রাসুলে করিম (সা·)-এর রওজা জিয়ারত

জিয়ারত ও নামাজ আদায়ের উদ্দেশ্যে মদিনায় যাওয়া সুন্নত। মসজিদে নববীতে নামাজ পড়ায় ফজিলত বেশি।

মসজিদে নববীতে জিয়ারতের জন্য ইহরাম বাঁধতে বা তালবিয়া পড়তে হয় না। তবে মদিনা থেকে যদি মক্কায় আবার আসতে হয়, তাহলে মিকাত বীর আলী পার হলে ইহরাম বেঁধে আসতে হবে।

রওজায়ে জান্নাত বা রিয়াজুল জান্নাহ
হুজরায়ে মোবারক ও মিম্বার শরিফের মাঝখানের জায়গাটি রওজায়ে জান্নাত বা রিয়াজুল জান্নাহ বা বেহেশতের বাগান নামে পরিচিত। এ স্থানটির বিশেষ ফজিলত রয়েছে। এখানে নামাজ পড়ারও বিশেষ ফজিলত আছে।

মসজিদে নববীতে কয়েকটি ঐতিহাসিক স্তম্ভ
উস্তুওয়ানা হান্নানা (সুবাস স্তম্ভ) মিম্বারে নববীর ডান পাশে খেজুরগাছের গুঁড়ির স্থানে নির্মিত স্তম্ভটি। নবী করিম (সা·) মিম্বার স্থানান্তরের সময় এ গুঁড়িটি উঁচু স্বরে কেঁদেছিলেন।

উস্তুওয়ানা সারীরঃ এখানে রাসুলুল্লাহ (সা·) ইতিকাফ করতেন এবং রাতে আরামের জন্য তাঁর বিছানা এখানে স্থাপন করা হতো। এ স্তম্ভটি হুজরা শরিফের পশ্চিম পাশে জালি মোবারকের সঙ্গে রয়েছে।

উস্তুওয়ানা উফুদঃ বাইরে থেকে আগত প্রতিনিধিদল এখানে বসে রাসুলুল্লাহ (সা·)-এর হাতে ইসলাম গ্রহণ করতেন এবং এখানে বসেই কথা বলতেন। এ স্তম্ভটিও জালি মোবারকের সঙ্গে রয়েছে।

উস্তুওয়ানা আয়েশা (আয়েশা স্তম্ভ)- নবী করিম (সা·) বলেছেন, আমার মসজিদে এমন একটি জায়গা রয়েছে, লোকজন যদি সেখানে নামাজ পড়ার ফজিলত জানত, তাহলে সেখানে স্থান পাওয়ার জন্য প্রতিযোগিতা করত। স্থানটি চিহ্নিত করার জন্য সাহাবায়ে কিরাম চেষ্টা করতেন। রাসুলুল্লাহ (সা·)-এর ইন্তেকালের পর হজরত আয়েশা (রা·) তাঁর ভাগ্নে হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইরকে (রা·) সে জায়গাটি চিনিয়ে দেন। এটিই সেই স্তম্ভ। এই স্তম্ভটি উস্তুওয়ানা উফুদের পশ্চিম পাশে রওজায়ে জান্নাতের ভেতর।

উস্তুওয়ানা আবু লুবাবা (তওবা স্তম্ভ)- হজরত আবু লুবাবা (রা·) থেকে একটি ভুল সংঘটিত হওয়ার পর তিনি নিজেকে এই স্তম্ভের সঙ্গে বেঁধে বলেছিলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত হুজুরে পাক (সা·) নিজে না খুলে দেবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত আমি এর সঙ্গে বাঁধা থাকব। নবী করিম (সা·) বলেছিলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত আমাকে আল্লাহ আদেশ না করবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত খুলব না। এভাবে দীর্ঘ ৫০ দিন পর হজরত আবু লুবাবা (রা·)-এর তওবা কবুল হলো। অতঃপর রাসুলুল্লাহ (সা·) নিজ হাতে তাঁর বাঁধন খুলে দিলেন। এটি উস্তুওয়ানা উফুদের পশ্চিম পাশে রওজায়ে জান্নাতের ভেতর অবস্থিত।

উস্তুওয়ানা জিবরাইলঃ ফেরেশতা হজরত জিবরাইল (আ·) যখনই হজরত দেহইয়া কালবী (রা·)-এর আকৃতি ধারণ করে ওহি নিয়ে আসতেন, তখন অধিকাংশ সময় তাঁকে এখানেই উপবিষ্ট দেখা যেত।

মিহরাবে নববীঃ মাকরুহ ওয়াক্ত না হলে কাউকে কষ্ট না দিয়ে এখানে নফল নামাজ পড়ুন। মিহরাবের ডানে রাসুলুল্লাহ (সা·)-এর দাঁড়ানোর জায়গা।

