-এর সেজো সাহেবজাদা মাওলানা হামিদুল্লাহ সাহেবের উদ্যোগে গঠিত ‘হাফেজ্জী হুজুর পরিষদে’র পক্ষ থেকে যখন ‘হাফেজ্জী হুজুর (রহ.) স্মারকগ্রন্হ’ প্রস্তুত করতে লেখা-সাক্ষাৎকার সংগ্রহ ও সম্পাদনা এবং এ জাতীয় কাজের জন্য আমাকে নিযুক্তি করা হলো তখন আবার তাঁর কাছে গেলাম। প্রথম বৈঠকে আ্লমধুর কিছু অভিজ্ঞতা ও ঝাঁঝালো মতামত ব্যক্ত করলেন। যাতে তাঁর লেখাপ্রাপ্তি নিয়ে শুরুতে আমি হতাশায় পড়ে গেলাম। এরপর আবার যাওয়া। এবার তিনি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার দিলেন। আরেকদিন গিয়ে কপিটি তাঁকে শুনিয়ে কিছু সংশোধনী নিয়ে এলাম। সে ক’দিনে খোঁজ নিয়েই হোক বা স্মৃতি থেকেই হোক আমার টুকটাক লেখালেখি সম্পৃক্ততা বিষয়ে তার অবগতির কথাও তিনি আমাকে জানালেন এবং স্মারকগ্রন্হের কাজের গতি-প্রকৃতি ও প্রকাশ সম্ভাব্যতা নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্নোত্তর হলো।
আমি আমার কাজ সেরে চলে এলাম। এতোবড়, ব্যস্ত ও বর্ষীয়ান মানুষের কাছে এরপরও হতে পারে চেনা-না চেনার একটি আবছা ছায়ার মতো আমি থেকে যেতে পারি-ধরে নিয়েই স্মারকগ্রন্হটির কাজে যথারীতি নানান জায়গায় ছুটতে লাগলাম।
চার.
২০০৫-এর সেপ্টেম্বরে হজরত হাফেজ্জী হুজুর (রহ.) স্মারকগ্রন্হটির প্রকাশনা অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। প্রধান মেহমান থাকেন খতিব সাহেব। স্মারকগ্রন্হটির কলেবর, আয়োজন দেখে এবং সেটি উল্টেপাল্টে তিনি তাঁর স্বভাবসুলভ হাসিভরা মুখে বিপুল খুশি ও তৃপ্তির অভিব্যক্তি প্রকাশ করেন। মাওলানা হামিদুল্লাহ সাহেবসহ আয়োজক উদ্যোক্তাদের সবাইকে মুবারকবাদ জানান। সে স্মারকগ্রন্হটি প্রকাশের পর থেকে খতিব সাহেবের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ও পরিচয়ের সুত্রটি কিভাবে যেন জোরালো হয়ে ওঠে। এরপর যখন যেখানেই দেখা হয়েছে, সরাসরি কিংবা ফোনে কথা হয়েছে, প্রথমদিকে আমার নাম বলার পর আমার কর্মক্ষেত্র- আমার দেশ পত্রিকা এবং সে ‘স্মারকগ্রন্হে’র প্রসঙ্গ উঠানো মাত্রই অত্যন্ত স্নেহমাখা সুরে জিজ্ঞাসাবাদ করতেন। লজ্জায় সংকোচে মাটির সঙ্গে আমার মিশে যেতে ইচ্ছা হতো, এমন কিছু বড় উপাধি ব্যবহার করে মাঝে মাঝে আমাকে সম্বোধন করে কথা বলতেন। উদ্দিষ্ট বিষয়ে কথাবার্তা শেষ হলে অত্যন্ত স্নেহ ও ‘প্রশ্রয়’মাখা কথা দিয়ে বক্তব্য শেষ করতেন।
পাঁচ.
