Islamic Article Archive - http://articles.ourislam.org
ইসলামের উন্মেষভূমি মদীনা
http://articles.ourislam.org/articles/78/1/aaaaaaa-aaaaaaaaaa-aaaaa/Page1.html
Article Poster
 
By Article Poster
Published on 03/14/2008
 
বিশ্বজাহানের স্রষ্টা মহান আল্লাহ পবিত্র মদীনা ভূমিকে তাঁর প্রিয় হাবীব মুহাম্মদ(সাঃ)-এর হিজরতস্থল ও কিয়ামত পর্যন্ত ইসলামের অনুসারীদের প্রধান আধ্যাত্মিক কেন্দ্ররূপে মনোনীত করেছেন। তিনি এ ভূমিকে আরও ধন্য করেছেন শেষ নবীর শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে। তাই এই শহরের মর্যাদা অপরিসীম। মুসলমানদের কাছে মক্কার পরেই এ শহরের গুরুত্ব। নবীজীর রওজা ছাড়াও এর প্রতিটি অলিগলিতে রয়েছে ইসলামের পুরনো দিনের স্মৃতি।

ইসলামের উন্মেষভূমি মদীনা

বিশ্বজাহানের স্রষ্টা মহান আল্লাহ পবিত্র মদীনা ভূমিকে তাঁর প্রিয় হাবীব মুহাম্মদ(সাঃ)-এর হিজরতস্থল ও কিয়ামত পর্যন্ত ইসলামের অনুসারীদের প্রধান আধ্যাত্মিক কেন্দ্ররূপে মনোনীত করেছেন। তিনি এ ভূমিকে আরও ধন্য করেছেন শেষ নবীর শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে। তাই এই শহরের মর্যাদা অপরিসীম। মুসলমানদের কাছে মক্কার পরেই এ শহরের গুরুত্ব। নবীজীর রওজা ছাড়াও এর প্রতিটি অলিগলিতে রয়েছে ইসলামের পুরনো দিনের স্মৃতি। মদীনার স্মৃতিতে বড় যে অধ্যায়টি রয়েছে তা হলো ত্যাগের অধ্যায়। এই ত্যাগের বিনিময়েই ইসলাম তখন প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল। ইসলামের শুরুর যুগে মক্কায় রাসূল ও তার সাথিগণ যে নিদারুণ অবস্থার সম্মুখীন হয়েছিলেন, মদীনাবাসীরা আশ্রয় দিয়ে সে দুঃখ-দুর্দশা ঘুচিয়েছেন। সেই হতে হিজরত, নুসরত, দাওয়াত, জিহাদ ও হুকুমের বিশাল কর্মক্ষেত্র হয়ে ওঠে মদীনা। তাই মদীনাকে ইসলামের উন্মেষভূমি বলা চলে।

মদীনা একটি পবিত্র নগরী। নামটি অতি প্রিয়। শুনলেই মুমিনের হ্নদয় আনন্দে উদ্বেল হয়ে ওঠে। এ শহরটি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কর্তৃক একধিক নামে খ্যাত। তাই দ্বিধাহীন চিত্তে বলা যায় যে, এটি আল্লাহ ও রাসূলের নিকট একটি প্রিয় স্থান। পৃথিবীর অন্য কোনো স্থান নেই যা এতো অধিক নামে ভূষিত হয়েছে। মদীনা শহরের ৯৫টি গুণবাচক নাম রয়েছে। তন্মধ্যে তাইয়েবাহ (পবিত্রধাম), আরদুল্লাহ (আল্লাহর জমিন), কারইয়াতু রাসূলিল্লাহ (রাসূলের পল্লী), মদীনাতুর রাসূল (রাসূলের শহর) ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। আল-কোরআনে সূরা আনফালে ৫নং আয়াতে মদীনাকে রাসূলের ঘর হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। এ থেকেই বুঝা যায় মদীনা কতো সম্মানিত স্থান। হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে- “প্রতিটি মানুষ যেখানে সমাহিত হয়, সেখানাকার মাটি থেকে তাকে সৃজন করা হয়েছে।” এ হাসীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, হযরত রাসূলুল্লাহ (সাঃ), আবু বকর (রাঃ), ওমর (রাঃ) সহ মদীনায় শায়িত বেশির ভাগ সাহাবীকে পূণ্যভূমি মদীনার মাটি দ্বারা সৃষ্টি করা হয়েছে। এদিক দিয়েও মদীনার সম্মান অনেক উঁচুতে। প্রখ্যাত মুহাদ্দিস আল্লামা কছতলানী বলেছেন- ‘রাসূলের দেহ-মোবারকের সাথে পৃথিবীর যে অংশ মিলিত আছে তা পৃথিবীর মধ্যে সর্বোত্তম স্থান। কেন না মেরাজ গমনকালে নবীজী আরশে পৌঁছালে আল্লাহ নবীজীকে জুতা না খোলার জন্য বলেন। রাসূলের জুতা যদি এতো মূল্যবান হয় তাহলে তিনি যে মাটিতে শুয়ে আছেন তা কতো দামি সে কথা সহজেই অনুমান করা যায়।

