ইসলামের নির্দেশনা
নারী জাতি আল্লাহ্তায়ালার এক অনন্য সৃষ্টি। নারীরা নারীত্বের মহিমায় তাদের ত্যাগ, মহানুভবতা, কোমলতা, ক্ষমার দ্যুতি ছড়িয়ে বিশ্বকে যে নির্মলতা উপহার দিয়ে চলেছেন তার জন্য সকল মানব জাতি তাদের কাছে কৃতজ্ঞ। আল্লাহ্ রহমানুর রাহিম তাঁর গুণবাচক নামসমূহের প্রভাবে নারীকে যে সুন্দর গুণাবলী দান করেছেন তা নারীদের আচরণগত বৈশিষ্টে জলজলায়মান। নারীরা হন দয়াশীলা। পরিবারে ও সমাজে তারা হন শান্তির কেন্দ্রবিন্দু। তারা মাণবীয় সৃজনশীল কাজে হন দক্ষ, পরিবারে কারো ভুল-ত্রম্নটি থাকলে তাকে শোধরাতে হয়ে উঠেন মুক্তিছাত্রী, রোধকরি। সাধারণতঃ নারীরা হন ধর্মভীরু। তাই তাদের জ্ঞান তাদের হ্নদয়ের প্রশস্ততাকে প্রসারিত করে পরিবারে, সমাজে, রাষ্ট্রে উন্নতি ও সম্মান বয়ে আন। তারা হন ন্যায়বিচারক, ধৈর্যশীলা, আমানত রক্ষাকারী, সন্তান-পালনে স্নেহশীলা। কল্যাণময়ী নারীরা হয়ে উঠেন সবার শ্রদ্ধার পাত্রী। তাদের বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ মনে এনে দেয় প্রশান্তি। তাদের বিনীত প্রার্থনা আল্লাহ্তায়ালা সহজে কবুল করেন। বেহেশতে থাকাকালীন সংগী-সাথিহীন হযরত আদম (রাঃ)-এর বাম পাজরের একটি হাড় দিয়ে তাঁর সাথী রূপে আল্লাহ্তায়ালা হযরত হাওয়া (রাঃ) কে সৃষ্টি করলেন। অতঃপর আল্লাহ্র নির্দেশে হযরত আদম (আঃ) বিবি হাওয়াকে স্ত্রী রূপে বরণ করে নিলেন। এভাবেই একজন প্রশান্তিময় স্ত্রী এবং কিয়ামত পর্যন্ত অগণিত মানব সন্তানের আদি মাতারূপে নারীর মর্যাদাময় সৃষ্টি বিশ্বময় মানুষের জ্ঞানের পরিধিকে কেবল বিস্তৃত করেই চলেছে।
মা হাওয়া (আঃ) এবং বাবা আদম (আঃ) হতে যে, মানব জাতির সৃষ্টি হয়েছে, সেখানে মানুষের মঙ্গলময় এবং কল্যাণকর আদ্রযাত্রায় নারীর মর্যাদাময় ভূমিকা এবং জাতি গঠনে গরুত্বপূর্ণ অবদান বিশেষভাবে স্বীকৃত। পৃথিবী মনুষ্যবাসের উপযোগী হলেও এখানে বেঁচে থাকার জন্য প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে হয়। তাই দুনিয়ায় আসার পর হতেই শুরু হয়েছে নারীর সংগ্রামী জীবন। এজন্যই এখনও বিশ্বময় মহিলারাই কৃষি সংক্রান্ত কাজ, বস্ত্রবুনন, গৃহস্থালি কর্মসহ সকল কঠিন কাজে ব্যাপৃত।
আজ হতে প্রায় ১৫০০ বছর পূর্বে ইসলাম নারীদেরকে বেশ কিছু ক্ষেত্রে পুরুষের সমান পর্যায়ের অধিকার নিয়ে সম্মানিত করেছে। ইসলাম ধর্মের মাধ্যমেই মানুষ প্রথম জেনেছে, যে কোন মৌলিক অধিকার অর্জন মেয়েদের জন্মগত অধিকার। কিন্তু আল্লাহ্র পথ থেকে সরে গিয়ে কতিপয় মানুষ এখন পর্যন্ত নারীদেরকে তাদের যোগ্য মর্যাদা না দিয়ে অসম্মাণিত করে চলেছে। আর পাশ্চত্যের অনুকরণপ্রিয় কিছু মুসলিম নারীও তাদের স্বীয় কর্মের দ্বারা নিজেদেরকে অযথাই মর্যাদাহীন করে তুলেছেন। জাহেলিয়াতের যুগে নারীরা ছিলেন সবচাইতে অবহেলিতা। যদিও সেই যুগেও সম্ভ্রান্ত মহিলারা ব্যবসা করতেন। আজও মহিলারা নিজেদের এবং