তাঁর আচরণ ভাষা ও সম্বোধনে বোঝা যেত তিনি স্নেহের সঙ্গে আস্হারও কিছু প্রকাশ ঘটিয়ে চলেছেন আমার প্রতি। এ কারণে গত বছর ঈদুল আজহার আগের দিন দুর থেকে ফোনে এক দুঃসাহসী আব্দার পর্যন্ত তাঁর কাছে করে ফেলতে সাহসী হয়ে উঠেছিলাম। ওইদিন কিংবা আগের দিন ইরাকে সাদ্দাম হোসেনকে তড়িঘড়ি করে ফাঁসি দেয়া হয়েছিল। বিগত দিনে সাদ্দামের অপরাধ ছিল কতখানি এ প্রশ্নটির চেয়েও ওইদিন ওইভাবে ফাঁসি দেয়ার ঘটনাটি অনুভুতিসম্পন্ন প্রত্যেককেই আবেগকাতর করে তুলেছিল। দুপুরে আমি ঢাকার বাইরে চলে গেছি। হঠাৎ মনে হলো, আগামীকাল ঈদের নামাজের সময় দেশজুড়ে এ ঘটনাটির প্রতিবাদ ও দোয়ার মাধ্যমে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশী মুসলমানদের ক্ষোভ ও আবেগের একটি প্রয়োজনীয় প্রকাশ ঘটানো যেতে পারে। কিন্তু এতো অল্প সময়ে সেটার আয়োজন কিভাবে সম্ভব এবং কেন্দ্রীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য কে এই কাজটি করতে এগিয়ে আসবেন? সঙ্গে সঙ্গেই খতিব সাহেবের মুখ আমার চোখের সামনে ভেসে উঠলো। কিন্তু এভাবে এ বিষয়ে তাকে সরাসরি আমার মতো তুচ্ছ একজন মানুষের কি কিছু বলা উচিত হবে? ফোনে ফোনেই পরামর্শ করলাম রুপালী লাইফের বন্ধুবর খালিদ মামার সঙ্গে। তিনি ব্যাপারটিতে উৎসাহী হলেন এবং বললেন, ‘আপনি বলুন হুজুরকে, আমিও বলছি।’ খতিব সাহেবের বাসার নম্বরে ডায়াল ঘুরাতে ঘুরাতে আবেগে ভার হওয়া বুক এবার কেঁপে কেঁপে উঠলো শঙ্কায়-দ্বিধায়। ওপাশ থেকে ভরাট কণ্ঠে হ্যালো শুনেই সালাম দিয়ে মুল বিষয়টি তাঁকে আদবের সঙ্গে বললাম। তিনি চুপচাপ শুনলেন। প্রথমে বললেন, ‘সাদ্দাম তো অনেক জুলুমও করেছিল।’ আমি বললাম-‘তারপরও তার ফাঁসির রায় হয়েছে মার্কিন মদদপুষ্ট একটি পুতুল সরকারের সাজানো বিচারালয়ে এবং তড়িঘড়ি করে ঈদের দিন সকালে (ইরাক ও আরব বিশ্বে) তাকে ফাঁসিতে ঝুলানো হয়েছে। এথেকে মুসলিম জনসাধারণ ও শাসকদের শিক্ষাগ্রহণ এবং শক্তিধর শত্রুর নির্মমতা সম্পর্কে সম্ভবত আপনি কিছু বললে এবং সব ইমামকে আহ্বান জানালে এদেশের মানুষ সান্ত্বনাও পাবে-উপকৃতও হতে পারবে।’ তিনি আমার কথা গ্রহণ করে নিলেন। কিন্তু আজ থেকে পেপার-পত্রিকা যে বন্ধ। কাল ঈদ। এ অল্প সময়ে কিভাবে কি করা যায়। আমি বললাম, ‘প্রাইভেট টিভি চ্যানেলগুলোকে ব্যবহার করা যায়।’ বলেই বুঝলাম এটি একটি আয়োজনের বিষয়। এখানে খতিব সাহেবের তেমন কিছু করার নেই। হুজুরের কাছ থেকে সময় নিয়ে প্রথমে গল্পকার রুহুল আমীন সাদী ভাইয়ের মাধ্যমে সাংবাদিক সেলিম জাহিদের সঙ্গে এবং অল্প পরেই মুফতি আমিনী সাহেবের প্রেস বিষয়ক পরামর্শক আহলুল্লাহ ওয়াছলের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম ফোনে। তারা দশ মিনিটের মধ্যে জানালেন, ঈদের আগের দিন নির্ধারিত এসাইনমেন্ট সেরে অনেকেই আসতে পারবে না। তবুও দু-একটি চ্যানেলের ক্যামেরাম্যান ও সাংবাদিক আসবেন। এরপর আবার ফোন করে খতিব সাহেব হুজুরকে বললাম-বাদ আসর সাংবাদিকদের সময় দেয়ার জন্য হুজুর বাসায় থাকলে ভালো হয়। তিনি সহাস্যমুখেই সম্মতি জানালেন। পুরো বিষয়টি আধাঘণ্টা থেকে চল্লিশ মিনিটের মধ্যে ঘটে গেল। এরপর দিনটি পার হচ্ছে আর ভেতরে ভেতরে আমি উত্তেজিত ও উৎকণ্ঠিত হচ্ছি। আমি কি বাড়াবাড়ি করে ফেললাম? আমার তাৎক্ষণিক আবেগের ধাক্কাটা এভাবে উগরে দিয়ে হুজরকে কি নতুন কোনো বিড়ম্বনার মুখে ফেলতে যাচ্ছি? আল্লাহ আল্লাহ করছি। রাতে খবর দেখে খালিদ মামা জানালেন, দু-একটি চ্যানেলে খতিব সাহেবের দরদমাখা আহ্বান প্রচারিত হয়েছে।
পরদিন ঈদের নামাজের সময়েও খতিব সাহেব যথারীতি প্রতিবাদ ও দোয়া করেছেন। টিভি চ্যানেলগুলোতে যা প্রচারিত হয়েছে। বহু মানুষের কাছে সে বিষয়টির ব্যাপারে পরে ইতিবাচক মন্তব্য শুনেছি। পরামর্শ দেয়ার মতো আমি কেউ ছিলাম না। কেউ নইও। কিন্তু উম্মাহকেন্দ্রিক যে আবেগের কড়ানাড়াটা তাঁর বোধের কান পর্যন্ত পৌঁছে গেছে, সেখানে তিনি দুয়ার খুলে দিয়েছেন। কড়াটা কে নাড়লো দেখেননি।
ছয়.
একটি বীমা কোম্পানির শরীয়া কাউসিলে ঘটনাচক্রে সবচেয়ে কনিষ্ঠ সদস্য আমি। সেটাতে চেয়ারম্যানের দায়িত্বে ছিলেন খতিব সাহেব। প্রায় প্রতিটি মিটিং, মিটিং-এ আসা-যাওয়ার পথে প্রয়োজনীয় ও সংশ্লিষ্ট আলোচনার বাইরে তিনি টুকটাক কথা বলতেন এবং প্রতিটি কথাতেই স্নেহের টুকরো টুকরো হিরক ঝরে পড়তো। পত্রপত্রিকায় কোন প্রসঙ্গ নিয়ে ইদানীং লেখা দরকার সেটা নিয়ে বলতেন। বন্ধুরা মিলে আমার সম্পাদনায় প্রকাশ হওয়া একটি মাসিক পত্রিকা কয়েক সংখ্যা চলার পর স্হগিত হয়ে যাওয়ায় আফসোস ব্যক্ত করেছেন একাধিক দিন। মিটিং এর সুচনায় কয়েকদিন কুরআন তেলাওয়াতের জন্য সভাপতি হিসেবে অত্যন্ত সুন্দরভাবে তিনি আমার নাম উচ্চারণ করেছেন।
এক মিটিংয়ের শেষে ঘরে ফেরার সময় ইচ্ছাকৃতভাবে হুজুরের গাড়িতে সওয়ার হওয়ার অনুমতি চাইলাম। গাড়ি চলতে শুরু করলে আমি আমার ‘মতলবের ডালি’ মেলে ধরলাম। বললাম, মাওলানা ফরিদউদ্দীন মাসউদ সাহেবের আব্বা মাষ্টার আবদুর রশিদ সাহেব মারা গেছেন। মাওলানা সাহেব চাচ্ছেন তার আব্বার সমসাময়িক কিছু মানুষের স্মৃতিচারণ সংবলিত একটি জীবনী ও স্মারকগ্রন্হ প্রকাশ করতে। সে হিসেবে খতিব সাহেব হুজুরের কিছু স্মৃতি নিয়ে অনুলিখনের ভিত্তিতে একটি লেখা তৈরি করে দিতে আমাকে বলেছেন। আমি যদিও মাওলানা ফরিদ সাহেবের ছাত্র নই এবং তার রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক কোনো কর্মকান্ডের সঙ্গে যুক্ত নই, কিন্তু তার সঙ্গে আমার আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে এবং প্রবীণ আলেম লেখক হিসেবে আমি তাকে সমীহ করি। তাই এ বিষয়টি নিয়ে হুজুরের কাছে আসতে চাই। হুজুর কিছু সময় দিলে আমার কাজটি হয়ে যাবে।’ সম্মতি জানিয়ে তিনি আমাকে কিছুদিনের মধ্যে যোগাযোগ করতে বললেন। তারপর বললেন, মাষ্টার আবদুর রশিদ সাহেব (মরহুম) হজরত মাওলানা আতহার আলী (রহ.)-এর ওপর সুন্দর একটি জীবনী রচনা করেছিলেন। সেটি প্রকাশিত হয়েছে কিনা তিনি বলতে পারছেন না। সেই রচনাটি নাকি খুবই হৃদয়গ্রাহী ও সুন্দর হয়েছিল। আমাকে তিনি বললেন, খোঁজ নিবেন সেই রচনাটির কোনো কপি আছে কিনা।
দুর্ভাগ্য আমার। অসুস্হতা, অপারগতা এবং অলসতার কারণে না পেরেছি খতিব সাহেবের মাষ্টার আবদুর রশিদ সাহেব সম্পর্কিত কোনো স্মৃতি রেকর্ড করতে, না পেরেছি মরহুম মাষ্টার সাহেব লিখিত সেই রচনাটির কোনো খোঁজ নিতে। ‘আজ পারছি না-কাল করবো’ করতে করতে খতিব সাহেবকেই হারিয়ে ফেললাম। এখন একটি কাজ তো আর কোনোদিনই করতে পারবো না, দ্বিতীয় কাজটিও প্রথম কাজটি না করতে পারার দ্বিধায়-সংকোচে আর সহজে করতে পারবো বলে মনে হচ্ছে না।
সাত.
এরও আগে একদিন খতিব সাহেবের কাছে বিনয়ের সঙ্গে আবদার করেছিলাম, তাঁর প্রিয় উস্তাদদের নিয়ে তাঁর কিছু স্মৃতিচারণ কপি করতে চাই। একদিন বলেছিলাম, তাঁর একটি দীর্ঘ ইন্টারভিউ গ্রহণ করে রাখতে চাই। হেসে পাশ কাটিয়ে গেছেন দু’দিনই।
খতিবের মসনদে তাঁর আসন সজ্জিত হওয়ার পর তার ভুমিকাটাই এমন প্রাণবন্ত ও সজীব ছিল যে, প্রেস তার পেছনে ছুটতো। খতমে নবুওয়তসহ বিভিন্ন মিটিং-প্রোগ্রামে তার উপস্হিতির জন্যও তাঁকে কভার করতে সাংবাদিকরা লেগে থাকতেন। এসব বিষয়ে প্রচার পাবলিসিটি দরকার বলে তিনি কিছুটা উদারও থাকতেন। কিন্তু নিছক ব্যক্তিগত বন্দনা বা প্রচারের কোনো গন্ধ দেখলে তিনি উল্টো পথে হাঁটতেন। প্রচারমুখী বহু কাজে যুক্ত থেকেও তিনি নিজে থাকতেন প্রচারবিমুখ।
ভাবগম্ভীর আবার হাসি-হাসি মুখে তিনি চলতেন, বলতেন। কাছে ঘেঁষলে মনে হতো খুব সহজ, আবার দরকারি রুঢ় কথাটিও গম্ভীর মুখে শুনিয়ে দিতেন।
মসজিদের মেহরাবে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় সমাজ কিংবা সরকারের কোনো কাজের অসঙ্গতি নিয়ে কথা বলতেন। আবার শব্দ ও যুক্তি প্রয়োগে পরিমিত ও শালীনতা ধরে রাখতেন। গরম কোনো ইস্যু নিয়ে কথা বলা শুরু করলে ভয় হতে থাকতো, এই বুঝি পঁ্যাচ লেগে যায়-কিন্তু মসৃণ পথ নির্দেশনার বাক্য উচ্চারণ করে পরিবেশটাকেই উৎরে দিতেন।