রাসূলুল্লাহ(সাঃ)-এর হিজরতকে কেন্দ্র করে জেগে উঠেছিল মদীনা। মাত্র দশ বৎসরেই ইসলাম পৃথিবীর দিকবিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) মদীনায় পৌঁছে সর্বপ্রথম মসজিদ নির্মাণ করেন। যা আজ মসজিদে নববী নামে খ্যাত। এক সময় এ মসজিদ ছিল ইসলামী রাষ্ট্র, ইসলামী সভ্যতা-সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র। মসজিদে নববী তখন ইসলামের আন্তর্জাতিক রাজধানী হিসেবেও ভূমিকা পালন করেছে। এখানে বহু রাষ্ট্রদূতকে স্বাগত জানানো হয়েছে, বহু সন্ধিপত্রও স্বাক্ষরিত হয়েছে। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ফায়সালা এখান থেকেই নেয়া হতো। বহু বিজয় অভিযানের পরিকল্পনা এখান থেকে করা হয়েছে। মানব সেবার এমন কোনো দিক নেই, যা এখান থেকে পরিচালিত হয়নি। মোটকথা, মসজিদে নববী ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ ধর্ম ও রাষ্ট্রের কেন্দ্র।

বর্তমান মসজিদে নববীর স্থান ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে পূর্ব নির্ধারিত। মদীনায় হিজরতকালে নবীজী যে উটনীর পিঠে সওয়ার হয়ে এসেছিলেন সেই উটনীটিই এই জায়গা চিহ্নিত করে। মদীনায় এসে উটনীটি প্রথমে এই স্থানে বসে পড়ে। নবীজী এতে সহজেই বুঝতে পারেন যে, এটি তার মসজিদ নির্মাণের স্থান। প্রথমে তিনি মসজিদের জন্য জমি অধিগ্রহণের কাজ শুরু করেন। জমিটা ছিল নাজ্জার গোত্রের দুই ইয়াতীম বালক-সাহল ও সুহাইলের মালিকানাধীন। এরা প্রতিপালিত হচ্ছিল সাহাবী আসআদ ইবনে যুরারার তত্ত্বাবধানে। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বালকদেরকে ডেকে জমি বিক্রির প্রস্তাব করলেন। তারা বললেন-হুজুর! এ জমি আমরা আপনার খেদমতে উৎসর্গ করলাম। রাসূল বললেন- না, তা হয় না। তোমরা ইয়াতীম, বিনা মূল্যে তোমাদের সম্পদ নেয়া যায় না। শেষ পর্যন্ত জমির মূল্য সাব্যস্ত হলো দশ দিনার। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) -এর নির্দেশে আবু বকর (রাঃ) তা পরিশোধ করে দিলেন। মসজিদ নির্মাণ শুরু হলো। তিন হাত মাটি খনন করে পাথর ও চুনা দ্বারা ভিত্তি গাঁথা হলো। প্রথম প্রস্তরটি স্থাপন করলেন স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সাঃ)। এরপর তিনি আবু বকর (রাঃ)-কে ডেকে তার উপর আরেকটি পাথর রাখতে বললেন। এরপর ওমর (রাঃ) এবং ওসমান (রাঃ) কে পর্যায়ক্রমে একটি করে পাথর রাখতে বললেন। এ পাথর স্থাপন যেন ছিল নবীজীর পর ধারাবাহিকভাবে খেলাফতের দায়িত্ব পালনের ইঙ্গিত। মসজিদে নববীর দেয়াল তৈরি হলো কাঁচা ইট দিয়ে, আর খুঁটি খেজুরের গাছ। খেজুরের শাখা বিছিয়ে তার উপর কাদামাটির প্রলেপ দিয়ে তৈরি করা হলো ছাদ। প্রথম নির্মাণের সময় মসজিদে নববীর আয়তন ছিল