- Home
- ইতিহাস ও ঐতিহ্য
- আলেম মুক্তিযোদ্ধার খোঁজে
আলেম মুক্তিযোদ্ধার খোঁজে
- By Article Poster
- Published 03/15/2008
- ইতিহাস ও ঐতিহ্য
- Unrated
লোকটার জবাবে বিস্মিতই হতে হলো আমাদের। ‘চৌদ্দগ্রামে কোনো আবাসিক হোটেল নেই’। তাহলে আমাদের মতো মুসাফিররা এখানে এসে কী করেন! ‘আপনারা যা করবেন তাই করেন তারা’। খুব স্বাভাবিকভাবেই উত্তর করল হাসপাতালের কর্মচারীটি। ‘ঢাকা ফেরত যাবেন নতুবা মহিপালের কোনো হোটেলে উঠতে হবে’। বলেন কী! এত্ত রাতে আবারও গাড়ির ঝামেলা! অগত্যা তাই করতে হলো আমাদের। লোকটি বহু কষ্ট করে আমাদের উঠিয়ে দিলেন একটি মালবাহী কার্গোতে।
এসে নামি মহিপালে। রাতের শেষ অংশটুকু এক আবাসিক হোটেলে কাটিয়ে ফজরের আগেই এসে হাজির হই মিজান রোড আলিয়া মাদ্রাসায় তাবলীগের মার্কাজ মসজিদে। ফজর নামাজের পর খুঁজে বের করি মুক্তিযোদ্ধা মৌলভী নুরুল আফসারকে। জানালাম, ঢাকার লালমাটিয়া শাহী মসজিদের মুয়াজ্জিন মক্তিযোদ্ধা মৌলভী উসমান গনি আপনার সন্ধান দিয়েছেন। আপনি তো মুক্তিযোদ্ধা, আমরা আপনার কাছে মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুনতে এসেছি। শুনাবেন কি সেই গল্প?
তখন তিনি মনোরহাট সিনিয়র মাদ্রাসায় দাখিল পরীক্ষার্থী ছিলেন। এই পরীক্ষার সময়ই দেশে গন্ডগোল তুঙ্গে উঠে যায়। নির্যাতনের নানা খবর আসতে থাকে চারদিক থেকে। স্বাধীনতার ঘোষণাও হয় একদিন। এদিকে তিনি ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর সমর্থক, আবার পরীক্ষার্থী। পরীক্ষা বা দলীয় সমর্থন কোনো কিছুই তার জন্য বাধার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। সব ভুলে তিনি শরিক হন তখন স্বাধীনতার সংগ্রামে। সার্বভৌমত্ব রক্ষার লড়াইয়ে।
৩১ আগষ্ট ১৯৭১। ১৭ জনের এক দলের সঙ্গে তিনি বের হয়ে যান যুদ্ধের ট্রেনিং নেয়ার উদ্দেশে। নেতৃত্বে খাজা আসেম। বাড়ির পাশেই বর্ডার। বর্ডার পার হয়ে ঢুকে পরেন ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের চুক্তাখোলা ক্যাম্পে। সেখান থেকে কাঁঠালিয়া ক্যাম্পে পাঠানো হয় তাদের। ওই ক্যাম্প শত্রুর রেঞ্জের মধ্যে পড়ে যাওয়ায় পরিবর্তন করতে হয় ক্যাম্পটি। আসেন আগরতলার বাগমারা ক্যাম্পে। বাগমারায় পুর্ণ ট্রেনিয়ং শেষ করে চলে আসেন রাজানগর ক্যাম্পে। তখন নেতৃত্বে ছিলেন বিগ্রেডিয়ার মতিউর রহমান। তারপর কর্নেল ফাজর ইমামের নেতৃত্বে চলে আসেন বাংলাদেশের সুবার বাজার এলাকায়। যোগ দেন সম্মুখ সমরে। তিনি সাধারণত এলএমজি ব্যবহার করতেন। আর সব লড়াইয়ে তিনি সব সময় থাকতেন প্রথম কাতারে। মৃত্যুর কথা ভুলে যেতেন তখন।
যুদ্ধের প্রথমদিকে তিনি ফেনীতে ছিলেন। বেশিরভাগ যুদ্ধ তিনি ফেনীতে করেন। ফেনীর বিজয় নিশ্চিত হলে চলে যান পাহাড়ি এলাকা চট্টগ্রামের নাজিরহাট এলাকায়। সেখানেও লড়েন বেশ কৃতিত্বের সঙ্গে।