পরিবারের ভাগ্যেন্নয়নে ব্যবসা করছেন। তখনও মহিলারা গৃহাভ্যন্তরে এবং বাইরে কঠোর পরিশ্রম করতেন। তবু তাদের কোন মর্যাদা ছিলনা। কন্যা শিশুকে জীবন্ত কবরস্থ করা হতো। এখনও পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন অজুহাতে আধুনিকতার নামে গর্ভস্থ শিশুকে হত্যা করা হচ্ছে। সেই যুগে মেয়েদের মৌলিক অধিকার ছিল সুদূর পরাহত। সাধারণ নারীদের ইচ্ছা-অনিচ্ছার কোন মূল্য ছিলনা। তারা পণ্য হিসাবে ব্যবহ্নত, ক্রয় এবং বিক্রি হতো। আগে ছিল গোত্রগত দ্বন্দ্ব, যুদ্ধ বিগ্রহ। এখন চলছে জাদিগত দ্বন্দ্ব, যুদ্ধ বিগ্রহ। মিথ্যার আবরণে নব্য ক্রসেডের ভয়াবহতা এবং দেশে দেশে সন্ত্রাসের বিভিন্ন রূপের মর্মান্তিকভাবে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ শিকার নারী জাতি। মহিলাদের দুর্দশা আরব জাতিকে পর্যুদস্ত করে তুলেছিল। দিশেহারা কুসংস্কারাচ্ছন্ন আরব জাতিকে আলোর দিশা দিয়ে তাদের তপ্ত হ্নদয়ে শান্তির পরশ বুলিয়ে দিতেই ইসলামের আগমন ঘটেছিল। অথচ ইসলাম পূর্ব যুগের আরবদের কাব্য সমগ্র ও সমৃদ্ধ ভাষা ও সংস্কৃতি, অসাধারণ স্মৃতিশক্তি, কর্তব্যপরায়ণতা, অতিথিপরায়নতা আজও পৃথিবীব্যাপী জ্ঞান পিপাসু গবেষকদের কাছে অপার বিস্ময়! আজকের পৃথিবী বিজ্ঞানময়। জ্ঞান-বিজ্ঞানের বহু শাখায় শিক্ষিত নারীদের কর্মময় চঞ্চলতা সকলকেই মুগ্ধ করে। সময়ের দ্রুততায় নারীদেরকে আরও গতিশীল করতে ক্ষেত্রবিশেষে স্বার্থাম্বেষীরা মহিলাদেরকে তাদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে আধুনিক জীবনের স্বাদ দিতে ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন। অথচ পরিবার হচ্ছে আবাল-বৃদ্ধ-বণিতার সবচাইতে নিরাপদ স্থান। এই নিরাপত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন করার অর্থই হচ্ছে ‘মানব জীবনকে অমাণবিক মানসিক পীড়ায় ফেলে’ মর্যাদাহীন করে তোলা। অনেকের কাছেই আধুনিকতার অর্থ হচ্ছে ধর্মহীনতা। আবার কেউ ভাবেন, মধ্যযুগের ধর্ম আজ অচল। অন্য ধর্মের ন্যায় ইসলাম ধর্মেরও সংস্কার প্রয়োজন। কিন্তু সনাতন মনে হলেও এই ধর্মই সর্বাধুনিক ধর্ম। ইসলাম ধর্ম কোন ব্যক্তি/মানুষ বা গোষ্ঠীর ইচ্ছা বা অনিচ্ছার ধর্ম নয়। সমস্ত মাখলুকাত অর্থাৎ সৌরজগৎ, মহাকাশ, ভূ-মন্ডল, সমগ্র জীবজগতের দৃশ্য ও অদৃশ্য সকল সৃষ্টির একমাত্র সৃষ্টিকর্তা মহান রাব্বুল আলামীনের একমাত্র মনোনীত ধর্ম হচ্ছে ইসলাম। মানুষের জীবনকে সুন্দর ও পবিত্র করার জন্য যত রকমের সহজ পন্থা রয়েছে তার সবই ইসলাম ধর্মে বিদ্যমান। তাই এই ধর্মকে মধ্যপন্থীদের ধর্ম বলা হয় (সূরা বাকারা, ১৪৩ নং আয়াত দ্রষ্টব্য)। এই ধর্মে চরমপন্থার কোন সুযোগ নেই। যাবতীয় নিষ্ঠুরতা, অসহিষ্ণুতা ও বর্বরতার বিরুদ্ধে ইসলাম ধর্মই একমাত্র রক্ষাকবচ। সুতরাং ইসলাম ধর্মের সংস্কার নয় বরং ইসলাম সম্পর্কে কোন মন্তব্য করার পূর্বে এই ধর্ম বিষয়ে সঠিক জ্ঞান অর্জন করা প্রয়োজন।
