এই পৃথিবীতে আল্লাহতায়ালা এক লক্ষ চব্বিশ হাজার (মতান্তরে দুই লক্ষ চব্বিশ হাজার) নবী-রাসুল পাঠিয়েছেন। তাঁদেরকে পাঠিয়েছেন নির্দিষ্ট জনপদে, যার যার কওমের হেদায়েতের জন্য। কিন্তু আল্লাহ আমাদের প্রিয় নবী, সরওয়ারে কায়েনাত, সাইয়েদুল মুরসালীন, খাতেমুন্নাবীন, হযরত মোহম্মদ (সাঃ) কে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন রাহমাতুল্লিল আলামীন হিসাবে, সারা বিশ্বের কল্যাণের জন্য, সকল মানুষ ও সকল প্রাণীর কল্যাণের জন্য এবং সর্বকালের জন্য।


পবিত্র কুরআনে এরশাদ হয়েছে, ওয়া মা আরছাল্‌নাকা ইল্লা রাহমাতাল্লিল আলামীন’ অর্থাৎ আমি ত আপনাকে সমস্ত বিশ্বের রহমত স্বরূপ প্রেরণ করেছি। পবিত্র কুরআনে আরো এরশাদ হয়েছে “লাকাদ কানা লাকুম ফি রাসুলিল্লাহে ওসওয়াতুন হাসনাহ” নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য রাসুলাল্লাহর মধ্যে রয়েছে সর্বোত্তম আদর্শ। এই আয়াতগুলি অনুধাবন করলেই বুঝা যায় যে, আমাদের প্রিয় নবী, হযরত মোহম্মদ (সাঃ) ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ মানব, সর্বশ্রেষ্ঠ নবী, সমস্ত বিশ্বের রহমত এবং বিশ্ব-মানবতার সর্বশ্রেষ্ঠ পথ-প্রদর্শক। পরম করুণাময় আল্লাহ তায়ালা তাঁকে সৃষ্টি করেছেন বলেই বিশ্বের সমস্ত কিছু সৃষ্টি করেছেন, তাঁকে সৃষ্টি না করলে অন্য কিছুই সৃষ্টি করতেন না।


তিনি যে আল্লাহতায়ালার কত বড় পিয়ারা বান্দা ছিলেন, তা তাঁকে প্রদত্ত “হাবীবুল্লাহ” নাম থেকেই বুঝা যায়। তিনি ছিলেন রাসুলুল্লাহ্‌ এবং হাবীবুল্লাহ। বিভিন্ন পয়গম্বরগণের নামে বিভিন্ন বিশেস্নষণ ব্যবহ্নত হয়েছে, যেমন- আদম সফিউল্লাহ, নূহ্‌ নবীউল্লাহ, ইব্রাহীম খলিলুল্লাহ, ইসমাইল জবিউল্লাহ, মুসা কলিমুল্লাহ, ঈসা রুহুল্লাহ কিন্তু একমাত্র হয্‌রত মোহাম্মদ (সাঃ) কে বলা হয়েছে রাসুলুল্লাহ ও হাবীবুল্লাহ এবং আমাদের কালেমাই হচ্ছে, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ, মোহাম্মদোর রাসুলুল্লাহ।


শিক্ষা ব্যবস্থাঃ আমাদের প্রিয় নবী নিজে উম্মি ছিলেন বটে কিন্তু শিক্ষার প্রতি তিনি সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করে গেছেন। নবী করীমের প্রতি প্রথম যে ‘ওহিটি’ নাজিল হয়েছে, তা ‘ইক্‌রা’ শব্দ দিয়ে শুরু হয়েছে। সুরা আলাকের ৫টি আয়াত হচ্ছে, ‘‘ইক্‌রা বিস্‌মি রাব্বিকাল্লাযি খালাক, খালাকাল্‌ ইনছানা মিন আলাক। ইক্‌রা ওয়া রাব্বুকাল আক্‌রামুল্লাযি আল্লামা বিল কালাম, আল্লামাল ইনছানা মালাম ইয়ালাম।” অর্থ-পাঠ কর তোমার প্রভুর নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন, সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্ত-বিন্দু থেকে। পাঠ কর এবং তোমার প্রভু মহামহিমাম্বিত, যিনি শিখিয়েছেন কলমের সাহায্যে, শিখিয়েছেন মানুষকে, যা সে জানত না। সুরা যুমার এর নয় নাম্বার আয়াতে বলা হয়েছে, ’বলুন (হে নবী) জ্ঞানী ও নির্বোধরা কি কখনো সমান হতে পারে? এছাড়া পবিত্র কুরআনে আরো বহুৎ আয়াত রয়েছে, যে সব আয়াতে জ্ঞান অর্জনের উপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। নামাজ সম্বন্ধে কুরআনে ৮২ জায়গায় তাগিদ এসেছে, আর জ্ঞান-চর্চার উপর ৯২ জায়গায় তাগিদ এসেছে। এই আয়াতগুলি দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, শিক্ষাই হচ্ছে ইস্‌লামের মূল-মন্ত্র এবং নবীজী প্রতিটি ক্ষেত্রে এই মূল-মন্ত্র কাজে লাগিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “তালাবুল এল্‌মে ফারিজাতুন আলা কুল্লে মুস্‌লেমেও ওয়া মুস্‌লেমাতুন” অর্থাৎ এলেম শিক্ষা করা প্রতিটি মুসলিম নর-নারীর উপর ফরজ। তিনি আরো বলেছেলেন, “দোলনা থেকে শুরু করে কবরে যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত মানুষকে শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে।” হাদীস শরীফে স্পষ্ট বলা হয়েছে, ‘জ্ঞানার্জনের জন্য, প্রয়োজন হলে, সুদূর চীন দেশেও যেতে হবে।” আরো বলা হয়েছে, “লেখকের কলমের কালি, শহীদের রক্তের চাইতেও পবিত্র।” নবী করীম আরো বলেছেন, নাওমুল আলীমে খায়রুম মেন ইবাদাতিল জাহিলী,” অর্থাৎ জ্ঞানী ব্যক্তির ঘুম, জাহিলের ইবাদতের চেয়েও উত্তম।” জ্ঞান সাধনার ব্যাপারে এত বেশী তাগিদ অন্য কোন ধর্মে নেই। আর হুজুরে করীম এই শিক্ষা সম্বন্ধে সব সময় কড়া নজর রেখেছেন। ২য় হিজরীর ১৭ই রমজান শুক্রবার বদরের যুদ্ধ অনুষ্ঠিত হয়। এই যুদ্ধে পরাজিত ৭০ জন কাফেরকে বন্দী করে মদীনায় আনা হয়। এই বন্দীদের মুক্তিপণ হিসাবে টাকাই নির্ধারণ করা যেত। কিন্তু আমাদের প্রিয় নবী, যিনি নিজে উম্মি ছিলেন, তিনি এতটা বিচক্ষণ ছিলেন যে, তিনি ঘোষণা দিলেন, বন্দীদের মধ্যে যারা শিক্ষিত, তারা প্রতিজনে, ১০জন করে নিরক্ষরকে শিক্ষা দান করতে পারলে, বন্দী জীবন থেকে মুক্তি পাবে।