পরশুরাম থানার অনন্তপুরের ঘটনা। প্রথমে তাকে বেশ দুর্বল ভেবেছিলেন সহযোগী মুক্তিরা। কিন্তু লড়াই বেঁধে যাওয়ার পর দেখেন পরিস্হিতি বেশ ভয়াবহ। পাকরা সংখ্যায় অনেক। গোলাবারুদও যথেষ্ট পরিমাণে রয়েছে তাদের হাতে। মুক্তিযোদ্ধারা ছিলেন সবাই সারিবদ্ধভাবে। কেউ ঝোপ-ঝাড়ের আড়ালে। কেউ বা কোনো মাটির ঢিবির আড়ালে। সবাই নিজ নিজ অবস্হান থেকে মোকাবেলা করে যাচ্ছিলেন। তখন মৌলভী নুরু আফসার ছিলেন সারির একেবারে কোনায়। তিনি আস্তে আস্তে ক্রলিং করে সামনে এগিয়ে যেতে থাকেন। ওদিকে ঝড়ের মতো গুলির মুখে মুক্তিরা পিছু হটতে বাধ্য হয়। মৌলভী নুরুল আফসার তখনও জানতেন না তিনি একা। আর তিনি কত ভয়ঙ্কর মৃত্যু কুপে নেমে গেছেন হামাগুঁড়ি দিয়ে। হঠাৎ শুনতে পান পাক কমান্ডারের নির্দেশ-‘এ চুতিয়াকা বাচ্চা, হাতিয়ার ঢাল দো’। এলএমজি’র-ট্রিগারে আগেই হাত রাখা ছিল মৌলভী নুরুল আফসারের। সঙ্গে সঙ্গে চেপে ধরলেন এলএমজি’র ট্রিগার। এক পশলা গুলি ছুটে যায় মুহুর্তে। ছেকে ধরে সেগুলো খাঁকি পোশাকের জানোয়ারগুলোকে। তারাও ট্রিগার চেপেছিল শেষ মুহুর্তে। কিন্তু গুলিবিদ্ধ দেহ তাদের অস্ত্রগুলো ধরে রাখতে পারেনি। লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় গুলি। সবাই হুমড়ি খেয়ে আছড়ে পড়ে মাটিতে। যেন একসঙ্গে অনেক পাকা ফল গাছ থেকে খসে পড়েছে।
যুদ্ধের এই ভয়াবহ বাস্তব চিত্র শুনতে আমরা যখন ভীষণ শিহরিত হচ্ছিলাম তখন তাকিয়ে দেখি মুক্তিযোদ্ধা নুরুল আফসারের চোখে পানি এসে গেছে। দু’চোখ ভরে গেছে পানিতে। তার মনে হচ্ছিল ওটা একটা দুঃস্বপ্ন ছিল। বাস্তব হলে তো সেখান থেকে বেঁচে আসা অসম্ভব।
তিনি আরেকটি হৃদয় বিদারক ও দুর্বার অভিযানের কথা শোনান।
কোলাপাড়ায় বেঁধে গেল যুদ্ধ। একদল আরেক দলকে মারার জন্য মরিয়া হয়ে উঠল। কেউ কারো চেয়ে কম না। যুদ্ধের এক পর্যায়ে এসে মুক্তিরা পাকিস্তানিদের ফাঁদে ফেলে দেয়। তিন দিকে ভারত। সীমান্ত পার হয়ে আসছে ভারতীয়দের গোলা। আরেক দিক দিয়ে সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে যায় মুক্তিবাহীনি। মাঝে অবরুদ্ধ পাকিস্তানি সৈনিক দল। তিন পক্ষ থেকে গুলি বিনিময় হতে থাকে সমান তালে। আস্তে আস্তে পাকিস্তানিদের জায়গা ছোট হয়ে আসতে থাকে। কিন্তু তখন হঠাৎ উড়ে আসে কয়েকটা পাকিস্তানি বোমারু বিমান। মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর বোমা ফেলতে থাকে একযোগে। মুক্তিসেনারাও পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন তখন। কয়েকটা বিমানও ভুপাতিত করেছিলেন তারা কিন্তু এ সুযোগ শত্রুরা খাঁচা থেকে পালিয়ে যায়। হাতছাড়া হয়ে যায় একটা বড় সুযোগ। আর তখন কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাও শহীদ হন। যাদের মধ্যে ছিলেন মৌলভী নুরুল আফসারের দীর্ঘ কালের বন্ধু শহীদ সিরাজ। নিজে ফেরত আসতে পারলেও বন্ধুর বিয়োগে এখনো শোকাতুর মুক্তিযোদ্ধা মৌলভী নুরুল আফসার। এখনো স্মরণ করেন তিনি শহীদ সিরাজকে। ভালোবাসা পাঠান তার নামে প্রতিদিন।
মুক্তিযুদ্ধে ১০ ইষ্ট বেঙ্গলের থাকার কারণে যুদ্ধের পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে চাকরি পেয়ে যান মুক্তিযোদ্ধা মৌলভী নুরুল আফসার। তার পদ ছিল সার্জেন্ট অফিসার। দীর্ঘ ২১ বছর যথাযথ দায়িত্ব পালনের ১৯৯২-এর আগষ্টে তিনি চাকরি থেকে অবসর নেন। এরপর থেকে তিনি পারিবারিক কাজ ও তাবলীগে সময় ব্যয় করেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের এই দুঃসাহসী লড়াকুর চার ছেলে, তিনি মেয়ে। বর্তমানে তার বয়স ৫৭ বছর। তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম, আপনি কি ভোট দেন? বলেছেন, দেই। তবে কোনো দল করি না। কেন? সোজা উত্তর-এ দেশে রাজনীতি নেই। সব পেটনীতি।
শা কে র হো সা ই ন শি ব লি
আমার দেশ, ১৫ মার্চ ২০০৮