- Home
- জীবন ও কর্ম
- স্মরণীয় ব্যাক্তিত্ব
- হযরত খাওলা বিনতে সালাবা
হযরত খাওলা বিনতে সালাবা
- By Article Poster
- Published 03/7/2008
- স্মরণীয় ব্যাক্তিত্ব
-
Rating:




খাওলা বিনতে সালাবা আরবের একজন অতি সাধারণ নারী, গৃহবধূ। আর পাঁচ দশজন সাধারণ নারীর ন্যায়ই স্বামী-সন্তানসহ তার পারিবারিক জীবন। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় বিশেষ করে মুসলিম ইতিহাসে তিনি এক অনন্য স্থান দখলকরে আছেন। তিনি সে-ই সাধারণ মানের গৃহিণী যার আকুল আহবানে মহানআল্লাহ পবিত্র কোরআনে এক বিধান জারি করে তাকে মহাসম্মানের আসনে ভূষিত করে রেখেছেন। স্বামী হযরত আত্তস ইবনে সাবেত এবং কচি কচি শিশু সন্তানদের নিয়ে ভরপুর তার সংসার। দীর্ঘ সুখী দাম্পত্য জীবনের এক পর্যায়ে পতি একবার তার পতি অসন্তুষ্ট হন এবং ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন এবং বলতে থাকেন আনতা আ’লা কা যিহরী উম্মী’ অর্থাৎ, তুমি আমার পক্ষে আমার মাতার পৃষ্ঠদেশের ন্যায়। বর্ণিত আছে স্বামী মিলনে অভিলাষী হন এবং স্ত্রী অসম্মতি প্রদান করায় তিনি উপরোল্লিস্নখিত মত মন্তব্য করেন। যাই হোক, তখনকার দিনে প্রচলিত রীতি ছিল যে, স্বামী যদি তার স্বীয় স্ত্রীকে বিবাহে নিষিদ্ধ কোন স্ত্রী লোকের অথবা তার কোন অঙ্গের সঙ্গে তুলনা করেন, তবে তার জন্যে তার স্বীয় স্ত্রী বর্জিত হয়ে যায়। ইসলামী পরিভাষায় একে ‘যিহার’ বলা হয়। ঘটনার আকস্মিকতায় হযরত খাওলা বিনতে সালাবা অসহায় বোধ করেন, বিচলিত হন এবং কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েন। তিনি বিষয়টি নিয়ে হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) তৎকালীন প্রথানুসারে তিনি স্বামী কর্তৃক পরিত্যক্ত হয়েছেন এমন মন্তব্য করেন। এতে হযরত বিবি খাওলা শূন্যতা ও আশ্রয়হীনতা অনুভব করেন, অসহায় হয়ে পড়েন এবং অসহিষ্ণু হয়ে উঠেন। তিনি পুনঃ পুনঃ অভিযোগ করতে থাকেন। কোন কোন বর্ণনায় দেখা যায় তিনি বলতে থাকেন স্বামী তো ‘তালাক’ শব্দ উচ্চারণ করেন নাই, আমি পরিবর্জিত হলাম কি করে? রাসূল (সাঃ) বলেন, তোমার সম্পর্কে আমার নিকট এখন পর্যন্ত কোন বিধান অবতীর্ণ হয়নি। শোকাভিভূত হয়ে খাওলা বলে উঠেনঃ আপনার প্রতি তো প্রত্যেক ব্যাপারে বিধান পাঠানো হয়, আমার ব্যাপারে কি হল যে, ওহীও বন্ধ হয়ে গেল (কুরতবী)।