কথায় সিলেটি টান থাকতো, খুব অল্প পরিমাণে উর্দু শব্দের মিশ্রণও থাকতো, কিন্তু স্বর ও শব্দ উচ্চারিত হতো স্পষ্ট। তেলাওয়াতে সুললিত ভঙ্গির অনুপস্হিতি থাকতো, কিন্তু মাখরাজ ও শুদ্ধতার কোনো কমতি কেউ ধরতে পারতো না। শুদ্ধ বাংলায় কথা বলতে গেলে অনেক সময় সাধু ভাষায় কথা বলতেন। কিন্তু সবটাই সুশ্রাব্য হতো। তাঁর আলোচনা মানুষ শুনতো ‘ওয়াজ-বয়ানের’ মিষ্টি পেতে নয়, অন্যরকম কিছু ‘কথা’ শোনার স্বাদ পেতে।
উঁচু কিশতি টুপি, শেরোয়ানি, সেলোয়ারে ঢাকা শরীর নিয়ে লাঠি হাতে যখন দাঁড়াতেন তখন যেন একটি মিনার দাঁড়িয়ে থাকতো। ধীরে ধীরে হেঁটে চললে মনে হতো ব্যক্তিত্বের একটি পর্বত সামান্য হেলেদুলে চলছে। এ অবস্হায় তাঁর টলটল করা জীবন্ত দুটি চোখের সঙ্গে চোখ মিললে মনে হতো চেহারা নয় আমার অস্তিত্বটাই তাঁর অন্তর্ভেদী চোখের সামনে উন্মুক্ত হয়ে গেছে।
দেখেছি তো কম, কিন্তু তাঁর প্রজ্ঞা, সুচিন্তা, দুরদৃষ্টি, দৃঢ়তা এবং ব্যক্তিত্বের গল্প বহু শুনেছি। কিছুটা ঝুঁকে থাকা মেরুদন্ডের এই অস্বচ্ছ বর্তমানে তাঁকে তাই সব সময় মনে হয়েছে সটান মিনারের কাঠামো। আমার চোখ এমন কাঠামো দেখার সৌভাগ্য বেশি একটা পায়নি।
আট.
জাতীয় ঈদগাহের জানাজায় কত মানুষ! বহু স্বজন-সুজনকে সেখানে দেখলাম। বিশিষ্ট জনদের বক্তব্য চলছে। পরিচিত জনদের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। স্মৃতিবিনিময় হচ্ছে, কুশলবিনিময় হচ্ছে। দৃশ্যটি স্বাভাবিক। এতোবড় একজন মানুষের সঙ্গে মানুষের সাধারণত শ্রদ্ধাপুর্ণ অথচ অঘনিষ্ঠ একটি সম্পর্কই গড়ে ওঠে। শ্রদ্ধা ও সমীহের দাবির দাপট থাকে হৃদ্যতা ও আত্মিক টানের ওপর। শোকের একটি আবহ থাকে, শোকের একটা প্রস্তুতিও থাকে। প্রত্যেকের অন্তরে শোকের একটা বীজ অঙ্কুর ছড়িয়ে চুপচাপ বসে থাকে। বাস্তবতা হচ্ছে, শোকে সবাই মুহ্যমান হয়ে পড়েন না। আমার অবস্হাও এরকমই ছিল। মাঠে ঢুকলাম। পশ্চিম দিকে এগিয়ে যেতে লাগলাম। যারা বক্তব্য দিচ্ছেন তাদের বক্তব্য কানে ঢুকতে লাগলো। পরিচিতজনদের কেউ কেউ সালাম দিয়ে পাশে এসে দাঁড়াতে লাগলেন। স্বাভাবিক প্রশ্নোত্তর করতে চাইলেন। আমি মুশকিলে পড়ে গেলাম। চোখের পাতা ছাপিয়ে পানি পড়তে লাগলো। ঠোঁট কাঁপতে লাগলো। কথা বলতে চাইতেই দেখি কথা ভেঙে যাচ্ছে, গলা বসে যাচ্ছে। বিপদেই পড়লাম। রুমাল বের করে চোখ মুছে ফেললাম। চোখের পানি শেষ হতে চায় না। অন্ধকার আকাশ মাথায় নিয়ে জানাজা পড়া শেষ হলো। জানাজা শেষ হতে আকাশের অশ্রু এসে আমার চোখের পানি ধুয়ে দিল। আমার বুকের ভেতর পাথর অনেক।
সেখানে খতিব সাহেবের জন্য এমন একটি ঝরনাও যে রচিত হয়ে আছে তা আমার জানাই ছিল না।
**************************
শরীফ মুহাম্মদ
দৈনিক আমারদেশ, ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০০৮