আজ থেকে চৌদ্দশ’ বছর আগে স্রষ্টা ও সৃষ্টির মাঝে সুসম্পর্ক গড়ে ওঠার লক্ষ্যে বহু বিবর্তন, পরিবর্তন এবং রূপান্তরের মধ্য দিয়ে এ পৃথিবীতে মানবজাতির ইহকালীন ও পরকালীন সুখ-শান্তির জন্য রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখে মতান্তরে ২, ৪, ৭, ৮ ও ৯ তারিখে সর্বশেষ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হজরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আল্লাহতায়ালা এ পৃথিবীতে পাঠান এবং এ মাসের ১২ তারিখেই তিনি তিরোধান লাভ করেন। কাজেই বিশ্ব মুসলিমবাসীর কাছে এ মহান দিবসটি অতীব তাৎপর্যবহ ও মরতবাপূর্ণ। রাসূল (সাঃ)-এর মহব্বতে আমাদের দেশসহ বিশ্বের মুসলমানরা মিলাদুন্নবী (সাঃ) ও সিরাতুন্নবী (সাঃ)-এর মাধ্যমে মাসটি উদযাপন করে থাকেন। মিলাদ আরবি শব্দ। অর্থ হচ্ছে জন্মবৃত্তান্ত। মিলাদুন্নবী (সাঃ)-এর অর্থ হচ্ছে নবী (সাঃ)-এর জন্মবৃত্তান্ত আলোচনা করা।

সুতরাং মানবজীবনের সুখ-শান্তি পেতে হলে সর্বক্ষেত্রে সুন্নাতের অনুসরণ অপরিহার্য। হজরত রাসূলে কারীম (সাঃ)-এর সুন্নাতকে মানবজীবনে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে হক্কানি আলেমরা এ মাসে বেশি বেশি করে আল্লাহর পেয়ারা হাবিব রাসূলে মকবুল (সাঃ)-এর জীবনী আলোচনা করে থাকেন। হজরত রাসূলে কারীম (সাঃ)-এর উম্মত হিসেবে তাঁর আদর্শ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সবার আলোচনা নিম্নরূপ-

মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর আবির্ভাবের আগে দুনিয়ার মানুষ আল্লাহর বিধান ও নবী-রাসূলদের আদর্শ ভুলে সর্বপ্রকার জঘন্যতম অনাচার ও পাপাচারে লিপ্ত হয়েছিল। তাদের আচার-আচরণ ছিল বর্বর ও মানবতাবিরোধী। এ কারণে এ যুগ আইয়্যামে জাহিলিয়া বা অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগ হিসেবে পরিচিত। এ সময়ে মানুষের জান-মাল, ইজ্জত-আবরুর কোন নিরাপত্তা ছিল না। শান্তি-শৃংখলা, নিয়মানুবর্তিতা বলতে কিছু ছিল না। নরহত্যা, রাহাজানি, ডাকাতি, মারামারি, কন্যা-সন্তানকে জীবন্ত কবর দেয়া, জুয়াখেলা, মদ্যপান, সুদ, ব্যভিচার ছিল তখনকার লোকদের নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার।

শত শত দেব-দেবীর মূর্তি নির্মাণ ও তার পূজা করা তাদের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা ছিল তাদের ধর্ম। কাবাঘরে তারা সে সময় ৩৬০টি মূর্তি স্থাপন করেছিল। এক কথায় পাপ-পঙ্কিলতার অতল তলে নিমজ্জিত ছিল তারা। মানবতার এ চরম দুর্দিনে আল্লাহতায়ালা তাঁর প্রিয় বন্ধু সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব হজরত মুহাম্মদ (সাঃ)-কে পাঠালেন বিশ্ব মানবতার শান্তির দূত হিসেবে। তাই তো তিনি সারাবিশ্বের জুলুম, নির্যাতন, অত্যাচার, অবিচার, ফেতনা, ফ্যাসাদ, অন্যায়ের সব মূলোৎপাটন ঘটিয়ে সত্য ও ন্যায়ের রাজত্ব কায়েম করে শান্তি ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের নিশ্চয়তা বিধান করেছিলেন, যা অন্য কোন ধর্ম প্রবক্তা পূর্ণতায় পৌঁছতে পারেননি। কারণ তারা নিজ নিজ সীমিত পরিসরে ধর্ম প্রচার করেছিলেন।

সুতরাং রাসূল (সাঃ) আনীত পূর্ণাঙ্গ ইসলামকে প্রতিষ্ঠার জন্য শুধু ইয়া নবী সালামু আলাইকা, ইয়া রাসূল সালামু আলাইকা বলে দরুদ, সালাম ও মোনাজাতে সীমাবদ্ধ না রেখে, মহানবী (সাঃ)-এর প্রতি পূর্ণ ভালোবাসা, পরম ভক্তি-শ্রদ্ধা রেখে তার রেখে যাওয়া নীতি-আদর্শ, শিক্ষা তথা আল্লাহপাকের বিধানগুলো ব্যক্তি-পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও জাতীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে পালনের সর্বাত্মকভাবে সফল করতে হবে।

যেমন- সফল করেছেন সাহাবারা রাসূলের আদর্শকে তাদের জীবনে বাস্তবায়ন করে। সাহাবারা আমাদের মতো প্রচলিত মিলাদ, কিয়াম ও ঈদে মিলাদুন্নবীর মতো কোন আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে রাসূলের মহব্বতকে প্রকাশ করেননি। বরং তারা আলোচনা করেছেন রাসূলের জীবনী ও রাসূলের আদর্শ।

পরবর্তী উম্মতদের তাঁরা রাসূল (সাঃ)-এর আদর্শ-শিক্ষা ও ইসলামী বিধিবিধানের প্রতি উৎসাহিত ও অনুপ্রমাণিত করেছেন। পরিশেষে বলব- আল্লাহতায়ালা আমাদের রাসূল (সাঃ)-এর খাঁটি উম্মত হিসেবে তাঁর আদর্শ ও সুন্নাত তরিকার ওপর জীবনকে বাস্তবায়ন করার তৌফিক দান করুন।

*************************
মাওলানা মোহঃ ওমর ফারুক
যুগান্তর, ১৪ মার্চ ২০০৮