নিজেদের দোষে বেহেশতী সুখ থেকে বঞ্চিত অকৃতজ্ঞ ইহুদী জাতির ন্যায় খ্রীষ্টান জাতি ও মা হাওয়া (আঃ)কে নিজেদের বিড়ম্বিত ভাগ্যের জন্য দোষারোপ করে নারীদের প্রতি শত্রম্নতামূলক আচরণ করে আসছে কয়েক সহস্র বছর ধরে। শয়তানের ধোকায় পতিত হয়ে হযরত আদম ও হযরত হাওয়া (আঃ) আল্লাহ্র নির্দেশে বেহেশ্ত থেকে দুনিয়ায় নেমে এসেছিলেন। কারণ, এই দুনিয়া হচ্ছে মানব জাতির জন্য পরীক্ষাক্ষেত্র। এই পরীক্ষাগারে আসার পর হতে আমাদের আদি পিতা-মাতাকে শয়তান আর কোনভাবেই প্ররোচিত করতে পারেনি। তাই আদম সন্তানদের প্রতি শয়তানের আক্রোশের শিকারে আজ মানবজাতি বিভ্রান্ত। এই সংকুল পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার পাবার আজও একটিই ভরসা ‘ইসলাম’। পুরুষকে বাদ দিয়ে যেমন নারী জীবন কল্পনা করা যায় না, তেমনি নারীকে বাদ দিয়ে পুরুষের জীবনও অর্থহীন। তাই আল্লাহ্ তায়ালা সূরা তওবার ৭১নং আয়াতে বলছেন “প্রত্যেক মুমিন পুরুষগণ ও মুমিনা স্ত্রী লোকগণ পরস্পর সহকারী বন্ধু। সৎ বিষয় শিক্ষা দেয় এবং অসৎ বিষয় হতে নিষেধ করে আর সঠিকভাবে নামায পড়ে ও যাকাত প্রদান করে এবং আল্লাহ্ ও তার রসূলের আদেশ মান্য করে। এ সমস্ত লোকের প্রতি আল্লাহ্তায়ালা নিশ্চয়ই রহমত বর্ষণ করবেন, নিঃসন্দেহে আল্লাহ্ তায়ালা শক্তিমান প্রজ্ঞাময়।” ব‘তঃ নারী ও পুরুষের পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ হতে মনুষ্যত্বের জন্ম। ইসলাম ধর্ম হতেই আমরা এই শিক্ষা পেয়েছি। হযরত মুহাম্মদ সয়াল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিভিন্ন সম্প্রদায় ও গোত্রের মুসলিম নর-নারীর মধ্যে বিবাহকে উৎসাহিত করে। কলহ ও সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে মানুষের সাথে মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানকে নিশ্চিত করেছিলেন।
পরিবারে, সমাজে ও রাষ্ট্রে নারীকে ইসলাম দিয়েছে সম্মানজনক মর্যাদা। সন্তানের মঙ্গল কামনায় মায়েরা অনেক ত্যাগ করেন। যথাসম্ভব কষ্ট সহ্য করেন। সন্তানকে সুস্থ ও সৎ মানুষ রূপে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে মায়েদের সাধনাকে অম্স্নান করতে আল্লাহ্তায়ালা ঘোষণা দিয়েছেন- ‘মায়ের পায়ের নীচে সন্তানের বেহেশ্ত’। আবু হোরায়রা (রাঃ) হতে ২২৮৬ নং বুখারী শরীফের হাদীছে বর্ণিত আছে, “একদা এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ্ সয়াল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে উপস্থিত হলো এবং জিজ্ঞাসা করল, আমার সদ্ব্যবহার পাবার বেশী অধিকারী কে? হযরত মুহাম্মদ সয়াল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমার মা। ঐ ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করল, তারপর কে? [চলবে]
*************************
মির্জা শরমিন হুদা
দৈনিক ইত্তেফাক, ২৯/০২/২০০৮