এরপর হযরত খাওলা আল্লাহর নিকট ফরিয়াদ পেশ করেন। আল্লাহুম্মা ইন্নি আশকু ইলাইকা, অর্থাৎ আল্লাহ আমি তোমার নিকট অভিযোগ করছি। এরই প্রেক্ষাপটে মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে নাযিল করেন নিম্নোক্ত আয়াতসমূহঃ “যে নারী তার স্বামীর বিষয়ে আপনার সাথে বাদানুবাদ করছে এবং অভিযোগ পেশ করছে আল্লাহর দরবারে, আল্লাহ তার কথা শুনেছেন। আল্লাহ আপনাদের উভয়ের কথাবার্তা শুনেন। নিশ্চয় আল্লাহ সবকিছু জানেন সবকিছু দেখেন। তোমাদের মধ্যে যারা তাদের স্ত্রী লোককে মাতা বলে ফেলে, তাদের স্ত্রীগণ তাদের মাতা নয়। তাদের মাতা কেবল তারাই, যারা তাদের জন্মদান করেছে। তারা তো অসমীচীন ও ভিত্তিহীন কথাই বলে। নিশ্চয় আল্লাহ, মার্জনাকারী, ক্ষমাশীল। যারা তাদের স্ত্রীগণকে মাতা বলে ফেলে, অতঃপর নিজেদের উক্তি প্রত্যাহার করে তাদের কাফফারা এইঃ একে অপরকে স্পর্শ করার পূর্বে একটি দাস মুক্তি দেবে। এটা তোমাদের জন্যে উপদেশ হবে। আল্লাহ খবর রাখেন তোমরা যা কর। যার এ সামর্থ নেই সে একে অপরকে স্পর্শ করার পূর্বে একাদিকক্রমে দুই মাস রোযা রাখবে। যে এতেও অক্ষম সে ষাট মিসকীনকে আহার করাবে। এটা এজন্য যে, যাতে তোমরা আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করঃ·৫৮:১-৪।
প্রথম আয়াতে উলেস্নখিত বাদানুবাদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যমণ্ডিত। রাসূল (সাঃ) এর সাথে হযরত বিবি খাওলার বেশ কিছু কথোপকথন হয় বলে প্রতীয়মান হয়। এ কথোপকথনে রাসূল (সাঃ) তাকে স্বামী কর্তৃক অবৈধ বলা সত্ত্বেও বিবি খাওলা তার স্বপক্ষে বিভিন্ন যুক্তি অবতারণা করে আহাজারি করতে থাকেন। যেমন-
১· তিনি তার যৌবনের সব কিছুই স্বামীকে বিলিয়ে দিয়েছেন, আজ বৃদ্ধ বয়সে তাকে পরিবর্জন করলে তার কি উপায় হবে?
২· তিনিসহ ছোট ছোট শিশু সন্তানদের ভরণ-পোষণের দায়-দায়িত্ব কে নেবে?
৩· সর্বোপরি স্বামী তো ‘তালাক’ শব্দ উচ্চারণ করেননাই। তালাক হলেন কি করে?
হযরত বিবি খাওলার মনো দৈহিক-বিচলিত অভিব্যক্তিতে যে বিষয়টি আমার নিকট দৃঢ়ভাবে প্রতীত হয়েছে তা হচ্ছেঃ উদ্ভূত পরিস্থিতির মোকাবিলায় সাধারণ গৃহিণী হযরত বিবি খাওলা নারী অধিকার সংরক্ষণে সচেতন ও সোচ্চার হয়ে উঠেছেন। স্ত্রীকে মাতার পৃষ্ঠদেশের সাথে তুলনা করলেই যে স্ত্রী বর্জিত হয় না, আজকের এ সাধারণ কথাটিকেই সেদিন তিনি তৎকালীন পরিবেশগত কারণেই সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত করতে পারেননি। তার মূল উদ্দেশ্য যে ছিল এ-ই, এ সম্বন্ধে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। তার জোরালো ও দৃঢ় বক্তব্য অসহায় নারীর প্রতি রাসূল (সাঃ)-এর মমতাবোধ জেগে উঠে। তিনি বলতে থাকেনঃ এ বিষয়ে আমার নিকট কোন প্রত্যাদেশ আসেনি- হযরত খাওলার অভিযোগ আপনার নিকট সব ব্যাপারেই ওহী আসে আমার বিষয়ে কি ওহীও বন্ধ হয়ে গেল। অনন্যোপায় হয়ে তিনি স্বয়ং আল্লাহর