তিনি এতটা শিক্ষানুরাগী ছিলেন যে, মদীনায় মসজিদে নববীর একাংশ ইবাদতের জন্য নির্ধারিত রেখে, বাকী অংশের কিছুটা প্রশাসনের জন্য রাখেন এবং অন্য অংশকে শিক্ষার জন্য মাদ্রাসা হিসাবে ব্যবহার করেন। এই ঐতিহাসিক মাদ্রাসাটি “সুফ্‌ফা” নামে পরিচিত ছিল। তিনি ব্যক্তিগতভাবে এই সুফ্‌ফাটি দেখাশুনা করতেন এবং আব্দুল্লাহ ইব্‌নে সাঈদ আল্‌ আস্‌কে এখানকার শিক্ষক নিযুক্ত করেন, যার হস্তাক্ষর অত্যন্ত সুন্দর ছিল। এই সুফ্‌ফাটি অবৈতনিক ছিল এবং সর্বপ্রকার লেখাপড়ার ব্যবস্থা ছিল। এই সুফ্‌ফায় তওহিদ, রিসালত, আখিরাত, ইবাদতের নিয়ম-কানুন, যাকাতের বিধান, ব্যবসা সংক্রান্ত বিষয়, বিবাহ-তালাক, যুদ্ধ-কৌশল, বিচার বিভাগীয় আইন-কানুন, প্রশাসন ও আন্তর্জাতিক আইন, হালাল-হারাম এবং অঙ্কশাস্ত্র, বিজ্ঞানশাস্ত্র ও চিকিৎসাশাস্ত্রে প্রশিক্ষণ দেওয়া হত। এ ছাড়া নারী শিক্ষা ও নারীর মর্যাদা সম্বন্ধে তিনি সর্বদা সজাগ দৃষ্টি রাখতেন। মাতৃ-জাতি সম্বন্ধে তিনি বলে গেছেন, “মায়ের পদতলে সন্তানের বেহেশত” আর নারীর মর্যাদা সম্বন্ধে তিনি বলেছেন, “হুন্না লেবাছুল্লাকুম ওয়া আন্‌তুম লেবাছুন লাহুন্না” অর্থাৎ স্ত্রীরা তোমাদের ভূষন, আর তোমরা তাদের (স্ত্রীদের) ভূষণ। এ ছাড়া ইসলামে স্ত্রীদেরকে পূজারিণী বা দাসী বলা হয় নাই, বরং তাদেরকে বলা হয়েছে, অর্ধাঙ্গিনী বা সহ-ধর্মিনী। নবীজী নিজে উম্মী ছিলেন, কোন স্কুল-কলেজে তিনি শিক্ষা গ্রহণ করেন নাই। সুতরাং কোন ভুল শিক্ষা তিনি পান নাই। তাঁর শিক্ষক ছিলেন স্বয়ং আল্লাহ্‌ এবং শিক্ষার বাহক ছিলেন ফেরেশতা প্রধান জিব্রাঈল (আঃ)। সুতরাং তাঁর শিক্ষায় কোন গলদ ছিল না, বরং তাঁর শিক্ষা ছিল ১০০% ছহি ও বাস্তব। পবিত্র কুরআনের ৬৬৬৬টি আয়াতের মধ্যে, ৭৫০টি আয়াত রয়েছে বিজ্ঞান ভিত্তিক। বিজ্ঞান সম্বন্ধে এবং আকাশমন্ডল সম্বন্ধে পবিত্র কুরআনে এত কিছু বলা হয়েছে যে, একমাত্র আল্লাহ এবং তাঁর রসুল ছাড়া সেই সময়ে এতকিছু জানা অন্য কারো পক্ষেই সম্ভব ছিল না, কেননা, তখন বিজ্ঞানের মোটেই উন্নতি হয় নাই।

*************************
ডাঃ (ক্যাপ্টেন) আব্দুল বাছেত
দৈনিক ইত্তেফাক, ১৪ মার্চ ২০০৮