নবী করিম (সা·)-এর রওজা মোবারক
সালাম পেশ করার নিয়ম
কিবলার দিকে পিঠ করে নবী করিম (সা·)-এর চেহারা মোবারককে সামনে রেখে এমনভাবে দাঁড়াতে হবে, যেন রাসুলুল্লাহ (সা·) আপনার সামনে। এ সময় পৃথিবীর যাবতীয় চিন্তাভাবনা থেকে দিলকে মুক্ত করে একমন, একদিল হয়ে অত্যন্ত আদবের সঙ্গে সালাম পেশ করতে হবে। এ রকম খেয়াল করতে হবে যে, নবী করিম (সা·) কবর মোবারকে কিবলার দিকে মুখ করে আরাম করছেন এবং সালাম-কালাম শ্রবণ করছেন।

মদিনার প্রাণকেন্দ্র মসজিদে নববী
ইসলামে ফজিলত লাভের উদ্দেশ্যে কেবল তিন মসজিদে ভ্রমণ করার অনুমোদন আছে। এর মধ্যে প্রথমটি হলো মক্কা মুকাররমা বা কাবা শরিফ (সৌদি আরব)। দ্বিতীয়টি হচ্ছে মসজিদ আল-আকসা বা বায়তুল মুকাদ্দাসঃ ইসলামের প্রথম কিবলা মসজিদ (ফিলিস্তিন)। তৃতীয়টি হলো মদিনা আল-মুনাওয়ারার মসজিদে নববীঃ নবীজিকে যেখানে চির শয়নে শায়িত করা হয়েছে। মদিনা নবীর শহর, একে আরবিতে বলা হয় মদিনাতুন নবী। আর মদিনার প্রাণকেন্দ্র হলো মসজিদে নববী। মদিনার ৯৫টি নাম রয়েছে, যেমন দারুস সালাম (শান্তির ঘর)। তা ছাড়া মদিনার ৯৯টি বৈশিষ্ট্য রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা·) মদিনার বরকতের জন্য দোয়া করেছেন, একে হারাম বা সম্মানিত ঘোষণা করেছেন। হাদিস শরিফে বর্ণিত আছেঃ ঘর থেকে অজু করে মসজিদে কুবায় গিয়ে নামাজ পড়লে একটি উমরাহর সওয়াব পাওয়া যায়।
মসজিদে নববীর ভেতরে স্বয়ংক্রিয় ছাদের ব্যবস্থা আছে, যা দিনের বেলা সুইচের মাধ্যমে খুলে দেওয়া হয় আর রাতে বন্ধ করে দেওয়া হয়।

পাশেই জান্নাতে বাকি গোরস্তান। এখানে ফাতেমা (রা·), মা হালিমা ও হজরত ওসমান (রা·)সহ অগণিত সাহাবা (রা·)-এর কবর রয়েছে। এর একপাশে নতুন কবর হচ্ছে প্রত্যহ। এখানে শুধু একটি পাথরের খণ্ড দিয়ে চিহ্নিত করা আছে একেকটি কবর। কেউ কেউ একে বাকি গোরস্তান বলে সম্বোধন করেন।

মসজিদে নববীর উত্তর দিকের গেট দিয়ে বেরিয়েই সাহাবাদের মসজিদ। পাশাপাশি দুটি এবং একটি একটু দূরে একই ডিজাইনে করা তিনটি মসজিদ। এগুলোকে সাহাবা মসজিদ বলা হয়।

মসজিদে নববীতে নারীদের জন্য আলাদা নামাজ পড়ার জায়গা আছে।

ভেতরে কিছুদূর পরপর পবিত্র কোরআন মজিদ রাখা আছে, আর পাশে আছে জমজম পানি খাওয়ার ব্যবস্থা।

রাসুলুল্লাহ (সা·)-এর রওজা মোবারক
উম্মুল মুমিনীন হজরত আয়েশা (রা·) এর কক্ষেই রাসুলুল্লাহ (সা·)-এর ওফাত হয় এবং সেখানেই তাঁকে দাফন করা হয়। মসজিদ সম্প্রসারণ করার পর বর্তমানে তাঁর কবর মসজিদে নববীর অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে। রাসুলে করিম (সা·)-এর রওজার ডানদিকে খলিফা হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা·) ও খলিফা হজরত ওমর ফারুক (রা·)-এর কবর। মসজিদে নববীতে সালাত আদায় ও দোয়া করার উদ্দেশ্যেই মদিনায় গমন এবং সালাত আদায় করে রাসুলুল্লাহ (সা·)-এর রওজা শরিফ জিয়ারত করা ও সালাম পৌঁছানোর ইচ্ছা প্রতিটি ধর্মপ্রাণ মুসলমানের থাকে।