নিকটই ফরিয়াদ জানান। তার অভিযোগের প্রেক্ষিতে, তার সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে এবং তারই ওসীলায় ঘোষণা করা হয় দীর্ঘকালের প্রচলিত এক কু-প্রথা ও কুসংস্কারের উচ্ছেদের সেই মহাবিধান যার ফলশ্রুতিতে শুধু হযরত বিবি খাওলাই নন, মুক্তি পান ‘যিহারত’ সমগ্র মুসলিম নারীকুল। হযরত বিবি খাওলাকে উপলক্ষ করে আল্লাহর এ বিধান জারি তাকে জগৎ-ইতিহাসে মহিমান্বিত ও গৌরবান্বিত করে রেখেছে।
হযরত বিবি খাওলার যে দিক আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করে তা হচ্ছে সংক্ষুব্ধ স্বামীর অনঅভিপ্রেত শব্দ উচ্চারণে যে স্ত্রী বর্জিত হয়ে যায়, এই ধারণার তীব্র প্রতিবাদে। বিধি খাওলা শিক্ষিত নন, তিনি সামান্য একজন ছা-পোষা নারী। এতদসত্ত্বেও, তার প্রতিবাদ ও বিরোধিতার ঝাঁঝ আমাদের মুগ্ধ করে। নিজ এবং একজন অসহায় নারীর অধিকার অক্ষুণ্ন রাখার স্বার্থে তিনি এককভাবে সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। সীমিত জ্ঞান, বুদ্ধি এবং প্রজ্ঞা দিয়ে তিনি স্বীয় সমস্যা মোকাবিলায় রত। মনে দুর্বার সাহস ও চরিত্রের দৃঢ়তা তার এত প্রবল যে, তিনি সরাসরি এ ব্যাপার আলোচনার জন্য রাসূল (সাঃ) এর শরণাপন্ন হতে দ্বিধা করেন নাই। রাসূল (সাঃ)-এর নেতিবাচক মন্তব্যে তিনি আশাহত হলেও একেবারে নিরাশ হননি। তিনি আল্লাহর আশ্রয় ও সাহায্য প্রার্থনা করেন। পবিত্র কোরআনে এ ঘটনা উল্লেখ করে হযরত বিবি খাওলাকেই উচ্চ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করা হয়নি, এক কুসংস্ড়্গার প্রথার বিলোপ সাধন করে আমাদের দান করা হয়েছে শরিয়তসম্মত এক সার্বিক বিধান যা অদ্যবধি বিদ্যমান। বিবি খাওলার এ ঘটনা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় হযরত বিধি আয়েশার কথা স্মরণ করিয়ে দেয় হযরত ইয়াকুব (আঃ) এর কথাও। হযরত বিবি আয়েশা তার উপর আরোপিত অপবাদ মিথ্যে প্রমাণার্থে তিনি শেষ পর্যন্ত আল্লাহর দরবারেই আরজ পেশ করেন। হে মহান স্রষ্টা। তুমি আমাকে সহজ পথ প্রদর্শন কর। যাতে মহানবী (সাঃ) এর নিকট আমার নিরপরাধ হওয়া প্রকাশ পায়। অতঃপর নাযিল হয় আয়াত ২৪/১১-১৯। হযরত ইয়াকুব (আঃ) বলেন, ·তোমরা যা বানিয়ে বলছ আল্লাহই আমাকে সাহায্য করবেন। ১২:১৮ হযরত খাওলা বিনতে সালাবা একজন সাধারণ ঘরের কুলবধূ হয়েও তার অসাধারণ কৃতিত্বের জন্যে অমর হয়ে আছেন এবং আমাদের জন্যেও উত্তম দৃষ্টান্ত হয়ে রইলেন।
*************************
লেখকঃ প্রফেসর মোহাম্মদ আবদুল হালিম
চিন্তাবিদ, সিলেট এমসি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ
দৈনিক ইত্তেফাক, ০৭ মার্চ ২০০৮