উত্তর-দক্ষিণে সত্তর হাত এবং পূর্ব-পশ্চিমে ষাট হাত। সপ্তম হিজরিতে আবার মসজিদ সম্প্রসারণ করা হয়। তখন এর আয়তন হয় দৈর্ঘে ১০০ হাত এবং প্রস্থে ১০০ হাত। দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমরের (রাঃ) শাসনামল পর্যন্ত মসজিদটি এ অবস্থাতেই ছিল। এরপর বহুবার এর সংস্কার হয়েছে। সর্বশেষ সৌদি সরকারের নিজস্ব তত্ত্বাবধানে মসজিদটি সম্প্রসারণ করা হয়। বর্তমানে মসজিদে নববীতে দশলক্ষ লোক এক সাথে নামাজ আদায় করতে পারেন। এর অভ্যন্তরে নবীজীর রওজা ও তাঁর দুই সাথীর কবর রয়েছে। রাসূলের (সাঃ) রওজা ও মিম্বরের মধ্যবর্তী স্থানটি ‘রিয়াজুল জান্নাহ’ যা অত্যন্ত বরকতময়। মসজিদে নববীর ঐতিহাসিক ৮টি স্তম্ভ রয়েছে। প্রত্যেকটি স্তম্ভের বিশেষ ফজিলতও রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর সময়ে এবং খোলাফায়ে রাশেদার যুগে মসজিদে নববীতে কোনো মিনার বা গম্বুজ ছিল না। মসজিদে নববীতে সর্বপ্রথম উমাইয়া খলীফা ওয়ালিদ বিন আবদুল মালেকের গভর্ণর উমর বিন আব্দুল আযীয ৮৮-৯১ হিজরীতে মিনার তৈরি করেন। এরপর ৬৭৮ হিজরি সনে শাসক মালেক আল -কলদুন সালেহী রাসূলুল্লাহ(সাঃ)-এর রওজার শীর্ষদেশে সর্বপ্রথম গম্বুজ তৈরি করেন। মসজিদে নববীর মুতাওয়াল্লী শায়খ শাম্‌স ইবনে যামান হিজরি ৮৫৫ সনে হযরত উমর বিন আব্দুল আযীযের নির্মিত মূল হুজরা শরীফের ক্ষতিগ্রস্ত দেয়াল ও মিনার মেরামত করেন। এ সময় মিনাটির রং ছিল সাদা। তাকে ‘কুব্বায়ে বায়দা’ বা শ্বেত গম্বুজ নামে অভিহিত করা হতো। পরবর্তীতে দশম হিজরির মধ্যভাগে তুর্কী খলীফা সুলতান সোলায়মান হুজরা শরীফের মেঝেতে মর্মর পাথর বিছিয়ে দেন এবং মসজিদের ছাদ পর্যন্ত মর্মর পাথরের মজবুত খুঁটি নির্মাণ করে তার উপর গম্বুজের কুরসী তৈরি করেন। ফলে রওজা শরীফ উত্তর-দক্ষিণে ৫২ ফুট এবং পূর্ব-পশ্চিমে ৪৯ ফুট আয়তন বিশিষ্ট হয়ে যায়। তুর্কী পরবর্তী বাদশা সুলতান মাহমুদ হিজরি ১২৩৩-৫৫ সন পর্যন্ত সময়ের মধ্যে রওজা শরীফের পরিপূর্ণ মেরামত কার্য সম্পাদন করেন। তিনিই গম্বুজের সাদা রং পরিবর্তন করে গাঢ় সবুজ রং লাগান। আর তখন থেকেই গম্বুজে বায়দা ‘গম্বুজ খাজরা’ অর্থাৎ, সবুজ গম্বুজ নামে পরিচিত হয়। যা দর্শক মাত্রেরই চক্ষু শীতল করে দেয়। সৌদি সম্প্রসারণের সময় পূর্বের মিনারগুলো ভেঙ্গে আরও উন্নত মানের মিনার তৈরি করা হয়। মিনারগুলোর উপর বিদ্যুতের আলোর ঝলকানি দূর থেকে দৃষ্টিকে আকৃষ্ট করে। আশেকরা দূর থেকে নবীজীর সবুজ গম্বুজ দেখে প্রেমে ব্যাকুল হয়ে ওঠেন। পূর্ব-দক্ষিণ কোণের মিনারটি রওজা শরীফের গম্বুজের সাথে রয়েছে। বর্তমানে আমরা যে ছবি দেখে থাকি তাতে সবুজ গম্বুজ ও মিনারটি একই সাথে দেখা যায়। এক সাথে এই দুই ছবি যেন মদীনার প্রতীক হয়ে আছে।

মসজিদে নববী ছাড়াও মদীনাতে আরও ঐতিহাসিক কিছু মসজিদ রয়েছে। মদীনার দর্শনযোগ্য মসজিদগুলো হলো-মসজিদে কুবা, মসজিদে জুমাআ, মসজিদে গামামাহ, মসজিদে আবু বকর, মসজিদে ওমর বিন খাত্তাব, মসজিদে আলী বিন আবি তালেব, মসজিদে কিবলাতাইন, মসজিদে আল-ফাতাহ, মসজিদে ফাতিমা, মসজিদে যুল হুলাইফা ইত্যাদি। ঐতিহাসিক ওহুদের ময়দানও মদীনায় অবস্থিত। যেখানে রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর প্রাণ প্রিয় চাচা হযরত আমীর হামজার সমাধি রয়েছে। সবচেয়ে মর্যাদাসম্পন্ন কবরস্থান জান্নাতুল বাকী এই মদীনাতেই অবস্থিত। যেখানে শুয়ে আছেন রাসূলুল্লাহ(সাঃ)-এর সঙ্গী-সাথী ও প্রিয় বান্দাগণ। মদীনার এই স্মৃতিগুলো দেখে ঈমান আরও তেজদীপ্ত হবে এতে কোনো সন্দেহ নেই।

মদীনা মুসলমানদের কাছে একটি প্রিয় স্থান। অনেক আশেকে রাসূল সেখানে মৃত্যু বরণের আকাঙ্খা করেছেন। বোখারী শরীফের এক বর্ণনায় এসেছে হযরাত ওমর (রাঃ) আল্লাহর কাছে দোয়া করেন, ‘হে আল্লাহ! আমাকে তোমার রাস্তায় শাহাদত এবং তোমর নবীর শহরে মৃত্যু দান করো’। হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন-‘মদীনার প্রবেশ পথসমূহে পাহারাদার নিয়োজিত রয়েছে। এখানে মহামারী ও দাজ্জালের প্রবেশাধিকার নেই” (বোখারী, মুসলিম)

পবিত্র মদীনা মুনাওয়ারার জিয়ারত সম্পর্কে অগণিত হাদীস রয়েছে। বিশিষ্ট সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন- ‘যে ব্যক্তি আমার রওজা জিয়ারত করবে তার জন্য আমার শাফায়াত ওয়াজিব হয়ে যাবে।’ (বায়হাকী)। মদীনা মুনাওয়ারার জিয়ারত এশকে রাসূলের ব্যাপার। যারা রাসূলকে ভালবাসেন তাদের পক্ষেই কেবল সম্ভব ইসলামের বিধিবিধান মেনে চলা । সাহাবায়ে কেরাম এবং তাদের পরবর্তী বিশিষ্ট উম্মতগণ তা প্রমাণ করিয়ে দেখিয়ে গেছেন। রাসূলের জীবদ্দশায় যদিও তাকে দেখার সৌভাগ্য আমাদের হয়নি; অন্তত তার রওজায় গিয়ে সালাম দেওয়ার শুভ কিসমত হোক এজন্য সবার চেষ্টা থাকা উচিত। আল্লাহ সকলকে তাঁর প্রিয় হাবীবের রওজা জিয়ারতের তাওফিক দিন।

 


মুফতী মীযানুর রহমান রায়হান
দৈনিক ইত্তেফাক, ১৪ মার্চ ২০০৮